রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন ও কিছু কথা

লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের মধ্য দিয়ে সেখানে সব 'সমস্যার' সমাধান হয়েছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়াতে, যেখানে একটি জাতীয় 'ঐকমত্য' প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি ছিল, সেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি দশ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর যে সূচনা করেছিল, সেই যুদ্ধেরও অবসান হয়নি। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর এটা ধরে নেয়া হয়েছিল যে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর অবসান ঘটবে। কেননা ওবামা প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে বিশ্ববাসীকে নতুন এক শান্তির বাণী শুনিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের কায়রো ভাষণে ওবামা মুসলমানদের আস্থা অর্জনের জন্য 'নতুন এক রাজনীতির' কথা ঘোষণা করেছিলেন। সারা বিশ্বের মুসলমানরা সেদিন আশ্বস্ত হয়েছিল। ওবামা শান্তির জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল ওবামা তার পূর্বসূরি বুশের চেয়ে কোনো অংশে কম যান না। ইরাকের মতো লিবিয়াতে তিনি মার্কিন সেনা পাঠাননি সত্য, কিন্তু তিনি মার্কিন যুদ্ধ-বিমানকে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস 'যুদ্ধের' পর গাদ্দাফিকে উৎখাত করা হলো। বিদ্রোহীদের অস্ত্র আর অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল ওবামা প্রশাসন। গাদ্দাফি উৎখাত হলেন, তাও জনগণের ভোটে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রাসী সামরিক অভিযানের মুখে। তাই তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' শেষ হয়ে গেছে_ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রেই বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওবামা প্রশাসন 'নতুন এক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'র সূচনা করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঙঢ়বহ ঝড়পরবঃু ঋড়ঁহফধঃরড়হ তাদের একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'র মাত্রা কমেনি বরং বেড়েছে। রবার্ট ড্রাইফুস (জড়নবৎঃ উৎবুভঁংং) ওই প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে আমাদের জানিয়েছেন যে বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রতি রাতে নূ্যনতম ১৯ বার 'রাতের অপারেশন' পরিচালিত হয়, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি। গত তিন মাসে ১৭০০ বার 'রাতের অপারেশন' পরিচালিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আফ্রিকায় যুদ্ধের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। এ কথাটাও স্বীকার করেছেন আফ্রিকায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত অঋজওঈঙগ-এর ফোর্স কমান্ডার জেনারেল কার্টার হাম। তাদের টার্গেট এখন সোমালিয়ার আল-সাহার, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার অষ-ছধবফধ রহ ওংষধসরপ গধমৎবন এবং নাইজেরিয়ার ইড় কড় ঐধৎধস গ্রুপ, যাদের সঙ্গে আল-কায়দার একটা সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেয়া হয় (জড়নবৎঃ উৎবুভঁংং-এর প্রবন্ধ ঘধঃরড়হ ড়ভ ঈযধহমব, ২২ ঝবঢ়ঃবসনবৎ)। সুতরাং 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' শেষ হচ্ছে না। বুশ এটাকে ব্যবহার করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। ওবামাও দ্বিতীয়বারের জন্য (২০১২) এটা ব্যবহার করবেন তার নিজ স্বার্থে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে নয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গত ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার দশম বার্ষিকী পালিত হয়েছে। দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (একজন বর্তমান, একজন সাবেক) নিউইর্য়কের গ্রাউন্ড জিরোতে ফুল দিয়ে ওই সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণ করেছেন। বিবিসির বাংলা বিভাগ গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের একটি 'ফোন-ইন' অনুষ্ঠানে বাংলাদেশিদের মতামত জানতে চেয়েছিল। যারা প্রশ্ন করেছেন তাদের প্রায় সবারই জিজ্ঞাসা ছিল আসলে নাইন-ইলেভেনের উদ্দেশ্য কী ছিল? কারা এই নাইন-ইলেভেন সংঘটিত করেছিল? এ ধরনের প্রশ্ন যে শুধু বাংলাদেশিদের মাঝেই জেগেছে, তা নয়। বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এ প্রশ্ন উঠেছে। অনেক প্রবন্ধ, অনেক গ্রন্থ ইতিমধ্যে পশ্চিমা বিশ্বে লেখা হয়েছে। আজো হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি লেখাতেই টার্গেট করা হয়েছে মুসলমানদের। চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে। তবে যারা নোয়াম চমস্কি, ফিনিয়ান কানিংহাম কিংবা মিচেল চসুডোভস্কির লেখার সঙ্গে পরিচিত, তারা দেখেছেন কীভাবে গভীরে প্রবেশ করে তারা অনুসন্ধান করেছেন কেন নাইন-ইলেভেন ঘটলো কিংবা যারা নাইন-ইলেভেন সংঘটিত করেছিল, তারা আসলে কারা, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল।
এটা সত্য আল-কায়েদা স্বীকার করেছিল তারা নাইন-ইলেভেন সংঘটিত করেছিল। কিন্তু অনেক প্রশ্নেরই আমরা আর কোনো জবাব কোনোদিন খুঁজে পাব না। কেননা যিনি জবাব দিতে পারতেন, সেই আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন এখন আর বেঁচে নেই। মার্কিন কমান্ডোরা গত ২ মে ভোররাতে অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়ি রেড করে তাকে হত্যা করে। তারপর কোনো ধরনের ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই তার মৃতদেহ আরব সাগরে ভাসিয়ে দেয়। একজন মুসলমান হিসেবে, মৃতদেহের প্রতি যে সম্মান দেখানোর কথা, সেই সম্মানও দেখানো হয়নি ওসামা বিন লাদেনের ক্ষেত্রে। ওসামা বিন লাদেনের উত্থান ও মৃত্যু নিয়েও নানা কথা আছে। একসময় ওসামা বিন লাদেনদের তৈরি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের প্রয়োজন ছিল লাদেনদের। একসময় এই লাদেনরাই অস্ত্র তুলে নিল মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইর্য়কের বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার সদর দফতরে (যা টুইন টাওয়ার নামে পরিচিত) বোমা হামলার জন্য ওসামা বিন লাদেন ও তার সংগঠন আল-কায়েদা জড়িত। লাদেনকে আফগানিস্তান আশ্রয় দিয়েছে এই অভিযোগ তুলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আফগানিস্তানে ইঙ্গ-মার্কিন বিমান হামলা হলো। অক্টোবরে তালেবানরা উৎখাত হলেন কাবুল থেকে, আর ২২ ডিসেম্বর সেখানে হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বে একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছে আফগানিস্তান। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না! পাওয়া গেল ২০১১ সালের ২ জুন ভোরবেলায়। ঙঢ়বৎধঃরড়হ এবৎড়হরসড় হত্যা করলো ওসামাকে, যিনি কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই দুই স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের নিয়ে অ্যাবোটাবাদের একটি বাসায় বসবাস করতেন। এটাও কী সম্ভব? সারা বিশ্বের গোয়েন্দারা যাকে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে খুঁজছে, তাকে কি না পাওয়া গেল একটি বাড়িতে, পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে, একাকী। হাতের কাছে একটি কালাসনিকভ রাইফেলও ছিল না, অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়িতে, যাকে মার্কিন নৌ বাহিনীর কমান্ডোরা নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করেছিল, তিনি কী আসলেই ওসামা বিন লাদেন ছিলেন? এটা একটা ওয়ান মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তবে বস্টনের এষড়নধষ চড়ংঃ ৪ মের (২০১১) সংখ্যায় ওসামাকে নিয়ে কতগুলো ছবি ছেপেছিল। একটি ছবি আছে ৫ বছরের পুরনো। সিআইএ কর্তৃক সরবরাহকৃত ওই ছবিতে দেখানো হয়েছে অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়িটি। নিচে ক্যাপশনে বলা হয়েছে_ সিআইএ পাঁচ বছর ধরেই ওই বাড়িটিকে টার্গেট করেছে, যেখানে তাদের ধারণা ওসামা বিন লাদেন লুকিয়ে থাকতে পারেন। সংগত কারণেই তাই প্রশ্ন ওঠে সিআইএ এত দীর্ঘ সময় কেন নিল ওসামাকে হত্যা করার জন্য। ৫ বছর তো দীর্ঘ সময়। সিআইএ কী এতদিন অপেক্ষা করে কোনো 'অপারেশন' এর জন্য? আরো প্রশ্ন আছে। পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের ধরে এনে তার বিচার করেছে যুক্তরাষ্ট্র (যেমন পানামার নরিয়েগা)। হেগে আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। ওসামা বিন লাদেন যদি সত্যি সত্যিই মানবতার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তার বিচার যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালতে হতে পারতো। নিদেন পক্ষে হেগে সেই বিচার হতে পারতো। কিন্তু তাকে হত্যা করা হলো। তার ছবিও প্রকাশ করা হলো না। এটা একটা 'সাজানো নাটক' কিনা, ইতিহাস সেটাই বিচার করবে একদিন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই পৃথিবীতে ওসামা বিন লাদেন নামে কেউ বেঁচে নেই, যিনি আসল কথাটা বলতে পারবেন।
সুতরাং 'ওয়ান-ইলেভেন' এ কী হয়েছিল, এটা মানুষ জানলেও, এর নেপথ্যের কারণ মানুষ আর কোনোদিনই জানবে না। ওবামা প্রশাসন ২০১৪ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের যে ঘোষণা দিয়েছে, তাও এখন প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বুরহানউদ্দীন রব্বানীর মৃত্যুর পর এ প্রশ্ন এখন উঠেছে। লিবিয়ায় গেল মার্চে যে 'যুদ্ধের' সূচনা করেছিলেন ওবামা, তা সেপ্টেম্বরে এসে একটা পরিণতি পেয়েছে, এটা সত্য, কিন্তু 'যুদ্ধ' লিবিয়ায় থামবে না। সিরিয়ায়ও লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রয়েছে ইয়েমেন, তারপর সোমালিয়া। লিবিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ নাইজারে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে। নাইজার 'আরেকটি পাকিস্তান'-এ পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রথমত, গাদ্দাফির সমর্থকদের নাইজারে আশ্রয় নেয়া (সম্ভবত গাদ্দাফিও সেখানে আছেন)। দ্বিতীয়ত, নাইজারের প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল ও ইউরেনিয়াম)_ এ দুটো কারণে নাইজারের রাজনীতি আগামীতে উত্তপ্ত হবে এবং এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী একটি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করবে।
'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'র সূচনা করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এখনো তাদের মূল টার্গেট মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল। সুতরাং লাদেনের মৃত্যু কিংবা গাদ্দাফির পতন_ এটাই শেষ নয়। নতুন নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সেখানে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্প তথা করপোরেট হাউসগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্যই যুদ্ধ দরকার। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা। আফগানিস্তান ও ইরাক এর বড় প্রমাণ। গাদ্দাফির পতনই তাই শেষ কথা নয়।
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

একটি সংবাদ, অনেক প্রশ্ন

একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর। সংবাদটিতে উচ্চশিক্ষার সঙ্কটের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। অনেক মেধাবি ছাত্র যে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না, তার একটি করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ওই প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হলেও, এ চিত্র প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যাবে- আসন সংখ্যার চাইতে অতিরিক্ত আবেদনকারী। যদিও তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশি। এ বছর (২০১১-১২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ হাজার ৩১টি আসনের বিপরীতে ফরম বিতরণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ১৭৩টি। ফলে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪২ জন শিক্ষার্থীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। এদের মাঝে কেউ কেউ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে বটে, কিন্তু একটা বড় অংশেরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ থাকবে না। তাহলে এরা যাবে কোথায়? যাদের সমর্থ আছে, তারা যাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর যাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই, তারা যাবে কলেজগুলোতে। দু'একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে, বাকিগুলো মানহীন। নেই যোগ্য শিক্ষক, নেই অবকাঠামোগত সুবিধা। কলেজ শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, আর কোথাও কোথাও অযোগ্য শিক্ষকদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। আর কলেজগুলোতে রয়েছে শিক্ষক সঙ্কট। কোনো কোনো কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। কিন্তু পাঠদান করার শিক্ষক নেই। অনেক কলেজে আবার আমি জানি যেখানে শিক্ষকরা বাধ্য করেন ছাত্রছাত্রীদের কোচিং করতে। তিনি কলেজে ক্লাস না নিয়ে নিজ বাড়িতে কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হচ্ছে ওই কোচিং সেন্টারে যেতে। ঢাকায় এসে খিলক্ষেত মার্কেট থেকে এরা নোট বই বা গাইড বই কিনে নিয়ে যাচ্ছে, আর ওটা দিয়েই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। উচ্চ শিক্ষা যে আজ কোন পর্যায়ে গেছে, তা চিন্তা করে অাঁতকে উঠতে হয়। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি আসনের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে ৩৬ জন ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রী। আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে 'ভর্তিযুদ্ধ'। জাহাঙ্গীরনগরে শুরু হবে ৮ অক্টোবর।
এবার দশটি বোর্ডের মোট পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। পাসের হার এবার ৭৫ দশমিক শূন্য আট। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৯ হাজার ৭৬৯ জন ছাত্রছাত্রী, যা গত বছরের চেয়ে ১০ হাজার ৭৬৫ জন বেশি। আর সব মিলিয়ে বিভিন্ন গ্রেডে পাস করেছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ২৬১ জন। এরা কোথায় যাবে? কোথায় পড়বে? এদের একটা বড় অংশের ঠাঁই হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা আস্থার জায়গা এখনো আমাদের জন্য তৈরি করতে পারেনি। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়তো শুধুমাত্র সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে! মাননীয় রাষ্ট্রপতি, এমনকি শিক্ষামন্ত্রীও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে কথা বলছেন। মাননীয় রাষ্ট্রপতি শিক্ষার গুণগতমান নিয়ে যখন বলেন, তখন আমরা আমজনতা তার বক্তব্য শুনে উৎফুলি্লত হচ্ছি। কিন্তু তিনি কী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন? কেন এখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল' গঠন করা হলো না, যারা শিক্ষার মান নির্ধারণ করবে? নামসর্বস্ব একটি সার্টিফিকেট, শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো পরিচয় হতে পারে না। আমরা আশঙ্কা করছি এইচএসসি পাস করা অনেক তরুণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আদৌ কোনো সুযোগ না পেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে এবং এক সময় নামসর্বস্ব একখানা সার্টিফিকেটের অধিকারী সে হবে! ওই সার্টিফিকেট দেখিয়ে সে চাকরি পাবে, এই নিশ্চয়তা সমাজ তাকে দেবে না।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো ভালো ভালো শিক্ষক রয়েছে। অনেকেই শুধু 'টাকার জন্য' বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। তরুণ শিক্ষার্থীরা যাতে করে নামসর্বস্ব সার্টিফিকেটের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সে জন্য নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলো নেয়া যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'দ্বিতীয় শিফট' চালু করা যায়। এ ক্ষেত্রে 'দ্বিতীয় শিফট' এ যারা পড়বে তারা অতিরিক্ত ভর্তি ফি দিয়ে পড়বে। বিভাগের শিক্ষকদের এ জন্য অতিরিক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে একদিকে তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হবেন, অন্যদিকে ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের আমরা 'দ্বিতীয় শিফট'-এর ব্যাপারে আকৃষ্ট করতে পারবো। দ্বিতীয় শিফটের জন্য ইউজিসি একটি নীতিমালা তৈরি করবে এবং প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তা অনুসরণ করবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর 'দ্বিতীয় ক্যাম্পাস' চালু করা সম্ভব। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী কিংবা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের 'দ্বিতীয় ক্যাম্পাস' বিভাগের অন্যত্র চালু করা সম্ভব। একজন প্রো-ভিসির পরিচালনায় তা চালু হতে পারে। মূল ক্যাম্পাসের শিক্ষকরাই সেখানে নিয়মিতভাবে শিক্ষা নিতে পারেন। প্রয়োজনে কিছু তরুণ শিক্ষককে নিযোগ দেয়া যেতে পারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ভেঙে ৭টি বিভাগীয় শহরে ৭টি পুরনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে চালু করা যেতে পারে। কোনো কোনো কলেজে ভালো শিক্ষক আছেন। এদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে রয়েছে, তা শুধু সার্টিফিকেটসর্বস্ব একটি তরুণ প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে নতুন ক্যাম্পাস, 'দ্বিতীয় শিফট' চালুর বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের মেধা আছে। এরা প্রতিভাবান। উচ্চ শিক্ষা এদের অধিকার। এদের মেধাকে ব্যবহার করার স্বার্থেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাই না যে জিপিএ-৫ পেয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছিল, তার ওই স্বপ্ন ভেঙে যাক। উচ্চশিক্ষা তাদের অধিকার। আমাদের সংবিধান এই অধিকার তাদের দিয়েছেন। এই অধিকার থেকে আমরা তাদের বঞ্চিত করতে পারি না। তাদের সবার আগ্রহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তথা মেডিকেল কলেজগুলোর দিকে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ৩৫টি। মেডিকেল কলেজের সংখ্যাও বেড়েছে। শোনা যাচ্ছে সরকার আরো ৩টি মেডিকেল কলেজ চালু করবে। এখন যে প্রশ্নটি আমার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এতে করে শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়েছে কতটুকু? নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। কিন্তু পড়াচ্ছেন কারা? আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি, যেখানে কোন 'অধ্যাপক' নেই। এমনকি সহযোগী অধ্যাপকও ছিল না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোনো কোনো বিভাগে যদি আদৌ অধ্যাপক না থাকেন, যদি সহযোগী অধ্যাপকও না থাকেন, তাহলে ওই বিভাগের উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তো থাকবেই। অভিযোগে আছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপক এর পদ বিজ্ঞপিত হলেও, যোগ্য আবেদনকারী খুঁজে পাওয়া যায় না। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটি হয়েছে। সেখানকার রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে কোনো অধ্যাপক নেই। দু'দিন আগ পর্যন্ত সেখানে সহযোগী অধ্যাপক পর্যন্ত ছিল না। এখন অবশ্যই পদোন্নতির মাধ্যমে দু'জন সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। নতুন লোক প্রশাসন বিভাগ চালু করা হয়েছে। সেখানে অতিসম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে একজন সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। অধ্যাপক নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিভাগে আমি আমার বিভাগের কথা বলতে পারি। আমার বিভাগে ৯ জন প্রভাষক কর্মরত। ৯ জন প্রভাষককে দিয়ে বিভাগের মানোন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? অথচ আমার বিভাগে এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। সেখানে নিয়মিত ক্লাস হওয়ার কথা।
আমার আশঙ্কা হয় আমরা কোনো 'মেধাশূন্য' জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি কী না! একদিকে যেমনি শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি ঘটছে, অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এই প্রবণতা পদ না হলে এ জাতি মেধাশূন্য জাতিতেই পরিণত হবে।
একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রী যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করে এবং এক পর্যায়ে আদৌ কোনো সুযোগে পায় না- এই বিষয়টি কি শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তারা ভেবে দেখেছেন? আমার মনে হয় না তারা এটা ভেবে দেখেছেন। ভেবে দেখলে শিক্ষানীতিতে এর প্রতিফলন থাকতো। বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী এইচএসসি পাস করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু তারপরও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত। শুধু একখানা সার্টিফিকেটের জন্য একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, এটা হতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।দৈনিক যায় যায় দিন, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ ইং।
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং কিছু কথা

সারা বিশ্ব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে যুদ্ধের ১০ বছর পার করল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান বিধ্বস্ত করে ভবন দুটি ধ্বংস করার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ১০ বছর পার করার পর সেই যুদ্ধের অবসান হয়েছে_তা বোধ হয় বলা যাবে না। কেননা ওবামা প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সেখানে যুদ্ধ চলছে। ইরাকে মার্কিন সেনা নেই বটে। কিন্তু আত্মঘাতী বোমা সংস্কৃতির সেখানে জন্ম হয়েছে। আর লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী এক গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পাশাপাশি আরেকটি বিমান হামলা হয়েছিল ভার্জিনিয়ায় পেন্টাগনের সদর দপ্তরে। চতুর্থ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল পেনসিলভানিয়ায়। আল-কায়েদা নামে একটি সংগঠন এই হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছিল। এরপর জানা গেল আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের নাম। গত ১০ বছর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ' পরিচালনা করেছে। গত ১ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরের একটি বাড়িতে অবস্থান নেওয়া বিন লাদেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'র একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বটে। কিন্তু 'যুদ্ধ' এখনো শেষ হয়নি। এমনকি ওবামা নিজেও এই যুদ্ধের সমাপ্তির কথা ঘোষণা করেননি।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল? ১০ বছরের হিসাব-নিকাশ যদি মেলানো যায় তাহলে দেখা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোষ্ঠী এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লাভবান হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। ডেভিড ডি গ্র (David de Graw) Global Research-এ লিখিত একটি প্রবন্ধে স্বীকার করেছেন, এই যুদ্ধের মোট খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৪৪ কোটি লাখ টাকার সমান)। চিন্তা করা যায়, কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সাধারণ করদাতারা এই অর্থ পরিশোধ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এই যুদ্ধের খরচের একটি হিসাব দিয়েছে। তাদের ভাষায়, এই খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি পরিসংখ্যান দিয়েছেন ন্যানসি এ ইউসুফ (Nancy A. Youssef) তাঁর এক প্রবন্ধে The True Cost of Afgan Iraq War is Anyone's Guess (Me Clatchy-এর প্রতিবেদন, ১৫ আগস্ট ২০১১)। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি ছয়জন মার্কিনের মধ্যে একজন দরিদ্র। পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ দরিদ্র। এশীয়দের মধ্যে দারিদ্রের হার ১২.১ শতাংশ। তাদের চাকরি নেই। বুশ তথা ওবামা প্রশাসন তাদের জন্য ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারত। সামাজিক খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে পারত। তা তারা করেনি। অথচ 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' নিয়েও নানা কথা আছে। কারা শুরু করল, কেন করল_অনেক প্রশ্নেরই কোনো জবাব নেই দীর্ঘ ১০ বছর পরও। একটি নয়, দুটি নয়_চার-চারটি বিমান ছিনতাই হলো। গোয়েন্দারা টের পেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে টুইন টাওয়ারে দুটি বিমান বিধ্বস্ত হলো। দেখা গেল, ভবন দুটি ধসে পড়েছে, অথবা গলে গেছে। কোনো ধরনের বিস্ফোরক ছাড়া কি এত উঁচু ভবন একসঙ্গে ধসে নিচে পড়ে যেতে পারে? তাহলে কি কোনো শক্তি এমন কোনো বিস্ফোরক ব্যবহার করেছিল, যাতে করে পুরো ভবন ধসে পড়ে? কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে বড়জোর ওই ভবনের কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পুরো ভবনটি ধসে পড়ার কথা নয়। শুধু দুটি ভবনই ধসে পড়ল, পাশের ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকল, একটুও ক্ষতি হলো না কিংবা কাত হয়ে পড়ল না_এটা কি সম্ভব? ওই দুটি ভবন বেছে নেওয়ার কারণই বা কী? আশপাশে তো আরো অনেক ভবন ছিল। এটা করা হয়েছিল কী এ কারণে যে ভবন দুটি ছিল বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদর দপ্তর। এখানে যেকোনো হামলা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে। পেন্টাগনে যে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো, ওই বিমানের যাত্রীদের কোনো ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া যায়নি। সাধারণত বিমান বিধ্বস্ত হলে মৃতদেহ পাওয়া যায়_এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে পাওয়া গেল না কেন? এমনকি বিধ্বস্ত বিমানের কোনো ছবিও দেখা যায়নি। পেনসিলভানিয়ার এক মাঠে চতুর্থ যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণও আমরা পাইনি কোনো দিন। ওই বিমানে কতজন যাত্রী ছিল, কয়টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে_এসব কোনো তথ্যই কারো কাছে নেই। পাঠক লক্ষ করুন, কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে প্রথমেই খোঁজ পড়ে ব্লাক বঙ্রে, যেখানে সর্বশেষ কথোপকথন রেকর্ড হয়ে থাকে। যতদূর মনে পড়ে, বিধ্বস্ত চারটি বিমানের একটিরও 'ব্লাক বঙ্' উদ্ধার করা কিংবা পাওয়া যায়নি। এটা কি ইচ্ছাকৃত? নাকি কোনো তথ্য গোপন করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টুইন টাওয়ারে হামলায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারালেও (বাংলাদেশি পাঁচজনসহ) একজন ইহুদিও মারা যায়নি। এটা কি কাকতালীয়, নাকি অন্য কিছু? অভিযোগ আছে, বিমান হামলার পাঁচ মিনিট আগে সব ইহুদি এই ভবন ত্যাগ করে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব গত ১০ বছরে আমরা পাইনি। কিন্তু ওই হামলার পর বিশ্বকে বদলে যেতে দেখেছি আমরা। আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল মার্কিন বাহিনী ২০০১ সালে। সেই দখলীস্বত্ব আজও বজায় রয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, মার্কিন সেনাবাহিনী সেখানে থাকবে। কেননা মধ্যএশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের (গ্যাস ও তেল) ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আফগানিস্তান থেকে সেই সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের। বেলুচিস্তানের মরুভূমিতে রয়েছে একটি বিমান ঘাঁটি, যা যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে। বেলুচিস্তানের সীমান্তে রয়েছে ইরানের একটি প্রদেশ 'সিস্তান বেলুচিস্তান'। আরব সাগর ঘেঁষা গাওদারে চীনারা তৈরি করছে গভীর সমুদ্রবন্দর। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেলুচিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি।
আফগানিস্তানের পাশাপাশি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নিয়েছিল ইরাক। অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র (ডগউ) রয়েছে_এই অভিযোগ তুলে দেশটি দখল করে নিয়েছিল। ২০১০ সালে এসে সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে সত্য (৫০ হাজার সৈন্য রয়ে গেছে প্রশিক্ষণের জন্য)। কিন্তু ইরাকি সম্পদ (তেল) চলে গেছে মার্কিন কম্পানিগুলোর হাতে। ইরাকি তেলের পয়সায় এখন মার্কিন কম্পানিগুলো বিধ্বস্ত ইরাকের পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত। ২০১০ সালে এসে সারা আরব বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে এক ধরনের গণ-আন্দোলন, যাকে বলা হচ্ছে 'আরব বসন্ত'। এই আরব বসন্ত কার জন্য, কিসের জন্য_এটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকরা (বেন আলী, হোসনি মুবারক, আলী আবদুল্লাহ সালেহ) উৎখাত হয়েছেন বটে। কিন্তু ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে আসেনি। সর্বশেষ গাদ্দাফিরও পতন হয়েছে। লিবিয়াকে বলা হয় উত্তর আফ্রিকায় যাওয়ার দরজা বা ধেঃবধিু। লিবিয়া যদি নিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর (নাইজার, সাদ, গিনি বিসাউ) দেশগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। আফ্রিকায় ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে AFRICOM আফ্রিকান কমান্ড। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার যে মানসিকতা, তা সামনে রেখেই পতন ঘটানো হলো গাদ্দাফি সরকারের।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথাকথিত 'যুদ্ধ' শুরু করেছিল বুশ প্রশাসন। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে ওবামা সেই যুদ্ধ বন্ধ করেননি। মার্কিন সমরাস্ত্র কারখানাগুলোতে উৎপাদন বেড়েছে। বিশ্বের সর্বত্র, বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরাক_সর্বত্রই আমেরিকার কম্পানিগুলোর রমরমা ব্যবসা। নাইন-ইলেভেন এই ব্যবসার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফিনিয়ান কানিংহামের প্রবন্ধ '9/11 paved the way for America's permanent war of Aggression'-এ এ কথাই বলা আছে। আর মিসেল চসুডোভক্সি তো স্পষ্ট করে বলেছেন, 'alleged Jihadi plotters were the product of us state terrorism.' ... অনলাইনে চমস্কির বই ৯/১১ : was there an alternative (seven stories press) কেউ পড়ে দেখতে পারেন। তাই 'নাইন ইলেভেন' নিয়ে যে অসংখ্য প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা, ১০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও আমরা এর পূর্ণ জবাব খুঁজে পেলাম না। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু হয়েছে সত্য, কিন্তু আল-কায়েদা ধ্বংস হয়ে যায়নি। তারা তাদের স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন এনেছে। অঞ্চল ভিত্তিতে আল-কায়েদা এখন সংগঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। যেমন-সৌদি আরবভিত্তিক Al-Qaeda in Arabian Peninsula (AQAP), রিয়াদে ২০০৩ সালে হামলার জন্য যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২০০৪ সালে ইরাকে সংগঠিত হয়েছে AQI বা Al-Qaeda in Iraq। ২০০৭-এ জন্ম হয়েছে Al-Qaeda in Islamic Magreb (AQIM)। ছোট ছোট সেল-এ বিভক্ত হয়ে তারা এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যাকে বলা হচ্ছে 'Spider Web'। মাকড়সার জালের মতো সংগঠিত হচ্ছে, আবার তারা ধ্বংসও হচ্ছে। এরপর অন্য এক জায়গায় গিয়ে তারা সন্ত্রাসের জাল বুনছে, মাকড়সারা যেমনটি করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে একরকম যোগাযোগ ছাড়াই এই জিহাদি কর্মকাণ্ড পরিচালনার তত্ত্ব দিয়েছেন আল-কায়েদার একজন তাত্ত্বিক আবু মুসাব আল সুরি (The Global Islamic Resistance)। নোয়াম চমস্কি তাই লিখেছেন, The Jihadi movement could have been split and undermined after 9/11 if the 'crime against humanity' had been approached as a crime (was war only answer to 9/11? nation of change, 5 september, 2011)। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডকে সত্যিকার অর্থেই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ব্যবহার করা হয়েছে গোষ্ঠীস্বার্থে তথা ব্যবসায়িক স্বার্থে। ইরাক তার বড় প্রমাণ। ইরাকের তেলের পয়সায় এখন সেখানে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আর এককভাবে কাজ পেয়েছে মার্কিন কম্পানিগুলো। একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে এখন লিবিয়ায়। 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' একটি জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিভিন্ন চোখে দেখা হতো। এখন পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছ, এটা সত্য। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান 'নাইন-ইলেভেন'-এর আগের অবস্থায় আর ফিরে যায়নি। 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' একটি কালো অধ্যায়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা এই 'যুদ্ধ' প্রকারান্তরে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার প্রয়াসেই রচিত। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যায়নি। বরং তা আরো বেড়েছে। সারা বিশ্ব যখন টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার দশম বর্ষ পালন করছে, তখন কাবুলের কূটনীতিকপাড়ায় তালেবানদের হামলা (১৩ সেপ্টেম্বর) এ কথাই প্রমাণ করল আবার।
তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

এ যুদ্ধের শেষ কোথায়?

যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ১০ বছর আগে, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছিল নাইন-ইলেভেনের মতো ঘটনা। ১৯ সদস্যের একটি দল চার ভাগে বিভক্ত হয়ে চারটি বিমান হাইজ্যাক করল। দুটো আছড়ে পড়ল নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে, একটি ভার্জিনিয়ায় পেন্টাগন সদর দফতরে, অপর একটি বিধ্বস্ত হল পেনসিলভিনিয়ার একটি মাঠে। সারাবিশ্ব জানল ‘আল-কায়দা’ নামের একটি সংগঠন ওই হামলা চালিয়েছে, আর এর নেতা হচ্ছেন ওসামা বিন লাদেন। সেই ওসামা বিন লাদেনকে পাওয়া গেল পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে, দুই স্ত্রীসহ গত পাঁচ বছর ধরে এখানেই তিনি অবস্থান করছিলেন। ১ মে রাতে (২০১১) মার্কিন নেভির কমান্ডোরা সেই লাদেনকে হত্যা করল। মৃতদেহ ভাসিয়ে দিল আরব সাগরে কোন ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই। টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী বিমান হামলার পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ শুরু করেছিলেন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। টার্গেট করা হয়েছিল মুসলমানদের। ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করার পর ২০০৩ সালে দখল করা হল ইরাক, আর ২০১১ সালে এসে বোমা হামলা চালিয়ে লিবিয়া থেকে উৎখাত করা হল গাদ্দাফিকে। এই যে ‘যুদ্ধ’, তা কি শেষ হয়েছে? ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন, তখন কিন্তু তিনি ঘোষণা করেননি যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

আজ হিসাব-নিকাশের পালা- এই যুদ্ধ বিশ্বকে কী দিয়েছে। কিংবা যুক্তরাষ্ট্রইবা এ যুদ্ধ থেকে কতটুকু উপকৃত হয়েছে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পরিচালনা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ যেখানে বলা হচ্ছে ছয় ট্রিলিয়ন ডলারের কথা (Global Research-এর মতে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এর পরিমাণ তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার), সেখানে বাংলাদেশের পাঠকরাও জেনেছেন (১৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ছয়জনের একজন গরিব। দেশটির চার কোটি ৬২ লাখ মানুষ এখন বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে, শতকরা হারে যা ১৫ দশমিক ১। ২০০৯ সালে এ হার ছিল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা সরকারি তথ্য। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে আবার আফ্রো-আমেরিকান এবং হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর হার বেশি (২৭ দশমিক ৪ এবং ২৬ দশমিক ৬)। যুক্তরাষ্ট্রের গত ৫২ বছরের ইতিহাসে এই হার সর্বোচ্চ। বাংলাদেশী-আমেরিকান যারাই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তারা অনেকেই এখন চাকরি হারানোর আশংকা করছেন। যে যুদ্ধের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা বহন করেন, সেখানে নতুন করে চাকরির সংস্থান করা হচ্ছে না। অনেকেই রয়েছেন স্বাস্থ্য-শিক্ষার বাইরে। এ সংখ্যা পাঁচ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৩ ভাগ। অথচ যুদ্ধের জন্য খরচ হচ্ছে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার! বাংলাদেশী টাকায় এর পরিমাণ ৪৪৪ কোটি লাখ টাকা (ডলারপ্রতি ৭৪ টাকা হিসাবে)। কী বিশাল বাজেট! এর একটা অংশ দিয়ে নতুন চাকরির সংস্থান করা যায়, স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের দিকে খেয়াল নেই ওবামাদের। যুদ্ধ তাদের দরকার। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর যে সূচনা করেছে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের হিসাবে খরচের পরিমাণ তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার। পেন্টাগনের হিসাবমতে প্রতি মাসে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ নয় দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার (যার তিন ভাগের দুই ভাগ খরচ হয় আফগানিস্তানে)। প্রশিক্ষণ, অস্ত্রশস্ত্র ও ড্রোন বিমান হামলা চালাতে এই খরচ হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রকে মহাশূন্যে একটি শাটল মহাকাশযান পাঠাতে খরচ হয়েছিল এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগন ইরাক ও আফগানিস্তানে গত ৪০ মাসে খরচ করেছে ৩৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা বয়োজ্যেষ্ঠদের স্বাস্থ্যবীমা খাতে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে গত ১০ বছরে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু সেনাদের ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি তেল (আফগানিস্তান) বাবদ (অক্টোবর, ২০১০ থেকে মে, ২০১১) যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে তেল সরবরাহ ও জনশক্তির খরচ হিসাব করা হতো, তাহলে প্রতি গ্যালন তেলের মূল্য গিয়ে দাঁড়াত ১০০ ডলারে। প্রতি বছর সেখানে অর্থাৎ আফগানিস্তানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে (শুধু সেনাদের জন্য) যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ছিল পাঁচ লাখ সাত হাজার ডলার (বছরে)। ২০১০ সালে এটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৬৭ হাজার ডলারে। আর ২০১১ সালে এই খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ছয় লাখ ৯৪ হাজার ডলারে। এটা কংগ্রেশনাল রিপোর্ট। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরাকে ২০০৭ সালে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য বছরে খরচ ছিল পাঁচ লাখ ১০ হাজার ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আট লাখ দুই হাজার ডলারে। ২০১১ সালে কংগ্রেস আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ইরাকের জন্য বরাদ্দ ৪৬ বিলিয়ন (২০১২ সালের জন্য বরাদ্দ কিছুটা কমেছে ১০৭ বিলিয়ন ও ১১ বিলিয়ন ডলার)। বলা ভালো, ইরাক থেকে ‘ক্যামবেট ট্র-পস,’ অর্থাৎ যুদ্ধরত সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য রয়ে গেছে, যারা শুধু প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত। অন্যদিকে ওবামা ঘোষণা করেছেন ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে (ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য দেখুন McClatchy Newspaper-এর প্রতিবেদন ১৫ আগস্ট, ২০১১)।

যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, তা দিয়ে সামাজিক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারত। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে (১১৩ বিলিয়ন, ২০১১-১২), সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে- ক. ৫৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশুর (নিম্ন আয়ের পরিবারের) স্বাস্থ্যসেবা খ. ২৩ মিলিয়ন নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ. ২০২ মিলিয়ন ছাত্রের বৃত্তি ঘ. ১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা ঙ. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ১৪ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই সঙ্গে প্রাথমিক স্কুলে ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন শিক্ষক ও ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন পুলিশ অফিসার নিয়োগ এবং ৬৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব।

প্রশ্ন এসে যায়, আর কতদিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র পেছনে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করবে? ওবামা শান্তিবাদী নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল তিনি যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু দেখা গেল, যে শক্তি সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ পরিচালনা করেছিল, তারাই ওবামাকে পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট হাউস, সমরাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শক্তি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে পরিচালনা করছে। ওবামা এদের ওপর নির্ভরশীলও। অধ্যাপক মিশেল চসুডোভস্কি তার একাধিক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই উপকৃত হয়েছে এবং তার নিজ স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে। আল কায়দা তথা ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছিল ১৯৭৯ সালে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল ওসামা বিন লাদেনকে। আজ সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আল কায়দার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ‘যুদ্ধ’ শুরু করলেও অধ্যাপক পিটার ডেল স্কট দেখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে, যেখানে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি, সেখানে আল কায়দাকে ব্যবহার করেছিল (দেখুন Prof. Peter Dale Scot, US-Al Qaeda's Alliance; Bosnia, Kosovo & now Libya- Washington's on going collusion with terrorist, global Research, 29.7.11)। আর অধ্যাপক চসুডোভস্কি তো সরাসরিই মন্তব্য করেছেন, ‘alleged jihadi ploters were the product of US state terrorism’। ১০ বছর আগে নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ওই ঘটনা নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রায় সবই একতরফাভাবে লিখিত।

প্রবন্ধগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অভিযোগ আনা হয়েছে। তবু এর মাঝেও দু-একজন বিশেষজ্ঞকে দেখা গেছে যারা ওই ঘটনার জন্য মার্কিনি আগ্রাসী শক্তিকে দোষ চাপিয়েছেন। নোয়াম চমস্কি এদের মাঝে অন্যতম। চমস্কির বাইরে যারা বিভিন্ন জার্নালে অধ্যাপক স্টেফেন জুনেস (Prof. Stephen Zunes, University of San Francisco), (Prof. Marry Ellen Connell, Notre Dame), অধ্যাপক মিশেল হাস, অধ্যাপক রবার্ট ফারলের লেখা পাঠ করেছেন, তারা দেখেছেন এরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখেছেন। এরা বলার চেষ্টা করেছেন, একটি ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ সামনে রেখেই ‘নাইন-ইলেভেন’ সংগঠিত করা হয়েছিল। অধ্যাপক হাস ২০০৯ সালে লিখিত তার গ্রন্থে (George W. Bush : War Criminal?) সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করার জন্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং বিচার দাবি করেছিলেন। তিনি পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছিলেন, যার কারণে ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে বুশকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা যায়। কারণগুলো হচ্ছে- ১. গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহযোগিতা ২. আগ্রাসী যুদ্ধের সূচনা ৩. আগ্রাসী যুদ্ধের পরিকল্পনা ৪. যুদ্ধের সূচনা করার জন্য ষড়যন্ত্র ৫. যুদ্ধের জন্য প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা। মার্কিন নীতির কঠোর সমালোচক নোয়াম চমস্কি তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, যদি সত্যিকার অর্থে নুরেমবার্গ যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য প্রণীত আইন অনুসরণ করা যায় (International Military Tribunal at Nuremberg, 1945), তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। এটাই হচ্ছে আসল কথা। হাজার হাজার মানুষকে হত্যার জন্য বুশ কিংবা ওবামাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনকে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে তুলে না দিয়ে অপর একটি দেশের সার্বভৌমত্ব লংঘন করে তাকে হত্যা করা হয়। ওসামা বিন লাদেন নিঃসন্দেহে অন্যায় করেছেন। তার বিচার হওয়া উচিত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করলেও এটা শেষ হবে, তা মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ায় ‘তৃতীয় যুদ্ধ’ শুরু করেছে। গাদ্দাফি উৎখাত হয়েছেন। একজন ‘হামিদ কারজাই’কে পাওয়া গেছে সেখানে। তিনি হচ্ছেন মুস্তফা আবদুল জলিল। জলিল ছিলেন একসময়ে গাদ্দাফির বিচারমন্ত্রী। বর্তমানে জাতীয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। লিবিয়ার পাশাপাশি সিরিয়ায়ও গঠিত হয়েছে একটি জাতীয় পরিষদ। এখন কবে নাগাদ বাশার আল আসাদ উৎখাত হন, সেটাই দেখার বিষয়। ‘যুদ্ধ’-এর ক্ষেত্র এখন বদলে যাচ্ছে, আফগানিস্তান থেকে লিবিয়া। লিবিয়ার তেলসম্পদ সেখানে ‘যুদ্ধ’কে প্রলম্বিত করবে। পশ্চিমাদের স্বার্থ ওখানে বেশি। প্রথমত জ্বালানি তেল আর দ্বিতীয়ত লিবিয়া হচ্ছে ‘আফ্রিকার গেটওয়ে’, অর্থাৎ আফ্রিকায় যাওয়ার রাস্তা। ইউরেনিয়ামসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে পূর্ব আফ্রিকায়, বিশেষ করে নাইজার, শাদ কিংবা গিনি-বিসাউয়ে। আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি কমান্ড। এখন লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলো। লিবিয়া দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হবে আফ্রিকা। তাই লিবিয়ায় ‘যুদ্ধ’টা প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফির পতনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হবে না। নতুন আঙ্গিকে যুদ্ধ পরিচালিত হবে। আফগানিস্তানে ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ গঠনের সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, এখন ঠিক তেমনি আফ্রিকায়ও ন্যাটোর আফ্রিকা সংস্করণ গঠনের প্রশ্ন উঠবে। তাই অদূর ভবিষ্যতে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বন্ধ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। 
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

মমতার মন গলাতে মনমোহনের উদ্যোগ

১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ, ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য রাখার একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু'দেশের মধ্যে বণ্টন করে ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এরকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে হঠকারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল (নয়াদিগন্ত, ৬ মে ২০০৮)। এই যখন পরিস্থিতি তখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেছিলেন নদীর উপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি হবে। এ কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশের স্বার্থ এতে করে কতটুকু রক্ষিত হবে? 'নদীর উপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যা' কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারতের বর্তমান অবস্থানটা আমরা জানি না। শেষ পর্যন্ত কী মমতার দাবির কাছে নতি স্বীকার করে আমরা একটা সমঝোতা করতে যাচ্ছি? এতে করে কী বাংলাদেশের হিস্যা এখন কমে যাবে? ধারণা করছি চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা বিস্তারিত জানতে পারবো। কিন্তু ততদিনে তো করার কিছুই থাকবে না। আন্তর্জাতিকভাবে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, হুট করে সেই চুক্তি বাতিল করা যায় না। এতে আন্তর্জাতিক আসরে একটি দেশের (এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ) ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বাংলাদেশের কোনো সরকারের পক্ষেই ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। অতীতে বিএনপি সরকারও পারেনি। তারা চুক্তির সমালোচনা করেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়ে যে চুক্তি হবে আগামীতে তা নিয়েও কথা আছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় আমরা এ ধরনের কথা শুনেছিলাম। আমরা রাজি হয়েছিলাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ভারতকে প্রত্যাহার করে নেয়ার। কিন্তু এতে করে, অর্থাৎ ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হলে নদীর নিচু এলাকায় বাংলাদেশের নদী ও তীরবর্তী বিশাল অংশ শুকিয়ে যাবে। প্রত্যাহারকৃত পানি দিয়ে ভারত তার সেচ প্রকল্পগুলো শুরু করতে পারবে। এই বর্ষাকালেও ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ এলাকায় ফেনী নদীর প্রশস্ততা ১০০ মিটারের কমে নেমে এসেছে। শীতকালে পানি তলানিতে গিয়ে পেঁৗছবে। সৃষ্টি হবে বালুচরের।
মমতা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থেই চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি দিলেন না। মমতার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল অঞ্চলে মমতার পক্ষে মিছিল হয়েছে। এতে করেই বোঝা যায় কেন মমতা চুক্তি স্বাক্ষরে তার সম্মতি দেননি। মমতা রাজনীতি করেন। বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তাদের ভোট পেয়েছেন। সামনে উপনির্বাচন এবং পঞ্চায়েত নির্বাচন। তার জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মমতার এই পিছুটান। এখন মমতাকে রাজি করাবে কে? আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। বিধানসভার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মমতা ব্যানার্জিকে ফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও প্রটোকল অনুযায়ী একজন প্রধানমন্ত্রী একজন মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন না। তবে 'রাজনীতির স্বার্থে' অনেক সময় প্রটোকলের বাইরেও যেতে হয়। শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন। কেননা তিনি জানেন মমতকে তার প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে মমতাকে প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশের। কেননা মমতা ভারতের কেন্দ্রীয় ইউপিএ সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখেন। মন্ত্রিসভায় জাতীয় কংগ্রেসের বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, প্রয়োজনে তিস্তার পানি চুক্তির ব্যাপারে শেখ হাসিনা কলকাতা যেতেও রাজি। এটি কোন সরকারি সূত্র নয়। সংবাদটির সত্যতাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একজন দূতকে পাঠাতে পারেন কলকাতায়। আর ভারতের অভিজ্ঞতা বলে 'কোনো আমলাকে' দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কোনো উপদেষ্টা নয়, বরং 'একজন রাজনীতিবিদ'ই পারেন সমাধানের পথ খুঁজতে। আমরা মমতা ব্যানার্জিকেও বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাতে পারি। তাকে দেখাতে পারি পানির অভাবে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। আমার বিশ্বাস, মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করানো আমাদের জন্য কোনো কঠিন কাজ হবে না আগামীতে। 
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com


জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা দরকার

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়। জোট সরকারের আমলে ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ৮২১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তাদের চাকরিচ্যুত করে। এ চাকরিচ্যুতকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের নিয়োগ ও উচ্চ আদালত কর্তৃক তাদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা নতুন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়ে এলো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ওই নিয়োগের বিষয়টি সম্পর্কে আমার ধারণা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে থাকাকালে আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছি এবং একটি সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও জমা দেওয়া হয়েছে। এ মুহূর্তে চাকরিচ্যুত ৮২১ জনের কিছু করার আছে বলেও আমার মনে হয় না। কেননা নিয়োগের ক্ষেত্রে ভুয়া বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। এটা নিয়ে একজন প্রভাষকের মামলাও হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এখন হাইকোর্ট তাদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এ রায় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না; কিন্তু যেটা ভালো হতো, শোভন হতো তা হচ্ছে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা। তাহলে সব ধরনের বিতর্ক এড়ানো যেত। আপিল বিভাগের একটি রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও ভালো হতো, তাহলে কারও কিছু বলার সুযোগ থাকত না। গত প্রায় ৭ বছর ধরে অনেকে কাজ করেছেন, প্রমোশনও পেয়েছেন। তাদের পরিবার-পরিজন, সন্তানও আছে। তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লেন। তাদের অনেকেরই আজ সরকারি চাকরির বয়স নেই। তারা এখন কোথায় যাবেন? এ মানবিক দিকটি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে যেতে পারত।
এখন আদালতের একটি রায় হয়েছে। ওই রায়কে সামনে রেখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন কারও কিছু বলার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রশাসন চালাতে হলে নতুন করে লোক নিয়োগ করতে হবে। সমস্যাটা হবে এখানেই। এখানে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। দলীয় বিবেচনায় লোক নিয়োগের অভিযোগ উঠবে। কেননা সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক তথা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় একাধিক সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একটি সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজগুলোতে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে; কিন্তু অনার্স পড়ানোর যোগ্য শিক্ষক সেখানে নেই। আমি পিরোজপুর কলেজের এক সময় ছাত্র ছিলাম। সেখানে এখন বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স রয়েছে। শিক্ষকরা সেখানে ক্লাস নেন না। ছাত্রছাত্রীদের বাধ্য করেন কোচিং করতে। ব্যাচে ব্যাচে ছাত্রছাত্রীরা কোচিং করে। ইংরেজির মতো বিষয়ে অনার্স রয়েছে। শিক্ষক মাত্র একজন। তিনি আদৌ ক্লাস নেন না। অথচ ওই কলেজে ইন্টারমিডিয়েট শাখা আছে। ডিগ্রিও রয়েছে। তারপর অনার্স। একজন শিক্ষক যদি আদৌ ক্লাস না নেন তাহলে ছাত্রছাত্রীরাই-বা কী করবে? তাদের ভরসা ঢাকার নিলক্ষেতের গাইডবই। যখন এ নিবন্ধটি লিখছি তখন চোখ আটকে গেল একটি প্রতিবেদনের ওপর। একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে উলিপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের কথা। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৮৭ সালে জাতীয়করণকৃত এ কলেজটিতে শিক্ষক মাত্র ৮ জন। ইংরেজি, গণিত, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। উলিপুর কলেজের এ চিত্র পাওয়া যায় অন্যত্রও। শিক্ষক নেই। অথচ অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। ছাত্রদের ভরসা ওই গাইডবই। এভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ অনার্স গ্র্যাজুয়েট আমরা তৈরি করছি। অথচ এ সমাজে এত অনার্স গ্র্যাজুয়েটের আদৌ প্রয়োজন নেই। এ বিষয়টি নিয়ে কেউ ভাবেন না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রয়াত আফতাব আহমেদ এক তুঘলকি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু 'শিক্ষক' নিয়োগ দিয়েছিলেন; কিন্তু যিনি শিক্ষক, তিনি তো ছাত্র পড়াবেন। না, যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের 'শিক্ষক' তারা ছাত্র পড়ান না। তাদের কাজ হচ্ছে ডিগ্রি, অনার্স (৪ পার্ট) ও মাস্টার্সের প্রশ্নপত্র তৈরি করা, শত শত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন কলেজে যাওয়া। শুধু প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষক কি তার দায়িত্ব শেষ করতে পারেন! বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্যোগী হয়েছিলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক উপাচার্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন তথাকথিত \'শিক্ষকদের\' দিয়ে বিভিন্ন কলেজে অনার্স পর্যায়ে পাঠদান। শিক্ষকরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল তারা \'বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক\', তারা কলেজে কেন যাবেন? তারা কলেজের ছাত্রদের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে রাজি (কেননা এর সঙ্গে সম্মানীর প্রশ্ন জড়িত), ক্লাস নিতে রাজি নন। ওই উপাচার্য আমাকে তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছিলেন। আজ আদালত ওই শিক্ষকদের কাউকে যদি চাকরিচ্যুতির আদেশ দেন, তাহলে যুক্তি হিসেবে সেটাই সঠিক। যিনি ছাত্র পড়াবেন না তিনি শিক্ষক হতে পারেন না। শুধু উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন নেই।
আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানাই। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তার পক্ষে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া দুরূহ। সিদ্ধান্তটি নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো প্রধানমন্ত্রী বিবেচনায় নিতে পারেন। এক. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো ভেঙে ৭টি বিভাগীয় শহরে ৭টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এখানে সরকারের তেমন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না। কেননা বিভাগীয় শহরে অবস্থিত ৭টি পুরনো কলেজকে সামনে রেখে, ওইসব কলেজকে কেন্দ্র করেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অবকাঠামো রয়েছে। ল্যাবও রয়েছে। পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকও রয়েছেন। সুতরাং কিছু কিছু বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা সম্ভব। প্রয়োজনে একেকজন জাতীয় নেতার নামে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। দুই. গাজীপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবকাঠামো রয়েছে, সেখানে পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা। সেখানে পোস্টগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা সম্ভব। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের পোস্টগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তিন. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো ভেঙে দিলেও সেখানে কর্মরত শিক্ষক তথা কর্মচারীদের চাকরি হারানোর ভয় থাকবে না। কেননা তাদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আত্তীকরণ ঘটবে। সুতরাং অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
আজ সময় এসেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চিন্তা করার। আমার দুঃখ হয়, যারাই মঞ্জুরি কমিশনে চেয়ারম্যান কিংবা সদস্য হয়ে আসেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে কেউ ভাবেন না। শক্ত হাতে কেউ একটা সিদ্ধান্ত নেন না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রধানমন্ত্রীর যথেষ্ট আস্থাভাজন। তিনি পারতেন একটি সিদ্ধান্ত নিতে; কিন্তু সুবিধাভোগীদের চাপের মুখে তিনি নতি স্বীকার করেছিলেন। এখন উচ্চ আদালতের একটি রায়ের আলোকে তিনি বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শুধু একটি সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে রেখে দেব, নাকি সত্যিকার অর্থেই জ্ঞান ও মেধা চর্চার একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করব। এটা করতে হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ভেঙে দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

ঢাকা-দিল্লি যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে????

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের পর গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও নয়াদিল্লি থেকে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে মোট ৬৫টি দফা রয়েছে। এই দফাগুলো যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে বেশ ভালোভাবে কিছু কথা বলা হয়েছে, আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ের ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক কথা বলা হয়নি। ইশতেহারে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূলত কূটনৈতিক ভাষা। মনমোহনের সফরের ব্যাপারে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু যৌথ ইশতেহারের বক্তব্য থেকে আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং আমাদের হতাশই করবে। বলা হয়েছে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির লক্ষ্যে এ পর্যন্ত যেসব মুখ্য ও টেকনিক্যাল বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে দুই প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরে আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে দু’দেশের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়ছে বলেও যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়নি ‘মুখ্য ও টেকনিক্যাল বিষয়ে’ কী সমঝোতা হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মমতা ব্যানার্জির সম্মতি ছাড়া ওই ‘মুখ্য ও টেকনিক্যাল’ বিষয় অকার্যকর। যে সমঝোতা হয়েছিল, তা কাজে আসবে না। মনে রাখতে হবে মমতা ব্যানার্জি ভারতীয় স্বার্থকেই দেখবেন। আর মনমোহনেরও প্রয়োজন রয়েছে মমতাকে। সুতরাং আগামী ৩ মাসের মধ্যে আমি কোনো চুক্তির সম্ভাবনা দেখছি না। এছাড়া বিভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ব্যাপারে যৌথ নদী কমিশনে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাবার কথাও বলা হয়েছে। এটাও সময়ক্ষেপণ করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে সড়ক, রেল ও নৌপথে ট্রানজিটের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার কথাও বলা হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। এতে লাভ ভারতের। বাংলাদেশকে ট্রানজিট দেয়ার কথা (নেপাল ও ভুটান) ইশতেহারে উল্লেখ থাকলেও, ভারত তার রাস্তাঘাট উন্নয়নের কোনো অর্থ ব্যয় করবে কিনা তা উল্লেখ নেই। ভারত তার স্বার্থে অবকাঠামো নির্মাণে (ট্রানজিটের জন্য) বাংলাদেশকে ঋণ (যা বাংলাদেশকে উচ্চসুদে পরিশোধ করতে হবে) দেবে, সে কথাটা ইশতেহারে উল্লেখ আছে। পণ্য, সেবা, তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতি বিনিময়ের কথা ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। এতে করে এসব সেক্টর ভারতীয়দের জন্য আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম কিনা, সেটা বড় প্রশ্ন এখন। মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় যেসব চুক্তি, সমঝোতা ও প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ থাকলেও তিনবিঘা করিডোর খোলা রাখার বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে নেই। এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা হলেও পত্র-পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছে ভারতের বিজেপির বিরোধিতার কথা। এখন এই সিদ্ধান্ত কতটুকু কার্যকর হয়, কিংবা এটা নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা অত্যন্ত সাদামাটা ধরনের। এজন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাংলাদেশ সফরের প্রয়োজন ছিল না। যেমন বলা যেতে পারে বাঘ রক্ষার প্রটোকল, সুন্দরবন সুরক্ষা, টেলিভিশন সম্প্রচার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফ্যাশন টেকনোলজি, মৎস্য খাতে সহযোগিতা, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি ও জেএনইউ) মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। এসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীই যথেষ্ট। মনমোহন সিংয়ের মতো একজন প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসার প্রয়োজন ছিল না। উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি কিংবা নেপালকে ট্রানজিট দিতে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সে ব্যাপারেও আরো কথা রয়েছে। নেপালকে ট্রানজিট দেয়া সম্পর্কিত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এখন আবার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো।
উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ট্রানজিট সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেনি এবং এতে করে আমাদের কেউ কেউ উৎসাহিত হতে পারেন বটে। কিন্তু সহযোগিতা চুক্তিটি যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে পরোক্ষভাবে এতে ট্রানজিটের কথাই বলা হয়েছে। চুক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রকারান্তরে ট্রানজিটেরই নামান্তর। উন্নয়ন সহযোগতিা চুক্তিতে বলা হয়ছে উপআঞ্চলিক সহযোগিতার কথা। বলা হয়েছে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করার কথা, বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর। এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে ভূ-খণ্ড ব্যবহার করার সম্ভাবনাও এতে করে তৈরি হলো। এই চুক্তিতে ভারত অদূর ভবিষ্যতে তার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে। চুক্তিতে যে ভাষা ও বক্তব্য রয়েছে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমার ধারণা ভারতের আমলারা অত্যন্ত সুকৌশলে এ ধরনের ‘শব্দ’ ও ‘বক্তব্য’ ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ট্রানজিট আদায় করে নিল। কেননা, তারা ভালো করে জানেন সরাসরি ট্রানজিট সংক্রান্ত কোনো চুক্তি এ দেশের জনগণ মানবে না। বিরোধী দলের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে ট্রানজিটের ব্যাপারে। উপরন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে সরাসরি ট্রানজিট সংক্রান্ত একটি চুক্তি করে আওয়ামী লীগকে একটি ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিতে চায় না নয়াদিল্লি। তাই পরোক্ষভাবে তারা এটা আদায় করে নিল। এজন্য উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হাওয়াও জরুরি। বিএনপি এখন সংসদে গিয়ে এই চুক্তিটির ব্যাখ্যা দাবি করতে পারে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই। ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তির (যার ধরন ছিল অনেকটা সামরিক ও চুক্তির ৮, ৯, ১০নং ধারা ছিল স্পর্শকাতর) মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর (১৯৯৭), কোনো পক্ষই আর চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি।
এই চুক্তিতে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা এবং ভারত এটিই চায়। ট্রানজিট বা করিডোরের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা বাহ্যত উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্যই চাওয়া হচ্ছে। ভারত কিন্তু আজই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা চাচ্ছে না। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়া বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ১৯৯৭) এটা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে, ভারত ও বাংলাদেশ ৪টি দেশ নিয়ে (বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপাল) একটি উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনে রাজি হয়েছে। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে তখন রাখা হয়েছিল উন্নয়নের চতুর্ভুজ বা ঝড়ঁঃয অংরধহ এৎড়ঃিয ছঁধফৎধহমষব (ঝঅএছ)। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে কাঠমাণ্ডুতে  অনুষ্ঠিত চারদেশীয় পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে ঝঅএছ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ঝঅএছ এ সদস্য ভারতবর্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যকে। দীর্ঘদিন উন্নয়নের চতুর্ভুজ নিয়ে তেমন কিছু শোনা না গেলেও, মনমোহনের ঢাকা সফরের মধ্যদিয়ে এই ধারণাটি আবার সামনে চলে আসলো।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে স্কুলে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের পাশাপাশি লোক প্রশাসন কেন্দ্র ও মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি এবং পুলিশ একাডেমিতে আইটি সেন্টার স্থাপনের বিষয়টিও যৌথ ইশতেহারে রয়েছে। স্কুলে ল্যাব স্থাপন করার সিদ্ধান্ত ভালো। মিলিটারি ইন্সটিটিউট, পুলিশ একাডেমি কিংবা লোক প্রশাসন কেন্দ্রে ভারতীয় সহযোগিতা আমরা নিতে পারি। কিন্তু ভারতীয় প্রশিক্ষকের আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশে এখন যোগ্য প্রশিক্ষক রয়েছেন। সার্ককে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। অথচ সার্ক এর মূল সমস্যা তো ভারতকে নিয়ে। একমাত্র ভুটান বাদে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশের সাথেই ভারতের সমস্যা রয়েছে। সমস্যাটি মূলত ভারতের আধিপত্যবাদী নীতিকে কেন্দ্র করে। ভারত যদি তার নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তাহলে সার্ক শক্তিশালী হবে না। ইশতেহারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সম্প্রসারণে ভারতের দাবির প্রতি (অর্থাৎ স্থায়ী সদস্যপদ) বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। এই সমর্থন নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কেননা স্থায়ী সদস্যপদে যে যোগ্যতা দরকার, অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক আধিপত্যবাদী নীতি পরিত্যাগ করা, বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্বদান ইত্যাদি ভারত এখনও অর্জন করতে পারেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার এখন জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাও। বাংলাদেশ শুধুমাত্র ভারতের দাবিকে সমর্থন করতে পারে না। ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করার কথাও ইশতেহারে রয়েছে। এটা খারাপ নয়। কিন্তু ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা আদৌ বিনিয়োগে উৎসাহী নন, তারা চান তাদের পণ্য বিক্রি। বাংলাদেশ বাহ্যত ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ হচ্ছে বিশাল একটি বাজার। ভারত এই সুবিধাই নিয়েছে। অথচ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণাও আমি যৌথ ইশতেহারে খুঁজে পাইনি। বিটিভির সাথে ভারতীয় দূরদর্শনের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইশতেহারেও আছে কথাটা। কিন্তু বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো যাতে ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রচার হয়, সে ব্যাপারে ভারতীয় উদ্যোগের কথা ইশতেহারে নেই। যদিও বিষয়টি বেসরকারি পর্যায়ের, তবুও এখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, তা বলা যাবে না। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় যেসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং যৌথ ইশতেহারে যেসব কথা বলা হয়েছে, তাতে মূলত ভারতীয় স্বার্থই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এখানে তুলনামূলক বিচারে কম। বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, যা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্রীয় সফরের পর সাধারণত যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়। এটা এক ধরনের রেওয়াজ ও বাধ্যবাধকতাও বটে। এই ইশতেহারেও বাংলাদেশের জন্য কোনো আশার বাণী নেই।
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com 

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথে মূল বাধা

আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। জাতিসংঘের আহ্বানে ২০০৮ সাল থেকে দিবসটি পালন করে আসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে বড় বিস্ময়ের বিষয় হল- ২০০৮ সালে যখন বিশ্ব গণতন্ত্র দিবসের যাত্রা শুরু হয় তখন বাংলাদেশে চলছিল সেনা সমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের শাসন। গণতন্ত্রের জন্য যেখানে নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন, সেখানে তখনকার বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিবিদদের অগণতান্ত্রিক আচরণ ও সংঘাতের কারণেই সেই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। যার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জনগণের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে স্বৈরশাসকদের প্রেত্মাতারা। তবে এদের বিষয় সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
এ প্রসঙ্গে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গিয়াসউদ্দিন মোল্লা রেডিও তেহরানকে বলেছেন, গণতন্ত্রের পূর্বশর্তগুলোর অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক আচরণের কারণে দেশে গণতন্ত্র এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারেনি। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং বিশ্বাসের চরম ঘাটতিকে দায়ী করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের তথ্যানুযায়ী গোটাবিশ্বে গণতন্ত্র উন্নয়নের সূচকে শীর্ষে সুইডেনের অবস্থান। এর ঠিক পরেই আছে নরওয়ে ও ডেনমার্ক। অথচ প্রথম দশটি দেশের মধ্যে নেই গণতন্ত্রের কথিত ধারক যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন। ১৯ নম্বরে ঠাঁয় পেয়ে এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে জাপান। আর গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী দেশ ভারতের অবস্থান রয়েছে ৫৮তম স্থানে। বাংলাদেশের অবস্থান ৮৭তে। বিশ্ব গণতন্ত্রের সার্বিক চিত্রে বাংলাদেশের এতো পেছনে থাকার জন্য এর দুর্বল ভিত্তিকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান রেডিও তেহরানকে বলছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিকাশের পথে মূল বাধা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থাহীনতা এবং প্রধান দু'টি দলের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে কোন দেশেই গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিরোধীদলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে যতদিন সরকারি দল দেশ পরিচালনা করার চেষ্টা করবে ততদিন কোনভাবেই গণতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক চর্চায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে দেশের জাতীয় সংসদ। তারপরও সংসদীয় গণতন্ত্রের সুফল পাওয়ার লক্ষ্যে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক একটি গ্রন্থ যা সাধারণ পাঠকের চাহিদা মেটাতে পারবে


আন্তর্জাতিক রাজনীতি সংক্রান্ত আমার একটি বই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম
বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি

বইটিতে মোট আটটি অধ্যায় রয়েছে। অধ্যায়গুলোতে সোভিয়েট ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়ার কারণ থেকে শুরু করে আরব বসন্ত, চীনের সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত, চীন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, লাদেনের মৃত্যু পরবর্তি বিশ্ব রাজনীতি, কালার রেভ্যূলূশান, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি নানা বিষয় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। পাঠক বৈদেশিক সাহায্য, গ্যাট ও বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার রাজনীতি সম্পর্কেও ব্যপক ধারণা পাবেন। একই সাথে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থটাই হলো প্রধান। এই জাতীয় স্বার্থ বাংলাদেশে সবসময় রক্ষিত হয়েছে, তা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। সনাতন বৈদেশিক নীতিতে বিশ্বজুড়েই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ, জ্বালানি, বিদেশে কর্মসংস্থান ইত্যাদি ‘অপ্রচলিত ধারণা’ এখন বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশকে ২০২১ সাল সামনে রেখে (যখন বাংলাদেশের বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৫০ বছর) তার বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। বৈদেশিক নীতি ঢেলে সাজাতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি ও বিদেশে বাংলাদেশী কর্মীদের কর্মসংস্থানের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।বইটি প্রকাশ করেছে বুকস ফেয়ার। গ্রন্থটি সকল শ্রেনী পেশা, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক ঘরাণার মানুষের চাহিদা পূরণে ও বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। কিন্তু এর রেশ রয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ সফরকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক সফর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য, এই সফরে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। গত ১২ বছরের ব্যবধানে একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন আমাদের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। কেননা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অন্তরায় রয়েছে। এ নিয়ে দুদেশের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ততার সৃষ্টি হলেও, শুধু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের একগুঁয়েমি ও উদাসীনতার কারণে সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হচ্ছিল না। এ কারণেই বিশাল এক প্রত্যাশার বলয় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর, কতগুলো সমঝোতা, চুক্তি ও প্রটোকল স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে সব প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, এটা মনে হয় না। উপরন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। এ কারণেই মনমোহনের বাংলাদেশ সফর সফল হয়েছে, এটা বলা যাবে না। ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের হারাবার কিছু ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা অসফল। ব্যর্থ। প্রথমত, তিস্তার পানিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। এটি হয়নি মূলত মমতা ব্যানার্জির কারণে। বলা হচ্ছে, চূড়ান্ত মুহূর্তে মমতা ব্যার্নাজিকে না জানিয়ে নয়াদিলি্ল চুক্তি করতে যাওয়ায়, মমতা মনে করেছেন এতে করে পশ্চিমবঙ্গকে অবহেলা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঢাকায় আসার জন্য তার নাম তালিকাভুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি নাম প্রত্যাহার করে নেন। তবে এ বক্তব্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেননা মনমোহন সিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এক মাস আগেই চুক্তি সম্পর্কে মমতা ব্যানার্জিকে অবহিত করা হেেছ। কোনটি সত্য আমরা জানি না। তবে এখানে আরো একটি 'থিওরি' কাজ করে_ আর তা হচ্ছে, তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য একটি চুক্তির ব্যাপারে সবার দৃষ্টি এদিকে সীমাবদ্ধ রেখে ভারত অতি কৌশলে তার স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে। আমরা যদি স্বাক্ষরিত উন্নয়ন ও সহযোগিতাসংক্রান্ত চুক্তিটি পর্যালোচনা করি, তাহলে এ সত্যটি প্রমাণিত হবে। দ্বিতীয়ত, ভারত ৪৬টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এখানেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। ৪৬টি আইটেমের মাঝে ৪৫টি আইটেমই গার্মেন্ট আইটেম। এ থেকে বাংলাদেশের আয় অতি সামান্য। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি, এই বাণিজ্য ঘাটতি ৪৬টি পণ্য শুল্কমুক্ত রফতানি করে কমানো যাবে না। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ এই ৪৬টি আইটেম ভারতে রফতানি করে আয় করেছে মাত্র ৩৭ লাখ ডলার (কালের কণ্ঠ, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১১)। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি, তা এই ৪৫টি গার্মেন্ট পণ্য রফতানি করে কমানো যাবে না। তৃতীয়ত, আমরা চেয়েছিলাম স্পর্শকাতর তালিকায় থাকা ৪৮০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। কিন্তু আমরা এ সুবিধা পাইনি। সার্কের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেটা আমাদের দেয়নি। চতুর্থত, যে ৪৫টি গার্মেন্ট আইটেম শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে, তা ভারতের উদ্যোক্তারা নিজেরাই তৈরি করে। ফলে বাংলাদেশি পণ্যকে সেখানে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। পঞ্চমত, আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি সার্টিফিকেট ও লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) প্রয়োজন হয়। এই দুটি পর্যায়ই বাংলাদেশের জন্য কিছুটা অসুবিধা তৈরি করবে। বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেট তারা গ্রহণ করে না। এ ছাড়া ভারতীয় স্থলবন্দরের সবগুলোতে কাস্টম হাউজ নেই। ষষ্ঠত, ছিটমহল বিনিময় নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, সেখানে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দিনই পঞ্চগড়ে ও কুড়িগ্রামে অনশন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ভবিষ্যৎই এখন বলে দেবে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে আদৌ কোনো জটিলতা তৈরি হবে কি না।
সপ্তমত, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে স্কুলে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের পাশাপাশি লোক প্রশাসন কেন্দ্র ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং পুলিশ অ্যাকাডেমিতে আইটি সেন্টার স্থাপনের বিষয়টিও যৌথ ইশতেহারে রয়েছে। স্কুলে ল্যাব স্থাপন করার সিদ্ধান্ত ভালো। মিলিটারি ইনস্টিটিউট, পুলিশ অ্যাকাডেমি কিংবা লোক প্রশাসন কেন্দ্রে ভারতীয় সহযোগিতা আমরা নিতে পারি। কিন্তু ভারতীয় প্রশিক্ষকের আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশে এখন যোগ্য প্রশিক্ষক রয়েছেন। অষ্টমত, সার্ককে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। অথচ সার্কের মূল সমস্যা তো ভারতকে নিয়েই। একমাত্র ভুটান ও আফগানিস্তান বাদে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশের সঙ্গেই ভারতের সমস্যা রয়েছে। সমস্যাটি মূলত ভারতের আধিপত্যবাদী নীতিকে কেন্দ্র করে। ভারত যদি তার নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তাহলে সার্ক শক্তিশালী হবে না। নয়, ইশতেহারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সম্প্রসারণে ভারতের দাবির প্রতি (অর্থাৎ স্থায়ী সদস্যপদ) বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। এই সমর্থন নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কেননা স্থায়ী সদস্যপদে যে যোগ্যতা দরকার, অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, আধিপত্যবাদী নীতি পরিত্যাগ করা, বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব দান ইত্যাদি, ভারত এখনো অর্জন করতে পারেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার এখন জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাও। বাংলাদেশ শুধু ভারতের দাবিকে সমর্থন করতে পারে না। দশ, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করার কথাও ইশতেহারে রয়েছে। এটা খারাপ নয়। কিন্তু ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা আদৌ বিনিয়োগে উৎসাহী নন, তারা চান তাদের পণ্য বিক্রি। বাংলাদেশ বাহ্যত ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ হচ্ছে বিশাল এটি বাজার। ভারত এই সুবিধাই নিয়েছে। অথচ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি এ-সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণাও আমি যৌথ ইশতেহারে খুঁজে পাইনি। এগারো, বিটিভির সঙ্গে ভারতীয় দূরদর্শনের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইশতেহারেও আছে কথাটা। কিন্তু বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো যাতে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রচার হয়, সে ব্যাপারে ভারতীয় উদ্যোগের কথা ইশতেহারে নেই। যদিও বিষয়টি বেসরকারি পর্যায়ের, তবুও এখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, তা বলা যাবে না।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় যেসব চুক্তি সই হয়েছে এবং যৌথ ইশতেহারে যেসব কথা বলা হয়েছে, তাতে মূলত ভারতীয় স্বার্থই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এখানে তুলনামূলক বিচারে কম। বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, যা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্রীয় সফরের পর সাধারণত যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়। এটা এক ধরনের রেওয়াজ ও বাধ্যবাধকতাও বটে। এই ইশতেহারেও বাংলাদেশের জন্য কোনো আশার বাণী নেই। মনমোহনের ঢাকা সফর নিয়ে আমি মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছি। খোদ মহাজোট সরকারের শরিকরাও নাখোশ, বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায়। খোদ মন্ত্রীরাও এ নিয়ে কথা বলেছেন। খোদ কৃষিমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন তিস্তায় পানি না দিলে ট্রানজিট দেয়া হবে না। আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অভিযোগ করলেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার। খোদ ভারতেও মনমোহনের সফর নিয়ে বিতর্ক আছে। বিরোধী দল মনমোহনের ভূমিকাকে সমালোচনাও করেছে (যুগান্তর, ১১ সেপ্টেম্বর)।
বলতে দ্বিধা নেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা অত্যন্ত সাদামাটা ধরনের। এজন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাংলাদেশ সফরের প্রয়োজন ছিল না। যেমন বলা যেতে পারে বাঘ রক্ষার প্রটোকল, সুন্দরবন সুরক্ষা, টেলিভিশন সম্প্রচার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফ্যাশন টেকনোলজি, মৎস্য খাতে সহযোগিতা, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি ও জেএনইউ) মধ্যে সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক। এসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীই যথেষ্ট। মনমোহন সিংয়ের মতো একজন প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ আসার প্রয়োজন ছিল না। উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি কিংবা নেপালকে ট্রানজিট দিতে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সে ব্যাপারেও আরো কথা রয়েছে। নেপালকে ট্রানজিট দেয়া সম্পর্কিত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এখন আবার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো।
উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ট্রানজিট সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেনি এবং এতে করে আমাদের কেউ কেউ উৎসাহিত হতে পারেন বটে, কিন্তু উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে পরোক্ষভাবে এতে ট্রানজিটের কথাই বলা হয়েছে। চুক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রকারান্তরে ট্রানজিটেরই নামান্তর। উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিতে বলা হয়েছে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা। বলা হয়েছে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করার কথা, বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর। এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে ভূখ- ব্যবহার করার সম্ভাবনাও এতে করে তৈরি হলো। এই চুক্তিকে ভারত অদূর ভবিষ্যতে তার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। চুক্তিতে যে ভাষা ও বক্তব্য রয়েছে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমার ধারণা ভারতের আমলারা অত্যন্ত সুকৌশলে এ ধরনের 'শব্দ' ও বক্তব্য ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ট্রানজিট আদায় করে নিল। কেননা তারা ভালো করে জানেন সরাসরি ট্রানজিটসংক্রান্ত কোনো চুক্তি এ দেশের জনগণ মানবে না। বিরোধী দলের প্রচ- আপত্তি রয়েছে ট্রানজিটের ব্যাপারে। উপরন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সরাসরি ট্রানজিটসংক্রান্ত একটি চুক্তি করে আওয়ামী লীগকে একটি ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিতে চায় না নয়াদিলি্ল। তাই পরোক্ষভাবে তারা এটা আদায় করে নিল। এ জন্য উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এখানে বলা প্রয়োজন যে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই। ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তির (যার ধরন ছিল অনেকটা সামরিক ও চুক্তির ৮, ৯, ১০ নম্বর ধারা ছিল স্পর্শকাতর) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর (১৯৯৭), কোনো পক্ষই আর চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি।
এই চুক্তিতে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা এবং ভারত এটিই চায়। ট্রানজিট বা করিডরের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা বাহ্যত উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্যই চাওয়া হচ্ছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়া বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ১৯৯৭) এটা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে ভারত ও বাংলাদেশ ৪টি দেশ নিয়ে (বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপাল) একটি উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনে রাজি হয়েছে। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে তখন বলা হয়েছিল উন্নয়নের চতুর্ভুজ বা ঝড়ঁঃয অংরধহ এৎড়ঃিয ছঁধফৎধহমষব (ঝঅএছ)। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে কাঠমা-ুতে অনুষ্ঠিত চারদেশীয় পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে ঝঅএছ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ঝঅএছ-এ সমগ্র ভারতবর্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে। দীর্ঘদিন উন্নয়নের চতুর্ভুজ নিয়ে তেমন কিছু শোনা না গেলেও মনমোহনের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে এ ধারণাটি আবার সামনে চলে এলো।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। ভালো হোক, মন্দ হোক এ সফরের গুরুত্ব রয়েছে। ভারত যদি আমাদের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আন্তরিক হয়, আমার বিশ্বাস সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তা একটি বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com 

মনমোহন সিংয়ের সফর যেসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? এ প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা ১টি চুক্তি, ৮টি সমঝোতা ও একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। যা মূলত ভারতের স্বার্থই রক্ষা করবে। বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তি এই সফরে স্বাক্ষরিত হয়নি। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তির কথা বলা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির মুখে এই চুক্তিটি আর স্বাক্ষরিত হলো না এবং পানিবণ্টনের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে থাকল। চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই চুক্তির বিরুদ্ধে যখন পশ্চিম দিনাজপুর ও কুচবিহারে বিক্ষোভ হয়, তখন আমরা এই চুক্তিটি নিয়ে তেমন কিছু আশা করতে পারি না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে চুক্তি, রাষ্ট্র রক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে যা অত্যন্ত সাদামাটা। এর জন্য এই ‘হাই লেভেল ভিজিট’-এর প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয় এমন কোনো চুক্তি না থাকায়, মনমোহন সিংয়ের সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যেসব চুক্তি বা সমঝোতার প্রয়োজন ছিল, তার একটিও স্বাক্ষরিত হয়নি। যা স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে করে ভারতের স্বার্থই রক্ষিত হবে। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব প্রটোকল এবং উন্নয়ন ও সহযোগিতা বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক সংক্রান্ত যে সমঝোতা হয়েছে তা প্রশ্নের মুখেই থাকবে।  কেননা এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি ছিল আমাদের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এর সাথে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হঠকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মওসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখারি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মাঝে। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাগে ভাগ হবে, আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার সমস্ত এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধিতা আগামীতে বাংলাদেশ কতটুকু পানি পাবে, তা নিয়ে একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লী সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কি? আমরা কী তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? অবশ্যই একটি চুক্তি ভালো, যদি সেই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়। যে চুক্তিতে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে, সেই চুক্তিকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি আমরা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। প্রতি বছরই সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ কথাটা। এখানে জাতীয় স্বার্থটিই হলো আসল। মমতা ঢাকায় আসলেন না। কেননা মমতা তার জাতীয় তথা ভারতীয় স্বার্থটাকেই প্রাধান্য দিলেন। এ বিষয়টায় আমাদের কি কিছু শেখার আছে? আমরাও তো চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সকল বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করে একটা ঐক্যমতে পৌঁছতে পারতাম। কিন্তু সেটা আমরা করিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থটাকেই পাধান্য দিয়ে এখন এ চুক্তির বিরোধিতা করলেন। অথচ আমরা বারবারই বলেছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের বন্ধু এবং বাংলাদেশের স্বার্থ তিনি দেখবেন। কিন্তু তিনি দেখলেন ভারতীয় স্বার্থ এটাই আসল কথা।  ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচ কাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। আমরা কী এটা বিবেচনায় নিয়েছি?
ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় করার কথা ছিল। চুক্তি হয়নি, এতে  বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে না। বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিট প্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয় ভারত সীমান্তের যতদূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদু্যুতের মূল্য ২ রুপি। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোনো জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি চুক্তি হবে। এই কয়লা আসবে ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের। এখানে যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমরা ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলাম? এই নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না।
ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা, বিটিভি ও দূরদর্শনের সম্প্রচার বিনিময় ইত্যাদি যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে, তা আমার বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার বিবেচনায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা বা চুক্তি হওয়া উচিত, তা হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য, যা যৌথ ইশতেহারে থাকতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতকে উদ্যোগী হতে হবে স্পষ্ট করে। ট্যারিফ, প্যারা ট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা চলবে না। এই ট্যারিফ কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারত কখনো নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সাথে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিন দিন বাড়লেও ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা ৮০ লাখ পিচ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটিতে উন্নীত করলেও, অশুল্কের কারণে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছিল। আমরা ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিলাম। এখন আমরা পেয়েছি  ৪৬টি গার্মেন্টস পণ্যের প্রবেশাধিকার। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের সফরের সময় এই অশুল্ক বাধা দিয়ে আদৌ কোনো আলোচনা হবে না। যেখানে আমাদের স্বার্থ জড়িত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে যদি আলোচনা নাই হয়, তাহলে এই সরকারকে আমরা সফল বলতে পারি না।
টিপাইমুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ নেই। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ুণœ হয়। কিন্তু সম্প্রতি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমাচান্দ পংকোজ। তিনি বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে পুরো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কি. মি. এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে থাকবে না কেন? টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতীয় স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত।
ট্রানজিট নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। তবে ট্রানজিটের কাঠামোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের এখন ভাবতে হবে। ব্যাপারে সমঝোতা হচ্ছে এখন। অর্থাৎ কীভাবে ট্রানজিট চলবে, এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা। ভারত ১৫টি রুটে (নদী পথ, সড়ক পথ ও রেলযোগাযোগ) ট্রানজিট চাচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের জন্যই আমরা অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছি। ওই ঋণ (১০০ কোটি ডলার) সুদমুক্ত নয়। আমাদের অবকাঠামো ভারত ব্যবহার করবে। আমাদের স্বার্থ এখানে নেই। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী নয়াদিল্লী সফর করে এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন নতুন করে ট্রানজিট চুক্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে ভারত এই ট্রানজিট সুবিধা পেতে পারে। ড. রিজভীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি ১৯৭২ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট প্রাপ্তির সুযোগ থাকতো, তাহলে ভারত অনেক আগেই এই সুযোগ গ্রহণ করতো। অন্তত গওহর রিজভীর বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করতে হতো না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফর করে গেলেন। তার সাথে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৪ জন মুখ্যমন্ত্রী এসেছিলেন, (তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পুলাল-থানওয়ালা-মিজোরাম)। এতেই বোঝা যায় ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায়। এ ধরনের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদাভিত্তিক। জাতিসংঘ সনদের ২নং এবং ৪.১নং ধারায় যে সমতা ও সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে, এর আলোকেই আমরা ভারতের সাথে স্থায়ী দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু ভারত যদি একরতফাভাবে ও নিজ স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাতে সাধারণ মানুষের কোনো সমর্থন থাকবে না। সাধারণ মানুষ ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই। সীমিত সময়ের জন্য হয়তো সুবিধা পাওয়া যাবে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব তাতে তৈরি হবে না। আমরা আশা করবো ভারতের নেতৃবৃন্দের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে এবং ‘বড় ভাই’ ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ না করে সমস্যাগুলোর দিকে ভারতের নেতৃবৃন্দ যদি নজর দেন, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। এতে করে আন্তর্জাতিক আসরে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।
 ড. তারেক শামসুর রেহমান 
প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com 

ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে

ভারতের প্রধানমর বাংলাদেশ সফরের পর বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের প্রাপ্তি যেখানে প্রায় ‘শূন্যের’ কোঠায়, সেখানে ভারত পরোক্ষভাবে ট্রানজিটের বিষয়টি আদায় করে নিয়েছে। যদিও যৌথ ইশতেহারে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টনের দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। যারা ভারতের দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন, তারা জানেন ইশতেহারে যে ‘আশাবাদ’ ব্যক্ত করা হয়েছে, তা মূলত একটি ‘কূটনৈতিক ভাষা’। অতীতেও ভারত এ ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একটা সমস্যা থেকেই গেল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তিতে সমঝোতাটি এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। আগামীতে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর মমতা বাংলাদেশকে যদি কিছুটা ‘ছাড়’ দেন, তা বাংলাদেশের জন্য হবে বড় পাওয়া। তবে মমতা পশ্চিমবঙ্গের জন্য আরও পানি চান। তাই তিনি ‘ছাড়’ দেবেন, এতে বিশ্বাস রাখতে পারছি না। কেননা পানিবণ্টনের প্রশ্নটির সঙ্গে তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত। তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা খোদ ভারতেই বিরোধিতার মুখে পড়েছে। এখন দেখতে হবে এ সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কতটুকু কার্যকরী হয়। ছিটমহল বিনিময়ের যে কথা বলা হয়েছে, তা খোদ বাংলাদেশ ও ভারতেও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। আসামের অসম গণপরিষদ ও বিজেপি ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। চুক্তিস্বাক্ষরের পরদিন আসাম ও মেঘালয়ে বড় ধরনের প্রতিবাদ হয়েছেÑ এ খবরটুকু আমাদের দিয়েছে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা।
আমার বিবেচনায় উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ। পরোক্ষভাবে এতে ট্রানজিটের কথা বলা হয়েছে। এ চুক্তিতে উপআঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বন্দর (চট্টগ্রাম ও মংলা) ব্যবহার করার কথা। এমনকি নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে অংশটুকু রয়েছে, তা বড় ধরনের আশংকার সৃষ্টি করেছে। এ অংশটুকুতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে ভূখণ্ড ব্যবহার করার সম্ভাবনাও এতে তৈরি হল। এ চুক্তিটি অদূর ভবিষ্যতে ভারত তার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। চুক্তিতে যে ভাষা ও বক্তব্য রয়েছে, তার মাধ্যমে অতি কৌশলে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে ট্রানজিট আদায় করে নিল। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমরা আমাদের দক্ষতা দেখাতে পারিনি। ভারতের দক্ষ আমলারা কৌশলে আমাদের কাছ থেকে ট্রানজিট আদায় করে নিল। যদিও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের চেয়ে দু’জন উপদেষ্টার (ড. মসিউর রহমান ও ড. গওহর রিজভী) ব্যক্তিগত ও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা কাজ করেছে বেশি। কেননা তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা তারা বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র।
এখন যে প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা আসলে কী? ভারত কী চায়? ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। যদিও জনগোষ্ঠীর ৩৭ ভাগ এখনও দরিদ্র সেখানে (২০১০)। ভারতের কোন কোন রাজ্যে দরিদ্র্যতা এত বেশি যে, প্রায়ই সেখানে কৃষকরা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আÍহত্যা করে। তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। মাথাপিছু আয় তখন ৯৪০ ডলার (বর্তমান) থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখবে শতকরা ১৭ ভাগ (বর্তমানে মাত্র ২ ভাগ)। এই যে ভারত, এ ভারত আমাদের উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মানসিকতা নিয়ে (মমতাও এ থেকে বাদ যান না)। এ মানসিকতা বোঝানোর জন্য আমি রাশিয়ার সঙ্গে বেলারুশের সম্পর্কের বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। দেশ দুটো এখন স্বাধীন। বেলারুশ সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন একটি দেশ হিসেবে আÍপ্রকাশ করে। রাশিয়ার যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বেলারুশে। বেলারুশ রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীল। Druzhba ev Friendship পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া তেল সরবরাহ করে বেলারুশকে। বেলারুশ আবার এই তেলের একটি অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশে বিক্রি করে। এ তেল সরবরাহ নিয়ে ২০০৯ সালে দেশ দুটোর মধ্যে যে তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘ as War ’ হিসেবে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেংকো বরাবরই রাশিয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শংকিত। ইতিমধ্যে দেশ দুটো একটি ‘Customs Union’ গঠন করেছে এবং একটি ‘টহরড়হ ঝঃধঃব’ চুক্তিতেও দেশ দুটো স্বাক্ষর করেছে। রাশিয়ার নেতারা মনে করেন রাশিয়ার ন্যাচারাল অধিকার রয়েছে তার পাশের দেশ বেলারুশে। রাশিয়ার নেতারা এটাকে বলছেন ‘ Zone of Privileged Interst’। অর্থাৎ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ এ তত্ত্বের প্রবক্তা। মূল কথা হচ্ছে, রাশিয়ার পাশের দেশ বেলারুশে রাশিয়ার স্বার্থ রয়েছে। বেলারুশকে এ ‘রাশিয়ার স্বার্থ’কে স্বীকার করে নিতে হবে। রাশিয়ার এটা স্বাভাবিক অধিকার।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ‘Zone of Privileged Interst’ এর ধারণাটি আমাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশে। ভারতের সঙ্গে স্বার্থ মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সাত বোন’ রাজ্যের উন্নয়ন। ভারতের এ সাতটি রাজ্য (আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল) মূলত মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে উন্নয়নও হচ্ছে না। দারিদ্র্য ও অশিক্ষার হারও বেশি। এখন ‘সাত বোন’ রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি। গুজরাল ডকট্রিনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘সাত বোন’ রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর গুজরাল (ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) লন্ডনের দি রয়াল ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সে বক্তৃতা দেয়ার সময় গুজরাল তার ওই মতবাদ তুলে ধরেছিলেন। ওই মতবাদে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা, চট্টগ্রাম পোর্ট ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। এটা ছিল মূলত ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’-এর সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত রূপ। ইন্ডিয়া ডকট্রিনের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে তৃতীয় কোন দেশকে এ অঞ্চলের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। এ অঞ্চলের উন্নয়নে ভারতই ভূমিকা রাখবে, অন্য কোন দেশ নয়Ñ এটাই ইন্ডিয়া ডকট্রিনের মূল কথা।
‘গুজরাল ডকট্রিন’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘সাত বোন রাজ্যের’ উন্নয়নের কথা বলা হলেও ভারত ধীরে ধীরে এ মতবাদ নিয়ে এগিয়ে গেছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ১৯৯৭) নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, ভারত ও বাংলাদেশ ৪টি দেশ নিয়ে (ভুটান ও নেপালকে সঙ্গে নিয়ে) একটি উপআঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলবে। এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতাকে তখন বলা হয়েছিল উন্নয়নের চতুর্ভুজ বা ঝSouth Asian Growth Quadrangle (SAGQ)। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত চারদেশীয় পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে ঝঅছে গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, ঝঅছে-এ সারা ভারতবর্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যকে। দীর্ঘদিন উন্নয়নের চতুর্ভুজ নিয়ে তেমন কিছু শোনা না গেলেও মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে এ ধারণাটি আবার সামনে চলে এলো। যে সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার মাঝে উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তিটি বাদে বাকিগুলো আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর একটিতেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। বাংলাদেশের স্বার্থ যেসব ক্ষেত্রে জড়িত ছিল (যেমনÑ তিস্তাসহ সব নদীর পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত, ৪৬টি পণ্যের পরিবর্তে ৪৮০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ইত্যাদি), সেসব ক্ষেত্রে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হল না। ফলে ভারত সম্পর্কে এ দেশের জনগণের এক অংশের যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তাতে আদৌ কোন পরিবর্তন আসবে না। ভারতের নেতৃবৃন্দের এ কর্তৃত্ববাদী আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। জাতিসংঘ সনদের ২নং এবং ৪.১ নং ধারায় যে সমতা ও সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে, এর আলোকেই আমরা ভারতের সঙ্গে স্থায়ী দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু ভারত যদি একতরফাভাবে ও নিজস্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাতে বিতর্কের মাত্রা বাড়বেই। ভারতের নেতৃবৃন্দের ‘মাইন্ড সেটআপ’-এ পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ‘ছোট’ দেশ হতে পারে, কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের দেশ এটি। বাংলাদেশও অনেক কিছু ভারতকে দিতে পারে। ট্রানজিট সুবিধা কেন সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু ভারত ও বাংলাদেশের জন্য? এটা উš§ুক্ত হোক। বহুপাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আলোকে আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও ট্রানজিট চাই। মনমোহন সিংয়ের এ সফর প্রমাণ করে জাতীয় স্বার্থের বাইরে ভারত এক পাও এগোয় না। অথচ বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে চাই না। পার্থক্যটি এখানেই।
প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com