রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

পদ্মা সেতু : প্রত্যাশা ও অনেক প্রশ্ন

প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বিবৃতিটি প্রকাশিত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আমার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছেÑ সত্যি সত্যিই কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে? পদ্মা সেতু নিয়ে মন্ত্রী তথা ক্ষমতাসীনদের অতিকথন একটি বড় ধরনের জটিলতাই সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বব্যাংক বলেনি, তা বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে করে অসন্তুষ্ট হয়েছে বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তারা যে বিবৃতিটি দেন, তাতে তাদের অসন্তুষ্টিই প্রকাশিত হয়েছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে যখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল, তখন বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষের ২০ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিটি আমাদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। ওই বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক বলেছিলÑ কিছু শর্তের সন্তোষজনক বাস্তবায়ন হলেই শুধু বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত হবে। বিশ্বব্যাংকের ওই বিবৃতি অনেকটা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হল। অথবা বলা যেতে পারে সাময়িক বাহবা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ওই বক্তব্য ভালোভাবে না বুঝে জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল বিশ্বব্যাংক তাদের বিবৃতির মাধ্যমে কী বলতে চেয়েছে, তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা। সরকারের নীতিনির্ধারকরা, এমনকি আমাদের ‘বাচাল’ অর্থমন্ত্রী বলেই ফেললেনÑ বিশ্বব্যাংক ফিরে আসছে। এমনকি কোন কিছু না বুঝেই তিনি বলে ফেললেনÑ মার্চ-এপ্রিলে কাজ শুরু করা হবে। আমাদের অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। তিনি একটু বেশি কথা বলেন, এটা তার দলের লোকেরাও বলেন। তবে তিনি তো শিক্ষিত মানুষ! ‘রাবিশ’ বলে তিনি যত গালাগালিই দিন না কেন, বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধি, স্ট্র্যাটেজি বোঝেন না, তেমন নয়। বোঝেন এবং জানেন বিশ্বব্যাংক কী চায়। কিন্তু সরকারপ্রধান তথা সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পেতে বলেই ফেললেনÑ মার্চ-এপ্রিলে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে যাবে! তার দেখাদেখি বাকি মন্ত্রীরাও সরব হলেন। খুশিতে ডগমগ হয়ে বলাবলি করতে থাকলেনÑ সরকারের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ফিরে এসেছে! ব্যতিক্রম ছিলেন একজনÑ ওবায়দুল কাদের। তিনি সবাইকে কম কথা বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাস্তবে দেখা গেল ওবায়দুল কাদেরের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। মন্ত্রীদের অতিকথন, বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাংক এখন বাধ্য হল নতুন বক্তব্যটি দিতে। তবে এই বক্তব্য গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্কে দেয়া বক্তব্যের কোন প্রতিক্রিয়া কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেনÑ তিনি বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চেয়েছেন কেন পূর্ববর্তী অর্থায়ন বাতিল করা হয়েছিল। তিনি এও বলেছিলেনÑ অর্থায়ন বন্ধের পেছনের অপরাধীদের তিনি ছাড় দেবেন না। তিনি ড. ইউনূসের নাম সরাসরি না বললেও আকারে-ইঙ্গিতে তাকেই মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরই বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বক্তব্যটি এলো।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বক্তব্যে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে তা হচ্ছেÑ ১. গণমাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হচ্ছে ২. নতুন করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে হলে নতুন বাস্তবায়ন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে ৩. প্রকল্পের ক্রয় কর্মকাণ্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে ৪. শুধু এসব পদক্ষেপের সন্তোষজনক বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এক্সটারনাল প্যানেল থেকে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের ব্যাপারে অগ্রসর হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজে স্বয়ং এবং অর্থমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীরা বারবার বলে আসছেনÑ পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি হয়নি। অথচ বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বক্তব্যে বিশ্বব্যাংক বলছেÑ পদ্মা সেতুর অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন সরকারি ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সরকারকে একাধিকবার তারা দিয়েছেন। সরকারের কাছ থেকে সাড়া না পাওয়ার পরই তারা ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে দেন।
বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত ‘ফিরে আসা’র ব্যাপারে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। অর্থমন্ত্রী, দফতরবিহীন মন্ত্রী, ইআরডি সচিব আমাদের জানাচ্ছেনÑ বিশ্বব্যাংক নতুন করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে নতুন কোন ‘শর্ত’ দেয়নি। অথচ বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে তারা চাচ্ছেন অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি বিশেষ তদন্ত ও আইনি দল গঠন করা এবং সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি এক্সটারনাল প্যানেলের কাছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সব তথ্যের পূর্ণ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দেয়া। তার পরই বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। এটাই তো ‘শর্ত’। বিশ্বব্যাংকের অবস্থান মূলত এ জায়গাতেই কেন্দ্রীভূত। বিশ্বব্যাংক এর আগে যে চারটি ‘শর্ত’-এর কথা বলেছিল তা পালন করা হয়েছে। আবুল হোসেন মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। সচিব ছুটিতে গেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টার ‘ছুটি’-তে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে এখনও একটি বিভ্রান্তি রয়েছে। তিনি ‘ছুটি’-তে গেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে গেছেন, এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেশকিছু দিন থাকবেনÑ এগুলো সবই বাস্তব। কিন্তু তিনি নিজে সরাসরিভাবে ‘ছুটি’র বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। বলেছেনÑ তিনি খুব শিগগিরই কাজে ফিরে যাবেন! তার ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি ধোঁয়াশা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বক্তব্যে যে দুটি বিষয় রয়েছে, আমি সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে চাই। বিষয় দুটো হচ্ছেÑ ১. দুদকে একটি বিশেষ তদন্ত ও আইনি দল গঠন করা ২. একটি বিদেশী তদন্ত কমিটির কাছে সব তথ্য দেয়া ও তাদের সব নথিপত্র ঘাঁটতে সুযোগ দেয়া। সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে এ সুযোগ দুটো দেবে। যদি সময়ক্ষেপণ করে তাহলে বিশেষজ্ঞ দলের কাছে সরকারের অসততা প্রমাণিত হবে। মূলত এ দুটো বিষয়ের ওপর আটকে আছে সব কিছু। পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক শতভাগ রাজি হয়েছে তা বলা যাবে না। আমরা তাকে শর্ত বলি আর না বলি, বিশ্বব্যাংক কতগুলো বিষয় নিশ্চিত করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ‘বল’টি এখন ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের দিকে। কীভাবে ‘বল’টি খেলবেন, তার দায়িত্ব বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের।
অর্থমন্ত্রী এখনও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বলেন। একবার বললেন মার্চ-এপ্রিলে কাজ শুরু হবে। আবার সিলেট গিয়ে বললেন ফেব্র“য়ারির কথা। তিনি ‘অতিকথা’ বলেন। তিনিও ‘ছুটি’-তে গেলে সরকারের কাজ অনেক সহজ হতো। তিনি নিজে বলেছিলেন ‘তাকে কম কথা বলতে বলা হয়েছে’। কিন্তু তার পরও তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। ‘হুট’ করে একটা কথা বলে ফেলেন, যা বিতর্কের সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে যে বক্তব্যটি দিয়েছেন তা না বললেও পারতেন। যেখানে আমরা এখনও চাচ্ছি বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করুক, সেখানে এমন কোন বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়, যা বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তারা কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
বিশ্বব্যাংকের রাজনীতি সম্পর্কে আমরা মোটামুটিভাবে অবগত। বিশ্বব্যাংক ‘স্বার্থ’ ছাড়া কোথাও বিনিয়োগ করে না। আর তাদের ঋণ শর্তহীন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তুলনামূলক বিচারে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ‘ভালো’। দীর্ঘমেয়াদি। সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের স্বার্থেই বিশ্বব্যাংকের ঋণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এমন কোন বক্তব্য দেয়া সমীচীন নয়, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কিছু বিষয়ের নিষ্পত্তি হলেই বিশ্বব্যাংক ফিরে আসবে, নচেৎ নয়। আর ‘বিষয় নিষ্পত্তি’র ভার একান্তভাবেই বাংলাদেশের ওপর। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় আমরা যদি আমাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারি, যদি সত্যি সত্যিই আন্তরিক না হই, তাহলে বিশ্বব্যাংকের দিকে তাকানো আমাদের ভুলে যেতে হবে। সামনে অনেক কাজ বাকি। নদীশাসন, সেতু নির্মাণ, সংযোগ সড়কÑ প্রতিটি কাজ হবে ভিন্ন ভিন্ন চুক্তির ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে টার্মস অব রেফারেন্স এখনও নির্ধারিত হয়নি। এখানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, কেননা বিশ্বব্যাংক এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির ‘গন্ধ’ খুঁজে পেতে পারে। এ সংক্রান্ত যে কমিটি হবে, তাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি কারা থাকবেন সে ব্যাপারেও বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন, যাতে করে বিশ্বব্যাংক কোন প্রশ্ন তুলতে না পারে। টেন্ডার চূড়ান্ত করার আগে প্রি-কোয়ালিফাই করা হবে। এখানে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে বিতর্কিত ব্যক্তিরা প্রভাব খাটাতে না পারেন।
অনেক কাজ এখনও বাকি। একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে মাত্র। এখন যদি আমরা আমাদের স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা দেখাতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের জন্য শেষ সুযোগটিও নষ্ট হয়ে যাবে। দুর্নীতির অপবাদ ওঠায় আমাদের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দুর্নাম অনেকাংশে লাঘব করতে পারি। তাই এখন থেকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা প্রয়োজন। সরকারের কোন পর্যায়েই এমন কোন বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়, যা বিতর্কের মাত্রা বাড়ায়। পদ্মা সেতু আমাদের ‘স্বপ্নের সেতু’। এটা আমাদের প্রয়োজন। আমাদের স্বার্থেই এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের ‘অবজারভেশন’-এর ব্যাপারে আমাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাহলেই বিশ্বব্যাংক ফিরে আসবে।
Daily JUGANTOR
01.10.12

ইরানের কাছ থেকে ন্যাম গতিশীল নেতৃত্ব পাবে : ড. তারেক শামসুর রেহমান (রেডিও তেহরানে সাক্ষাতকার)


৩০ আগস্ট (রেডিও তেহরান) : জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর শীর্ষ
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইরানের রাজধানী তেহরানে। এ সম্মেলনের বিভিন্ন দিক
নিয়ে আমরা কথা বলেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের সঙ্গে। তার সাক্ষাতকারটি
পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

রেডিও তেহরান: জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর ষোড়শ শীর্ষ সম্মেলন
হচ্ছে ইরানের রাজধানী তেহরানে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতির এক বিশেষ
পরিস্থিতিতে এবারের এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আপনার দৃষ্টিতে এবারের এ
সম্মেলনের গুরুত্ব কতটুকু?

ড. তারেক শামসুর রেহমান : ধন্যবাদ আপনাকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন
ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, যে দৃষ্টিকোণ থেকে এক সময় জোট নিরপেক্ষ
আন্দোলন বা ন্যামের জন্ম হয়েছিল বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই
বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রকট হয়ে আমাদের কাছে ধরা পড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাব সারা বিশ্বে যে ব্যাপৃত
হয়েছে তা আমাদের চোখে ধরা পড়ছে এবং সে ক্ষেত্রে আজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর
শীর্ষ নেতারা তেহরানে ন্যাম সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করছেন। সঙ্গত কারণে আমার
কাছে যে প্রশ্নটা অত্যন্ত বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটি হচ্ছে মার্কিন
আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো বিশেষ করে আমাদের মতো
ছোটো ছোটো দেশগুলো, আরব দেশগুলো এবং বিশেষ করে ইরান- যে দেশটি এই
মুহূর্তে সরাসরি চরম আগ্রাসনের সম্মুখীন তারা এ ধরনের একটি সম্মেলনের
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

আমি মনে করি আজকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো নিজেরা একত্রিত হয়ে সব
ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ন্যাম যে
পরিস্থিতির ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল আজকের বর্তমান পরিস্থিতিকে আমরা অনেকটা
সেই আঙ্গিকে বিচার করতে পারি।

রেডিও তেহরান : দীর্ঘদিন ধরে ন্যামকে অনেকটা অকার্যকর সংগঠন বলে মনে করা
হতো। কিন্তু, এবার ইরান এ সংস্থার সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে এবং এ
কারণে অনেকেই মনে করছেন ন্যাম নতুন করে গতি পাবে। আপনার কি তাই মনে হয়?

ড. তারেক শামসুর রেহমান : হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে সেটা হতে পারে। কারণ আমি মনে
করি ইরান একটি ইমার্জিং মুসলিম কান্ট্রি। মুসলিম বিশ্বে ইরানের যথেষ্ট
অবদান আছে এবং সে ক্ষেত্রে ইরান যখন ন্যামের দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন আমি
মনে করি ইরানের কাছ থেকে নতুন এবং গতিশীল একটা নেতৃত্ব আমরা পাব। বিশেষ
করে আজ মুসলিম বিশ্ব যে সমস্যা ও সংকটের মুখে ঠিক সেই মুহুর্তে ন্যামে
ইরানের নেতৃত্ব একটা বড় ধরনের কর্মসূচি আমাদের জন্য উপস্থাপন করতে
পারবে।

রেডিও তেহরান : বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার
প্রত্যয় নিয়ে ন্যামের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু, ন্যাম তার সে
লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ধরে রাখতে পারেনি। নতুন করে কি এ সংস্থা তার মূল লক্ষ্যে
ফিরে যেতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?

ড. তারেক শামসুর রেহমান : দেখুন, ন্যামের ইতিহাসের দিকে যদি তাকানো যায়
তাহলে দেখব এক ধরনের বিভ্রান্তি সেখানে কাজ করেছিল। ন্যামকে এক সময়
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখাপেক্ষী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আবার
কখনো ন্যামকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।

তবে ন্যামের জন্মটা যে কারণে হয়েছিল -তা হচ্ছে এই দুই পরাশক্তির বাইরে
থেকে আলাদাভাবে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একত্রিত করে নেতৃত্ব দেয়া।
 আমি তো মনে করি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে ঠিক
তেমনি একটা পরিস্থিতিতে ন্যামের মতো সংগঠনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়তা
রয়েছে। তবে, এক্ষেত্রে যেটা বড় সমস্যা সেটা হচ্ছে ন্যামভুক্ত দেশগুলো
নানা ধরনের বিভ্রান্তিতে ভুগছে। তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে। ন্যামের
পক্ষে বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের সমর্থন পাওয়া
যাচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ করে ২০১২ সালের বিশ্ব
রাজনীতির যে পরিস্থিতি আমরা লক্ষ্য করছি সেটা যদি আমরা বিবেচনায় নিই
তাহলে আমি মনে করি এ মুহূর্তে ন্যামের মধ্যে এসে একত্রিত হওয়া ছাড়া আর
কোনো বিকল্প নেই। সব ধরনের বিভেদ, বিভ্রান্তি ভুলে গিয়ে ন্যামের
প্লাটফর্মে সবাইকে একত্রিত হতে হবে।

রেডিও তেহরান : বাংলাদেশ হচ্ছে ন্যামের অন্যতম সদস্য। এ সংস্থা থেকে
বাংলাদেশ কিভাবে লাভবান হতে পারে? আর ন্যামকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে
বাংলাদেশ কি ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

ড. তারেক শামসুর রেহমান : দেখুন, বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হলেও মুসলিম
বিশ্বে বাংলাদেশকে অনেক কিছু দেয়ার আছে। মুসলিম বিশ্বের উন্নয়নে অবদান
রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তাছাড়া প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যথেষ্ট এক্সপার্ট রয়েছে। এসব
এক্সপার্টাইজ দিয়ে আমরা কিন্তু মুসলিম বিশ্বে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন
আনতে পারি। এমনকি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর পক্ষ থেকে একাধিক দেশে যদি
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায় সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অবদান
রাখতে পারে।



আমরা যদি অন্যদিক থেকে  দেখি যে, ন্যাম কিভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ
করতে পারে- আমার মনে হয় সেটাও সম্ভব। যেহেতু ন্যামের মাধ্যমে বড় একটা
সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে ন্যামও পারে মুসলিম বিশ্বের
বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে বাংলাদেশের মতো ছোটো ছোটো দেশের উন্নয়নে আরো
বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে চিকিতসা বিদ্যায় অবদান রাখতে পারে,
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অবদান রাখা যেতে পারে। এমনকি পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ
উন্নয়নের ক্ষেত্রে এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের মধ্যদিয়ে নতুন দিগন্তের
একটা সূচনা করা যেতে পারে। আর ন্যাম এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে
পারে।

রেডিও তেহরান : এবারের ন্যাম সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রতি
আমেরিকা বিশেষ নজর রাখছে। এরইমধ্যে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একজন
কর্মকর্তা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
করেছেন। আপনি কি মনে করেন ন্যাম সম্মেলনে যোগ দেয়ায় বাংলাদেশ মার্কিন
চাপের মুখে পড়বে?

ড. তারেক শামসুর রেহমান : দেখুন এ সম্পর্কিত খবরটা আমার চোখেও পড়েছে।
কিন্তু আমি মনে করি যে, এ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে, আমি একটা জিনিষ
সবসময় মনে করি সেটা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক কমিউনিটির
একটি অংশ, বাংলাদেশ যেহেতু জাতিসংঘের চার্টার ফলো করে আর জাতিসংঘ
চার্টারের ২/৪ এবং ২/৭ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে- একটি রাষ্ট্র অন্য
কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বাংলাদেশ
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, চল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে
আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো দেশের দ্বারা পরিচালিত হোক এটা আমরা চাই
না। সুতরাং, বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থেই আজকে ন্যাম সম্মেলনে যোগ
দিয়েছে, অতীতেও যোগ দিয়েছিল এবং আগামীতেও যোগ দেবে। সুতরাং,
যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দেশ যদি এ নিয়ে কোনো ধরনের কথা বলে থাকে তাহলে
বাংলাদেশ কেন তাদের এ ধরনের কথা গ্রহণ করবে? এটা স্বাধীন সার্বভৌমত্বের
প্রতি হস্তক্ষেপ বলে আমি মনে করি।#

রেডিও তেহরান/জিএআর/এসআই

বেগম জিয়ার ভারত সফর প্রসঙ্গে কিছু কথা

বেগম জিয়া ভারত সফরে যাচ্ছেন। বিবিসির বাংলা বিভাগের সাথে আলাপচারিতায় এটা নিশ্চিত করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি বেগম জিয়াকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওই আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতেই বেগম জিয়া এখন নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। বেগম জিয়ার এই নয়াদিল্লি সফর নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত বেগম জিয়া ‘ছায়া প্রধানমন্ত্রী’। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রধান বিরোধী দলের নেতাকে ‘ছায়া প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটা বিবেচনায় নিয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বেগম জিয়া সেই আমন্ত্রণ গ্রহণও করেছেন। দ্বিতীয়ত বেগম জিয়ার এই সফর প্রমাণ করে ভারত শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ‘গণ্য’ করে না, বরং বিরোধী দলের নেতাকেও ‘গণ্য’ করে। তৃতীয়ত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘হাই প্রোফাইল’ ভারত সফর ও তার ঢাকায় দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যের পর তিনি এমন একটা ধারণার জন্ম দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের পরবর্তী নেতা হিসেবে বিশ্ব সম্প্রদায় বিশেষ করে ভারত তাঁকে  গণ্য করছে। এখন বেগম জিয়ার এই সফরের পর মানুষের মন থেকে সেই ধারণা চলে যেতে পারে। চতুর্থত ভারতের নীতিনির্ধারকদের মাঝে সম্ভবত একটি ‘শুভবুদ্ধির’ উদয় ঘটেছে। তারা এখন আর শুধুমাত্র আওয়ামী লীগকে নিয়েই চিন্তা করে না বরং প্রধান বিরোধী দলের সাথেও তারা এক ধরনের ‘ডায়লগ’ চায়।
বেগম জিয়ার ভারতে যাওয়া উচিত কি উচিত নয়, এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। অনেকের সাথে এমনকি যারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ঘরানার, তারাও আমাকে বলেছেন, বেগম জিয়ার নয়াদিল্লি যাওয়া ঠিক নয়। কেননা এতে করে সাধারণ মানুষের মাঝে একটা ‘ভুল সিগন্যাল’ পৌঁছে যেতে পারে। এর পেছনে হয়তো যুক্তি ও আবেগ আছে এটা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। কেননা স্বাধীনতা পরবর্তী ৪০ বছরে ভারত বন্ধুত্বের চাইতে ‘শত্রুতার’ই পরিচয় দিয়েছে বেশি। তারপরও বাস্তবতা যা, তা হচ্ছে সমসাময়িক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত একটা ‘ফ্যাক্টর’। ভারতের অবস্থান, তার অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কে এর একটা প্রভাব পড়বেই। আমাদের বৈদেশিক নীতির সাফল্য সেখানেই যে, আমরা ‘ভারতের এই অবস্থান’ থেকে কতটুকু ফায়দা তুলতে পারব। দুর্ভাগ্য, বর্তমান সরকারের সময় আমরা খুব একটা ফায়দা তুলতে পারিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা ঢাকতে আমাদের দু’জন উপদেষ্টাকে পর্যন্ত নিয়োগ করতে হয়েছে, যারা সত্যিকার অর্থে বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাহায্য করছেন। এমনি এক পরিস্থিতিতে বেগম জিয়ার ভারত সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেগম জিয়ার জন্য একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থকে যথাযথভাবে ভারতের কাছে তুলে ধরার। বলার অপেক্ষা রাখে না মহাজোট সরকারের সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশের স্বার্থ আদৌ রক্ষিত হচ্ছে না। বেগম জিয়া এখন এই কাজটি করতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা তা তুলে ধরতে পারেন ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের কাছে। প্রথমত বাংলাদেশ বড় ধরনের ভারতীয় পানি আগ্রাসনের সম্মুখীন। গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি চুক্তি হয়েছে বটে কিন্তু পানি আমরা পাচ্ছি না। ফারাক্কা পয়েন্টে পানি আসার আগেই উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। তিস্তার পানি বণ্টনে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। পশ্চিমবাংলার আপত্তিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।
সমস্যাটা ভারতের, সমাধান তাদেরকেই করতে হবে। বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বুঝিয়ে দেয়া যে, আন্তর্জাতিক নদী আইন আমাদের অধিকারকে সংরক্ষণ করছে। আমরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারি না। ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। খোদ ভারতের অভ্যন্তরে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে এই দু’টো প্রজেক্ট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা পানিশূন্য হয়ে যাবে। মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাংলাদেশের মানুষ এটা সহ্য করে নেবে না। এ বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বুঝিয়ে দেয়া। দেশ হিসেবে আমরা ‘ছোট’ হতে পারি। কিন্তু আমরা সমমর্যাদার অধিকারী। ভারতের আচরণে সেই সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ ‘ভারতীয় বাণিজ্যনীতির ফাঁদে’ আটকা পড়ে আছে তাদের দিক থেকে। অর্থাৎ ভারতীয় বাণিজ্যনীতি এমন যে একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছে, যা ভারত ব্যবহার করছে তার স্বার্থে। ভারত তথাকথিত বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা ঘোষণা করলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় বাংলাদেশের রফতানি আয় কমে গেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১১-১২ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশ রফতানি করেছে মাত্র ৪৯ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য (আগের বছরের ৫১ কোটি ২৫ লাখ ডলার)। এতে দেখা যায় রফতানি আয় কমেছে (কালের কণ্ঠ, ১৮ জুলই, ২০১২)। গেল বছর ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তখন ৪৬টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কথা তিনি ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল ভারত শুল্ক বাধা দূর করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বেগম জিয়া এখন এই বিষয়টি ভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে স্পষ্ট করবেনÑ অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে। এতে করে বাংলাদেশ তার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পারবে। তৃতীয়ত বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। একতরফাভাবে ভারতীয় বিএসএফ প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। এই হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এভাবে মানুষ মারা হয় না। এই সীমান্তহত্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। সীমান্তহত্যা বন্ধের ব্যাপারে ভারতকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বেগম জিয়া এই ‘ম্যাসেজ’টি পৌঁছে দেবেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে। চতুর্থ বেগম জিয়া ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় ভূমি হস্তান্তর, সাড়ে ৬ কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিতকরণের বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেবেন। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী অনেক আগেই ছিটমহল সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভারত তা করেনি।
বেগম জিয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের জনগণের কথা তুলে ধরবেন। পঞ্চমত বাংলাদেশের দুর্বল ও ভারতঘেষা পররাষ্ট্রনীতির সুযোগে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে সুকৌশলে ট্রানজিটের নামে করিডোর সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। তখন বলা হয়েছিল, ‘বহু পাক্ষিকতার আলোকে ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হয়েছে’। বলা হয়েছিল বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানও অনুরূপ সুবিধা পাবে। বাংলাদেশের জন্য চীন-নেপাল-ভুটানের যে সংযোগ ভারতের উপর দিয়ে যাবে, তা ১০০ কিলোমিটারের চেয়ে কম। এই সুযোগটি বাংলাদেশ পায়নি। এমনকি ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের মাত্র ২৫ কিলোমিটার স্থল সংযোগ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ভারত আমাদের সেই সুযোগ দেয়নি। অথচ আমরা এককভাবে ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছি। তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতের ২৮ চাকার ভারী গাড়ি পারাপারের সুযোগ করে দিয়েছি। এজন্য ভারত আমাদের কোনো ট্রানজিট ‘ফি’ও দেয়নি। সাধারণ মানুষের মনোভাব আজ বেগম জিয়াকে তুলে ধরতে হবে। শুধু তাই নয়। ভারত তার নিজ স্বার্থে এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের পথ রেখাটি নিজের সুবিধামত রুটে আদায় করে নিয়েছে। ভারতের এই এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের পথরেখাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢুকে ঢাকা ও সিলেট হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করবে। এই পথটি ভারতের জন্য অনুকূল হলেও বাংলাদেশের জন্য দুর্গম,  বেশি দূরত্বের এবং অনিরাপদ হওয়ার ফলে পথটি বাংলাদেশের জন্য মোটেই লাভজনক নয়। অথচ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-টেকনাফ-সিত্তোই-আকিয়াব-ইয়াঙ্গুনগামী পথটি বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে গন্তব্যসমূহে স্থল যোগাযোগের জন্য (সড়ক ও রেলপথ) কম দূরত্ব ও কম দুর্গম ও নিরাপদ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের জন্য তা ছিল সুবিধাজনক। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ভারত তোষণ নীতির কারণে এশিয়ান হাইওয়ের যে পথ আমরা বেছে নিয়েছি, তাতে আমাদের প্রাপ্তি কম। এমনকি ভারতকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের ব্যাপারেও আমরা চুক্তিবদ্ধ। এসব চুক্তি আমরা এখন বাতিল করতে পারব না। কিন্তু বেগম জিয়া ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এটা বোঝাতে পারেন যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত যদি এককভাবে সুবিধা নেয়, তাতে করে বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্ব পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ছে। আমদানি-রফতানিতে চট্টগ্রাম বন্দর এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। নতুন করে ভারতীয় কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার সুযোগ কম। বিষযটি নিয়ে বেগম জিয়া ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করতে পারেন।
বাংলাদশের জনগণ ভারতের বন্ধুত্ব চায়। বাংলাদেশের উন্নয়নে ও সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে ভারত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীকে ভারত যদি সমর্থন করে, তাতে বাংলাদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মানুষ চায় না ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করুক। তবে বেগম জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। আগামী দিনগুলোতে ভারত একটি ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান গ্রহণ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিএনপির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল বিএনপি ভারতবিরোধী। বেগম জিয়ার ভারত সফর এই বদনাম কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ ‘ছোট’ দেশ হতে পারে। কিন্তু আমাদের অনেক কিছু দেয়ার আছে। ভারত সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলুক, বেগম জিয়ার এই সফরের মধ্যে এটি যদি নিশ্চিত হয়, সেটাই হবে আমাদের জন্য বড় পাওয়া।

স্বপ্নের জাবি যেভাবে সম্ভব


1
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি বললেন, \'শিক্ষকরা সামান্য বেতন পান। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন এই সময়টার জন্য। ভর্তি পরীক্ষার সময় প্রাপ্ত বাড়তি অর্থ দিয়ে অনেক শিক্ষক বাসায় রেফ্রিজারেটর, পছন্দের জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, এমনকি পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করার স্বপ্নও দেখেন।\' এ কথাগুলো তিনি বলছিলেন ভর্তি ফরমের বর্ধিত মূল্যের একটি যুক্তি হিসেবে। উপাচার্য মহোদয়ের কথাগুলো এভাবেই ছাপা হয়েছে সমকালে ১০ সেপ্টেম্বর।
দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকদের নেতাও ছিলেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে, তিনি কী করে চিন্তা করলেন মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের অতিরিক্ত ডিউটি করে একজন শিক্ষক রেফ্রিজারেটর কেনেন, বেড়াতে যান, পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করেন! তাই কি? তাহলে কি শিক্ষকদের বাসায় কোনো ফ্রিজ নেই, তারা বসে থাকেন ভর্তি পরীক্ষার দিনগুলোর জন্য? কিন্তু আমি উপাচার্যের কথায় মর্মাহত হয়েছি। তিনি এভাবে না বললেও পারতেন। শিক্ষকদের অনেকেরই বাড়ি-গাড়ি আছে এবং তা বৈধ আয়েই সম্ভব হয়েছে। আমার বিশ্বাস, তিনি হয়তো কথাটা এভাবে বলতে চাননি, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তিনি নিজেও ভালো করে জানেন, এভাবে শিক্ষকদের সম্পর্কে ঢালাও মন্তব্য করা যায় না।
আসল কথা হচ্ছে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। গত ২৭ আগস্ট দায়িত্ব পাওয়ার একশ\' দিন পার করলেন তিনি। তার এই একশ\' দিনকে যদি মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে তার \'পারফরম্যান্স\' যে খুব খারাপ তা অবিশ্যি বলা যাবে না। তিনি স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন। রাজাকারমুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমান্তে বেড়া দিতে চান। এগুলো সবই ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু তার আমলেই ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি করল। হোক না তা রাবার বুলেট_ এটা তো তার \'ইমেজ\'কে খারাপ করল। তিনি সকল ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারেননি_ এটাও তার জন্য ভালো নয়। তিনি নির্বাচিত \'ভিসি\'_ এটা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। এখন পর্যন্ত তিনি শিক্ষক রাজনীতিতে জড়াননি_ এটা একটা ভালো দিক। জাবিতে মূলত এখন দুটি পক্ষ_ সাবেক উপাচার্যের সমর্থকদের একটা অংশ, অপর অংশে রয়েছে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি শিক্ষকদের একটা অংশ। তিনি কোনো অংশেই নেই এটা ভালো লক্ষণ। আমার ধারণা, তার উপদেষ্টারা তাকে সঠিক উপদেশটি দিচ্ছেন না। দিলে ভর্তি ফরমের মূল্য বাড়ানো হতো না। এর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। ভর্তি ফরমের মূল্য বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বৃদ্ধি হবে, এটা কাম্য নয়। যদিও ছাত্রদের দাবির মুখে ফরমের দাম ৫০ টাকা কমানো হয়েছে।
জাবি ভিসি দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তার এই আহ্বান সবাই প্রশংসা করেছিল সেদিন। ১৯৭০-৭১ সালে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার যাত্রা শুরু করেছিল তা আজ অনেক \'বড়\' হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের \'অর্জন\' কতটুকু, তা আজ ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। নতুন নতুন অনেক বিভাগ খোলা হয়েছে। কিন্তু সিনিয়র শিক্ষক নেই। এমনকি সিনিয়র শিক্ষক ছাড়াই চলছে কোনো কোনো বিভাগ। ভাবতে অবাক লাগে, ১২-১৩ বছরের পুরনো বিভাগ চলছে প্রভাষকদের দিয়ে। প্রভাষকরা নতুন। সবে পাস করে বিভাগে যোগ দিচ্ছেন। তারা মাস্টার্স পর্যায়ে ক্লাস পর্যন্ত নিচ্ছেন। পরীক্ষা কমিটিতে থাকছেন। এতে করে কি শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে? আরও অবাক কাণ্ড সিনিয়র প্রফেসর ছাড়াই এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। যাদের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি করানো হচ্ছে_ এটা উপাচার্য মহোদয় খোঁজ নিতে পারেন। কোনো কোনো বিভাগে পিএইচডি কমিটি গঠিত হয়েছে যাদের দিয়ে, তাদের অনেকেরই পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রি নেই। উপাচার্য মহোদয়, এতে কি শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে? এমফিল, পিএইচডি কোর্সে সিলেবাস ছাড়াই ছাত্র ভর্তি করানো হয়েছে। এসব তথ্য আপনাকে সরবরাহ করা হয়েছে কি-না, আমি জানি না।
উপাচার্য মহোদয় \'স্বপ্নের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়\' প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, যদি নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো নেন : ১. নূ্যনতম তিন থেকে চারজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী অধ্যাপক ছাড়া কোনো বিভাগে এমফিল ও পিএইচডি কোর্স চালু না করা; ২. পিএইচডির অভিসন্দর্ভ (থিসিস) দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা (যেটা এখন নেই); ৩, পিএইচডি থিসিস ইংরেজিতে লেখা বাধ্যতামূলক করা; ৪. পিএইচডি কমিটিতে ডিনকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়ানো; ৫. বিতর্কিত কোনো ব্যক্তিকে (একাডেমিক দুর্নীতি, যৌন অপরাধে অপরাধী) কমিটিতে না রাখা; ৬. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা, ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করা (এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গ্রেডিং নিয়ে প্রশ্ন আছে); ৭. এমফিল ও পিএইচডি কোর্সের ক্লাস নিয়মিত মনিটর করা; ৮. নতুন নতুন বিভাগে প্রফেসরদের সংখ্যা বাড়ানো। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে সংশ্লিষ্ট অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষকদের ওই বিভাগে \'ট্রান্সফার\' করা; ৯. প্রভাষক নয়, বরং সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া; ১০ প্রভাষক নিয়োগে চার স্তরবিশিষ্ট \'নিয়োগ প্রক্রিয়া\' (রেজাল্ট, মৌখিক, ডেমো ও লিখিত পরীক্ষা) চালু করা।
মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। অতীতে যারাই উপাচার্য হয়েছেন, তারাই \'রাজনৈতিক বিবেচনায়\' শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি যিনি বিভাগের চেয়ারম্যান কর্তৃক সহকারী অধ্যাপক পদে \'সুপারিশকৃত\' হননি (সমকাল ৯ এপ্রিল, ২০১২) তাদেরও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা তখন যৌন নিপীড়ককে পদোন্নতির তদবির করছেন_ তিনি অনুমোদন করেননি বটে; কিন্তু \'চাপের মুখে\' যদি তা করেন, তাহলে উচ্চশিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে আপনি চিন্তা-ভাবনা করবেন, আমরা আপনার কাছে এটাই প্রত্যাশা করি। আপনার \'স্বপ্নের জাহাঙ্গীরনগর\' কাগজ-কলমে থাকুক_ তা আমরা কেউই চাই না।
Daily SAMAKAL
26.09.12

সংকট উত্তরণ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাসংক্রান্ত রায়েই নিহিত


উচ্চ আদালতের যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়েছিল, ওই রায়েই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি দিকনির্দেশনাও আছে। দীর্ঘ ১৬ মাস পর গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের বিচারপতিরা রায় লেখা শেষে তাতে স্বাক্ষর করেন এবং তা ওয়েবে প্রকাশ করা হয়। এটি একটি যুগান্তকারী রায় এবং দ্রুত তা উচ্চ আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে আদালত একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ব্লগে এ রায় নিয়ে একটি ছোট্ট মন্তব্য আমার চোখে পড়েছে। কোনো 'সরকারি কর্মকর্তা' অবসরে যাওয়ার পর কোনো 'সিদ্ধান্তে' স্বাক্ষর করতে পারেন কি না! বিচারপতিরা সেই অর্থে 'সরকারি কর্মকর্তা' নন। গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত চাকরিতে থেকেই তাঁরা নেন ও পরে তাতে স্বাক্ষর করেন। এটা রেওয়াজ। অতীতেও এমনটি হয়েছে। কিন্তু যিনি অবসরে চলে গেছেন এক বছর আগে, তিনি স্বাক্ষর করতে পারেন কি না- এটা একটা আইনি প্রশ্ন। আমি আইনজ্ঞ নই। এর সঠিক ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না। তবে ব্লগের লেখালেখিতে এ বিষয়টি আমার চোখে পড়েছে। একজন সচিব অবসরে যাওয়ার এক বছর পর এসে পুরনো কোনো সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করতে পারেন না। একজন অধ্যাপক অবসরে যাওয়ার এক বছর পর পুরনো কোনো সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করতে পারেন না। একজন উপাচার্যও পারেন না। তিনি বা আমরা যখন অবসরে যাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয় ওই দিনই। বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে গিয়েছিলেন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের পর পরই। রায়টি দেওয়া হয়েছিল ২০১১ সালের ১০ মে। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় দিতে না পারলেও সংক্ষিপ্ত একটি রায় তাঁরা দিয়ে গিয়েছিলেন। বিচারপতি খায়রুল হক বাদে বাকি বিচারপতিরা এখনো আপিল বিভাগে আছেন।
আমরা আগে থেকেই জানতাম, রায়টি সর্বসম্মতিক্রমে হয়নি। ওই রায়ের তিনটি দিক আছে। এক. সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা বলছেন, 'সংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধনী) আইন ১৯৯৬ রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার খর্ব করেছে বিধায় ওই তর্কিত আইন অসাংবিধানিক ও অবৈধ। সুতরাং তা বাতিল হবে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি, বর্তমান প্রধান বিচারপতিসহ মোট চারজন বিচারপতি ছিলেন এই মতামতের পক্ষে। অর্থাৎ তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন।
দুই. আপিল বিভাগের বাকি দুজন বিচারপতি অভিমত দিয়েছেন, 'ত্রয়োদশ সংশোধনী সাংবিধানিক ও বৈধ'। গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এর প্রয়োজন আছে বলেও তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
তিন. একজন বিচারপতি ত্রয়োদশ সংশোধনীকে 'সাংবিধানিক ও বৈধ বলে স্বীকার করলেও এটি রাখা বা না রাখার ভার ছেড়ে দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হাতে। পুরো তিনটি মতামত নিয়েই একটি রায় এবং রায়টি হয়েছে সর্বসম্মতিক্রমে নয়; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে।
প্রকাশিত রায়ের অনেক দিক আছে, যা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। ১. যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বাতিল হয়েছে। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আইনগতভাবে বিবেচনায় নেওয়া যাবে না; ২. তবে বাকি তিনজন বিচারপতি যেহেতু এই সংশোধনীকে 'বৈধ ও সংবিধানসম্মত' বলেছেন এবং যেহেতু তাঁদের মতামতও রায়ের একটি অংশ, সে ক্ষেত্রে তাঁদের মতামত আমরা 'যেকোনো ফর্মে' বিবেচনায় নিতে পারি; ৩. যেহেতু পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন 'তত্ত্বাবধায়ক সরকারের' মাধ্যমে সম্পন্ন করা, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে এই সরকার পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে- এটা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি; ৪. যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নিযুক্তিকে নিরুৎসাহী করা হয়েছে, এটাকেও ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে; ৫. একজন বিচারপতি যেহেতু 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের' ভার সংসদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে দশম জাতীয় সংসদ কিভাবে আয়োজন করা যায়, সে ব্যাপারে সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমার মতে, স্পিকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন এবং দুটি বড় দল বা জোটের পাঁচজন সদস্য নিয়ে এই সরকার গঠিত হতে পারে, যাঁরা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করবেন। তবে নিরপেক্ষতার স্বার্থে স্পিকারসহ কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না; ৬. ইসিকে শক্তিশালী করার কথাও বলা আছে রায়ে। বিষয়টি নতুন নয়। অনেকেই ইসিকে শক্তিশালী করার কথা বলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর ইসি সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করে। সেখানেও এ প্রসঙ্গটি উঠেছে। ইসিকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার কথা বলা হলেও আইন সংশোধন ছাড়া ইসিকে স্বাধীন করা যাবে না। তত্ত্বগতভাবে ইসি স্বাধীন হলো। কিন্তু নির্বাচন চলার সময়ের আগে ও পরের মাসগুলো কয়েকটি মন্ত্রণালয় যদি ইসির নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্বাচনের এক মাস আগে ও নির্বাচনের এক মাস পর ইসির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের (মাঠপর্যায়ে) বদলি করার ক্ষমতা পাবেন। এমনকি মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যদি আইনবহির্ভূর্ত কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তাঁকে শাস্তি দিতে পারবেন। শুধু দু-একটি ধারা পরিবর্তন করে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করা যাবে না। সত্যিকার অর্থেই সংসদে আইন পাস করিয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। আর্থিকভাবেও ইসি স্বাধীন হবে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকবে। নতুবা অর্থের জন্যই সরকার ইসির কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে। সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা রায়ে বলা আছে। এটা একটা ভালো দিক। যদি সংসদ সদস্যদের বহাল রেখে নির্বাচন হয় (যা সংশোধিত সংবিধানে আছে), তাহলে সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা সংসদ সদস্যরা স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটাবেন, তখন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের করার কিছুই থাকবে না। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর প্রথম বড় ধরনের সংশোধন করা হয় ২০০১ সালে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে আরপিওতে আরো সংস্কার আনা হয়। এ ক্ষেত্রে ইসিকে আরো সংস্কার আনতে হবে আরপিওতে। শুধু এ বিষয়টি নিয়ে ইসি যদি আবার মতবিনিময় করে, তাহলে ইসি ভালো করবে।
আমি আগেই উল্লেখ করেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসংক্রান্ত রায়ের মধ্যেই সংকট সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া আছে। যেকোনো ফর্মে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, নতুবা দেশ এক গভীর সংঘাতে নিপতিত হবে। উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের আগে বেশ কয়েকজন 'অ্যামিকাস কিউরি' (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ করেছিলেন। 'অ্যামিকাস কিউরি'দের একজন বাদে সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁরা দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতামতও আমরা ফেলে দিতে পারি না। বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি- এটা উপলব্ধি করেই উচ্চ আদালত 'আরো দুটো সংসদ' তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। আমি এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। সংসদ প্রকাশিত রায়ের আলোকে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিক। সেই সিদ্ধান্তে বিএনপি সম্পৃক্ত হোক। সংসদে আলোচনায় তাঁদের সুযোগ দেওয়া হোক। পরস্পরের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস যদি থাকে, আমার বিশ্বাস একটা পথ আমরা খুঁজে পাবই। ইসিকে স্বাধীন করতে হবে পর্যায়ক্রমে, যাতে ইসি সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে একাদশ কিংবা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে। উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। কিন্তু বিচারপতিদের একটা বড় অংশ যেখানে চেয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকুক- এটাই হোক আলোচনার ভিত্তি।Daily KALER KONTHO25.09.12

মন্ত্রিসভায় রদবদল ও বিবিধ প্রসঙ্গ



সবচেয়ে অবাক হয়েছি ‘কালো বিড়াল’ খ্যাত সুরঞ্জিত বাবু এখনও মন্ত্রী! ‘উজিরে খামোখা’ সুরঞ্জিত বাবুকে কি মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে শুধু ‘গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলার জন্য? ইনিয়ে বিনিয়ে তিনি যা বলতে পারেন তাতে বিষয়বস্তুর গভীরতা না থাকলেও
একশ্রেণীর মানুষ তাতে খুশি। এটাও একটা ‘চাকরি’। ‘গোলটেবিল’-এ নিত্য যাওয়া। কোন মন্ত্রণালয় না পেলেও, তাতে ক্ষতি নেই। ‘পতাকা ওড়ানো’ গাড়ি তো আছে। কিন্তু ৭০ লাখ টাকার কাহিনী কি মানুষ ভুলে গেছে?
বহুল প্রত্যাশিত মন্ত্রিসভায় রদবদল হল। জাতি নতুন সাতজন মন্ত্রী পেয়েছে। এতে চমক যেমন নেই, তেমনি প্রধানমন্ত্রী ১৫ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীদের দফতর যখন বণ্টন করেন, তাতেও নেই আশাবাদী হওয়ার মতো কোন কারণ। বিতর্কিত ও অযোগ্য মন্ত্রীরা রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। সাহারা খাতুন মন্ত্রণালয় পরিচালনায় পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ ছিলেন এটা খোদ আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও স্বীকার করেন। তিনি একের পর এক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। শ্রমিক নেতা আমিনুলের হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলীর গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্ব মিডিয়া যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দিকে আঙুল নির্দেশ করছিল, তখন সাহারা খাতুন দিব্যি পুলিশের প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া ছিল ভুল। তিনি এখন গেলেন ডাকে (ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়)। বললেন তার ‘প্রমোশন’ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় আরেকটি ভুল করলেন মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে। আমলা ছিলেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ‘জনতার মঞ্চ’-এর অন্যতম রূপকার ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারে (১৯৯৬-২০০১) তিনি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী। তার মেধা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও তার সংসদ সদস্যপদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিলেও, জটিল আইনি মারপ্যাঁচে এখনও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন। নৈতিকভাবে অনেক আগেই তার ‘পরাজয়’ হয়েছে। তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের অন্তর্ভুক্তিতে তিনি নিজেও অবাক হয়েছিলেন। আলোচনায় কখনও তিনি ছিলেন না। সংসদীয় কার্যক্রমে তিনি অংশ নিয়েছেন এমন ঘটনা ঘটেছে খুব কম। যা অবাক করার বিষয় তা হচ্ছে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জনাব ফারুকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও পাসপোর্ট জব্দের পরামর্শ ছিল বিশ্বব্যাংকের। বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘সাকো’-এর তিনি ছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী যে জানেন না, তেমন নয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট তার কাছে থাকার কথা। এ সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। আওয়ামী লীগে তার চেয়ে আরও যোগ্য লোক রয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই পেয়েছেন মৎস্য মন্ত্রণালয়। পাসপোর্ট কেলেংকারির ঘটনায় তিনি অভিযুক্ত ও বিতর্কিত। কোন যুক্তিতে তাকে প্রতিমন্ত্রী করা হল, তার হিসাব আমি মেলাতে পারি না। আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো অথর্ব লোকটি এখনও আমাদের অর্থমন্ত্রী। অর্থব্যবস্থায় একের পর এক বিতর্কের জš§ দিয়ে চলেছেন এই লোকটি। বোধ করি মুহিত সাহেবের মতো অথর্ব ও অযোগ্য অর্থমন্ত্রী এ জাতি কখনও পায়নি। হলমার্কের মতো একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠান যখন সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আÍসাৎ করল, তিনি বললেন এটা তেমন বড় কোন অংকের টাকা নয়। সংসদে এটা নিয়ে বিতর্ক উঠল। স্বয়ং সরকারি দলের দু’জন সিনিয়র নেতা অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সমালোচনা করলেন। বললেন, ‘তার বয়সের কারণে এমনটি হচ্ছে’। প্রধানমন্ত্রীও স্বীকার করলেন তার বয়সের কথা। বয়স তার হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু যে লোক অর্থনীতির ‘বারোটা’ বাজিয়ে ছেড়েছেন, তার কি আদৌ প্রয়োজন রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে? এ প্রশ্নের জবাব শুধু প্রধানমন্ত্রীই দিতে পারবেন। কিন্তু সাধারণ একজন করদাতা হিসেবে আমি যা বুঝি, তা হচ্ছে শেয়ার কেলেংকারির সঙ্গে জড়িতদের যিনি বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারেননি, ডেসটিনির ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার অর্থ পাচার যিনি রোধ করতে পারেননি, কিংবা ইউনিপেটুইউর সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ও আইটিসিএলের আÍসাৎকৃত ১০০ কোটি টাকা যিনি উদ্ধার করতে পারেননি, তার অর্থ মন্ত্রণালয়ে থাকার কোন যোগ্যতাই নেই। তিনি যত দ্রুত বিদায় হবেন, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমাদের ‘ফটোগ্রাফার’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। ভাগ্যবান আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন ‘গুণে’ মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করলেন, বলতে পারব না। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য ‘সম্মান’ বয়ে আনতে না পারলেও, একটা জায়গাতে তিনি ‘গিনেস বুক’-এ নাম লিখিয়ে ফেলতে পারেন আর তা হচ্ছে তার বিদেশ ভ্রমণ। নানাবিধ কারণে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে তার বিদেশ ভ্রমণ থেমে থাকেনি। এই লেখাটি যখন ছাপা হবে, বোধ করি তখনও তিনি বিদেশে। তাকে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দু’জন উপদেষ্টা (মন্ত্রীর সমমর্যাদায়) থাকলেও, বহির্বিশ্বে আমাদের অর্জন কীÑ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে আমি তা বুঝে উঠতে পারি না। তিনিও বহাল তবিয়তে থেকে গেলেন।
আমাদের দিলীপ বড়-য়া। এখনও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন কিনা জানি না, কিন্তু মন্ত্রী হয়েই নিজ আÍীয়-স্বজন ও প্রিয়তমা পতœীর জন্য, মেয়ের জন্য গোটাআটেক প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। যমুনা সার কারখানা থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে একটি গাড়ি ও এসি পাওয়ার কাহিনী এখনও মানুষ স্মরণ করে। আজীবন ‘দুঃখী’ মানুষের জন্য তিনি কাজ করে গেছেন! কিন্তু প্লট, গাড়ি ও এসির লোভ তিনি সামলাতে পারলেন না। তিনিও আছেন। রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজুর মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। কিন্তু নরসিংদীর জনপ্রিয় নির্বাচিত মেয়র লোকমান হোসেনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি কি অস্বীকার করতে পারবেন? মৎস্যবিষয়ক মন্ত্রী লতিফ বিশ্বাসÑ জাতীয় রাজনীনিতে আমরা কেউ তাকে কখনও চিনিনি, দেখিওনি। কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় তার সাত তলা বাড়ি, নিজের এক স্ত্রীকে ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হতে ‘সাহায্য’ করার সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তিনিও আছেন। মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। ছিলেন তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। তথ্যটি এখন গেল। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এখন আবার পূর্ণ মন্ত্রী। একজন অবশ্য ছোট মন্ত্রী ছিলেন তিনি গেলেন সমাজকল্যাণে। কেননা সমাজকল্যাণের পূর্ণ মন্ত্রী অসুস্থ। তার চাকরিও থাকল। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় কি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন পূর্ণ মন্ত্রী থাকতে হবে? যেখানে পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো বড় মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী মাত্র একজন, সেখানে সংস্কৃতিতে পূর্ণ মন্ত্রী! কালাম সাহেব অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। কিন্তু সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা খুব ভালো যাচ্ছিল না। বিটিভি এখন যখন ম. হামিদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, সেখানে তিনি নিশ্চুপ। তার আমলে ১৮টি টিভি চ্যানেল লাইসেন্স পেল, একটি চ্যানেলে তার ভাই পরিচালক হলেন, নিন্দুকেরা নানা কথা বললেও তিনি ‘চাকরি’ হারালেন না। সবচেয়ে অবাক হয়েছি ‘কালো বিড়াল’খ্যাত সুরঞ্জিত বাবু এখনও মন্ত্রী! ‘উজিরে খামোখা’ সুরঞ্জিত বাবুকে কি মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে শুধু ‘গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলার জন্য? ইনিয়ে বিনিয়ে তিনি যা বলতে পারেন তাতে বিষয়বস্তুর গভীরতা না থাকলেও একশ্রেণীর মানুষ তাতে খুশি। এটাও একটা ‘চাকরি’। ‘গোলটেবিল’-এ নিত্য যাওয়া। কোন মন্ত্রণালয় না পেলেও, তাতে ক্ষতি নেই। ‘পতাকা ওড়ানো’ গাড়ি তো আছে। কিন্তু ৭০ লাখ টাকার কাহিনী কি মানুষ ভুলে গেছে? দিরাইয়ে কোটি কোটি টাকায় তৈরি মার্কেটের কাহিনী কি মানুষ ভুলে গেছে। সংস্কারবাদী ‘র‌্যাটস’-এর একজন সদস্য হিসেবে মন্ত্রিত্ব ফিরে পেয়েছেন বটে, কিন্তু সরকারপ্রধানের আস্থা কি পেয়েছেন? নিন্দুকেরা অচিরেই বলতে শুরু করবেন তিনি ‘গোলটেবিল’ মন্ত্রী। অবশ্য তাতে তার কিছু যায় আসে না।
তুলনামূলকভাবে যোগ্য ও কম কথা বলা ওবায়দুল কাদেরের এক মন্ত্রণালয় (রেলওয়ে) গেল। এলেন মুজিবুল হক। রেলওয়ের মতো একটি মন্ত্রণালয়ে কি ‘শক্ত কিসিম’-এর একজন লোকের দরকার ছিল না? ইনু সাহেবকে নিয়ে বলার কিছু নেই। গণবাহিনীর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজে প্রকৌশলী হয়েও একদিনের জন্যও যিনি অর্থ আয়ের জন্য ‘চাকরি’ করেননি, কিংবা চাঁদাবাজি করে সংগঠন চালানোর অভিযোগ যার বিরুদ্ধে রয়েছে, তিনি এখন ফুল মন্ত্রী। আগামী দিনই প্রমাণ করবে তিনি কতটুকু বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবেন। কিন্তু আমরা যারা গবেষণা করি, আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাসদ কর্তৃক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কাহিনী মনে আছে। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেই জাসদের জš§। আজ সেই আওয়ামী লীগ সরকারেই জাসদের সভাপতি মন্ত্রী। এরই নাম কি রাজনীতি?
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় রদবদল করলেন। এটা তিনি করতেই পারেন। সংবিধান তাকে এ অধিকার দিয়েছে। এটা রুটিনওয়ার্ক। তবে তিনি ভালো করতেন যদি : ১. অযোগ্য মন্ত্রীদের বাদ দিতেন, ২. বিশ্বমন্দার এ যুগে ছোট মন্ত্রিসভা করতেন, ৩. তোফায়েলের মতো ঝানু রাজনীতিবিদের এই মুহূর্তে তার প্রয়োজন ছিল। তার ‘অভিমান’ ভাঙানোর জন্য সরকারপ্রধানের একটি ফোনই যথেষ্ট ছিল, ৪. মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের চেয়ে মানুষ এ মুহূর্তে চায় আর্থিক দুর্নীতিতে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। চায় সুশাসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য সীমিত রাখা। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা বিরোধী দলের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যাওয়া ও দরকার একটি নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলা। ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, মন্ত্রীদের অতি কথা বলা বন্ধ করা। মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়ালেন। রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ল। যেখানে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো (স্পেন, গ্রিস, ইতালি) কৃচ্ছ্রসাধন করছে, সেখানে আমরা রাষ্ট্রের খরচ বাড়ালাম। সাধারণ মানুষ এটা থেকে কী পেল? কিছুই না।
Daily Jugantor
24.09.12

সংবিধান ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংশোধিত সংবিধানের আলোকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বেশকিছু নির্দেশনা রয়েছে, যে নির্দেশনা অনুসরণ করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি সমঝোতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবিধানে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, সেই অসঙ্গতিগুলো দূর করা দরকার। আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যদি সংবিধান সংশোধন করা না হয়, তাহলে একটি বড় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি হাইকোর্টের এটা চ্যালেঞ্জও হতে পারে। নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণও জরুরি। এটা না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আশার কথা মহাজোট সরকারের শরিকরাও কেউ কেউ সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছেন।
এই নির্বাচন নিয়ে সাংবিধানিকভাবে সমস্যা রয়ে গেছে। সংবিধানের ৭২ (২) ধারায় বলা আছে, ‘যে কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হইবে।’ তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যেহেতু সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়নি, সেহেতু ৩৫০ জন (প্রতি আসনে একজন করে মহিলা আসনসহ), একুনে দশম নির্বাচনের পর পরই জাতি মোট ৬৫০ সংসদ সদস্য পেল! কে তখন সংসদীয় আসনে প্রতিনিধিত্ব করবেন, যেটা নিয়ে বড় সমস্যা তৈরি হবে। সাংবিধানিক সমস্যা আরও আছে। সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারায় বলা আছে ‘মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ লক্ষ করুন, বলা আছে ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার’ কথা। এখন তো সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়নি। তাহলে সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন হবে কীভাবে? সমস্যা আরও আছে। সংসদ নির্বাচন হবে। সংবিধানের ৭২ (২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। এ ক্ষেত্রে আগের সংসদের ৩৫০ সদস্যের কী হবে? সংবিধানে কোথাও বলা হয়নি যে আগের সংসদ ভেঙে যাবে বা সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। বৈসাদৃশ্য আরও আছে। ৭২ (৩)  ধারা অনুযায়ী  ‘রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙিয়া না দিয়া থাকিলে বৈঠকের (সংসদ অধিবেশন) তারিখ হইতে পাঁচ বত্সর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙিয়া যাইবে’। এখানে এক ধরনের বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। ৭১ (১) ধারায় বলা আছে ‘এক ব্যক্তি একই সময় একাধিক নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য হইবে না।’ এখন নবম জাতীয় সংসদের একজন প্রার্থী তিনি পদত্যাগ না করলে তো দশম সংসদে প্রার্থী হতে পারেন না। সংবিধানের ১২১ নং ধারায় বলা আছে ‘সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রত্যেক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় একটি করিয়া ভোটার তালিকা থাকিবে।’ এখন উক্ত ৯০ দিনের মধ্যে যদি নির্বাচন কমিশন ‘একটি করে ভোটার তালিকা’ প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হন, তখন কী হবে?
নির্বাচনের এখনও অনেক দিন বাকি। কিন্তু তারপরও এই নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। দেশের সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ, এমনকি হিলারি ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্বও সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করেছেন। এটা ঠিক সমঝোতা যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং আওয়ামী লীগ যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, সেই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।
এ দেশে ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু একটি বড় দল (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ) অংশগ্রহণ না করায়, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। অন্যদিকে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দুটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করায় শুধু দেশেই নয়, বরং বিদেশেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এখন ২০১৩ সালে যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে একটি বড় দল বিএনপি যদি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সঙ্গত কারণেই ওই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি অবিসংবাদিত শক্তি। একটি দলকে বাদ দিয়ে অন্যদল এককভাবে যেমন গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি, ঠিক তেমনি এই দু’দলের একটিকে বাদ দেওয়ার কিংবা ‘মাইনাস’ করার কোনো ষড়যন্ত্রও সফল হয়নি। এই দল দুটোর মাঝে প্রচণ্ড বিরোধ আছে। এই বিরোধ এখন ব্যক্তি পর্যায়ে চলে গেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই দল দুটোর কারণেই গণতন্ত্র এ দেশে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। আমরা যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, এ দেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ন’টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৬ (তৃতীয়), ১৯৮৮ (চতুর্থ) ও ১৯৯৬ (ষষ্ঠ) সালে অনুষ্ঠিত হওয়া সংসদ নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। বাকি ৬টি সংসদ নির্বাচন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শতকরা ৭৩.২০ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। ওই সময় সংসদে কোনো বিরোধী দল ছিল না। ওই সময়ও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে (রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের আওতায়) সদ্য গঠিত বিএনপি ২০৭টি আসন পায়। শতকরা হিসাবপ্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪১.০৭ ভাগ। আওয়ামী লীগ মিজান ও মালেক গ্রুপ আলাদাভাবে নির্বাচন করে। যৌথভাবে তারা পায় ৪১টি আসন (মালেক ৩৯), শতকরা হিসাবে যা ছিল ২৭.৩৪ ভাগ। এর বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় মুসলিম লীগ ও আইডিএল ঐক্য (২০ আসন, ১০.০৭ ভাগ ভোট)। গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪১ আসন (৩০.৮১ ভাগ ভোট) ও আওয়ামী লীগ ৮৮ (৩০.০৮ ভাগ ভোট) আসন পেয়েছিল। জামায়াত ১৮ ও জাতীয় পার্টি ৩৫ আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দৃশ্যপট বদলে যায়। প্রথমবারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (১৪৬ আসন, ৩৭.৪৪ ভাগ ভোট) বিজয়ী হয়। বিএনপির আসন দাঁড়ায় ১১৬ (৩৩.৬১)। জাতীয় পার্টি ৩২ (১৬.৩৯ ভাগ ভোট) আসন নিয়ে তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০১)  দৃশ্যপট আবার বদলে যায়। বিএনপি ১৯৩ আসনে (৪০.৯৭ ভাগ ভোট) পেলেও চারদলীয় জোট পায় শতকরা ৪৭ ভাগ ভোট, আর আসন পায় ২১৬। আওয়ামী লীগের আসন কমে এসে দাঁড়ায় ৬২ (৪০.১৩ ভাগ ভোট)। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (২০০৮) প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ২০০৭ সালের ‘এক-এগারর’ ঘটনা পুরো রাজনৈতিক সিসটেমকে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের ভূমিকা এই ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করে। এমনই এক পরিস্থিতিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় (২৩১ আসন, ৪৮.০৬ ভাগ ভোট)। বিএনপির আসন কমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৩০টিতে (শতকরা ৩২.৪৫ ভাগ ভোট)। জাতীয় পার্টি (২৬ আসন ৭.০৫ ভাগ ভোট ) তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখে।
সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। এক. এ দেশের রাজনীতি দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই দল দুটোর যেকোনো একটিকে বাদ দিয়ে এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করা অসম্ভব। রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় দল দুটোর মাঝে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার। দুই. বড় দল দুটোর বাইরে তৃতীয় একটি বড় দলের জন্ম হয়নি। তৃতীয় ধারার কথা বারবার বলা হলেও, সাধারণ মানুষ এই তৃতীয় ধারার প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় পার্টি তৃতীয় শক্তি নয়। বরং একটি আঞ্চলিক দল। এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের ‘ঐক্য’ তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার পথে প্রধান অন্তরায়। তিন. এককভাবে নির্বাচন করার ফলে, সেই নির্বাচনগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচন এর বড় প্রমাণ। চার. এ দেশের রাজনীতিতে দুটি ধারা দৃশ্যমান। একদিকে ধর্মকে প্রাধান্য করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি ধারা, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, এককালের সমাজতন্ত্রী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সমর্থকদের একটি ধারা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে যে অচলাবস্থা, তার কেন্দ্র মূলত একটি— আর তা হচ্ছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। সংবিধানে ১৫তম সংশোধনী আনার ফলে এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানেই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক পরিচালিত নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আওয়ামী লীগও অতীতে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত নির্বাচন সমর্থন করেনি। মাগুরা ও ভোলার উপনির্বাচন আমাদের কাছে এক-একটা দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রমাণিত হয়েছে, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে প্রভাব খাটায়। তাই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি উঠেছে, তা  যুক্তিযুক্ত। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠেছে, যাতে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কথাটা না বলে একটি ‘নির্দলীয় সরকার’ কথাটাও বলা যায়। সরকার সংবিধান সংশোধন করে একটি ‘নির্দলীয় সরকার’-এর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করে আন্তরিকতা দেখাতে পারে। তবে সংবিধান সংশোধন না করেও সরকার একটি ‘নির্দলীয় সরকার’ কাঠামোর আওতায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে। সেখানে ‘নির্দলীয় সরকার’-এর রূপরেখা থাকবে। মহাজোট সরকারের শরিক যে কেউ (জাসদ অথবা ওয়ার্কার্স পার্টি) সংসদে এ ধরনের একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে, যাতে বিএনপিসহ সকল দলের সমর্থন থাকবে। ওই প্রস্তাবটির ভিত্তি হচ্ছে উচ্চ আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বাতিল করে যে রায় দিয়েছিলেন, সেটি। আদালত তার রায়ে উল্লেখ করেছিলেন যে আগামী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জাতীয় সংসদে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিএনপির সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। একটি ‘ফর্মুলা’ উপস্থাপনের আগে বিএনপির যদি আপত্তি থাকে, তাহলে সেই ‘ফর্মুলা’ কোনো কাজ দেবে না।
এখন একটি ‘নির্দলীয় সরকার’ কীভাবে গঠিত হবে, সে ব্যাপারে কয়েকটি ‘বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এক. বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগে মহাজোট সরকার পদত্যাগ করবে ও একটি নির্দলীয় সরকার শুধু ৩ মাসের জন্য দায়িত্ব নেবে; দুই. একটি ‘এলডার্স কাউন্সিল’ নির্দলীয় সরকারের দায়িত্ব নেবে, যারা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করবে; তিন. একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির (অথবা একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তির)  নেতৃত্বে সংবিধানিক পদের অধিকারীদের নিয়ে একটি সরকার। চার. স্পিকারের নেতৃত্বে দুটি বড় দলের সমসংখ্যক সদস্যদের (৫ জন করে) নিয়ে একটি সরকার। তবে কথা থাকে, স্পিকার অথবা সদস্যরা কেউই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
পাঁচ. যৌথ নেতৃত্বে (একজন বিএনপি, একজন আওয়ামী লীগ মনোনীত) একটি নির্দলীয় সরকার, যাদের কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না।
ছয়. রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি সরকার।
কোনো ফর্মুলাই চূড়ান্ত নয়। আসল কথা হচ্ছে একটি সমঝোতা। আর একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
Daily SAKALER KHOBOR,
25409.12

হলমার্কের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই কি মন্ত্রিসভায় সম্প্রসারণ?

 
সারা দেশের মানুষ যখন গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের গ্রেফতারের খবরটি শোনার জন্য, তখন ১৩ সেপ্টেম্বর ৭ জন মন্ত্রী শপথ নিলেন। মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে নেয়ার এটা কোনো উদ্যোগ কি না বলতে পারবো না, তবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এ কথাটাই ফিরছে চলতি সপ্তাহের প্রতিটি দিন। রোববার পর্যন্ত হলমার্ক ঘটনায় কেউই গ্রেফতার হয়নি। মিডিয়ায় এ ঘটনায় সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একজন উপদেষ্টার দিকে বারবার ইঙ্গিত করা হচ্ছে। অথচ সরকারের কারো মাথাব্যথা নেই। মানুষের এই উৎকণ্ঠার দিকে আদৌ নজর না দিয়ে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ করা হলো। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রী হলেন হাসানুল হক ইনু। আর তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রী হননি। ১৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিটি পত্রিকায় হেডিং ছিল তোফায়েল মন্ত্রী হচ্ছেন। এমনকি মন্ত্রী পরিষদের সচিবও বিবিসির বাংলা বিভাগকে জানিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে আমরা শুনলাম তাঁকে আদৌ আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কার কথা সত্যি, আমরা বলতে পারবো না। তবে তোফায়েল আহমেদ শপথ নেননি, এটাই বাস্তব। তিনি একটা যুক্তি দেখিয়েছেন, মানসিকভাবে তিনি প্রস্তুত নন এই মুহূর্তে। তোফায়েল আহমেদ পরিপূর্ণভাবে সুস্থ। একটি সংসদীয় কমিটির সভাপতিও তিনি। উপরন্তু কাপাসিয়া উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নির্বাচন তিনি পরিচালনা করছেন। যে ক’জন মন্ত্রী হয়েছেন, তার মাঝে তিনি নিঃসন্দেহে যোগ্য। অসুস্থতা তাকে এখনও কাবু করতে পারেনি। অতীতেও মন্ত্রী ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রী। মিডিয়ায় অনেক দিন থেকেই বলা হচ্ছিল সরকারের অদক্ষ মন্ত্রিসভাকে দক্ষ ও সচল করতে অচিরেই তোফায়েল আহমেদকে মন্ত্রী বানানো হবে। সেই সাথে রাশেদ খান মেননের কথাও আলোচিত হচ্ছিল বেশ জোরেশোরে। অথচ কেউ মন্ত্রী হলেন না। আওয়ামী লীগের যে ছ’জন মন্ত্রী হলেন, তাদের মাঝে একজন মহিউদ্দীন খান আলমগীর বাদে বাকিরা সবাই আনকোরা। এমনকি সংসদীয় কার্যক্রমেও তাদের সক্রিয় হতে দেখিনি। কিন্তু তাদের কপাল খুলে গেল। মন্ত্রী হলেন। তবে আমি তোফায়েল আহমেদের ব্যাপারে একটু আশ্চর্য হয়েছি বৈ কি! হতে পারেন তিনি সংস্কারবাদী। কিন্তু যোগ্যতায় তিনি অনেকের চাইতে এগিয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তার। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি কিছু কথা বলেছিলেন বটে। কিন্তু মূলধারা থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। তার মন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। ‘শেষ বেলা’য় মন্ত্রী তাকে নতুন কোনো মর্যাদায় নিয়ে যাবে না। মেনন মন্ত্রী হননিÑ এটা দলীয় সিদ্ধান্ত। সম্ভবত মেনন সাহেবের কাছে যা বিবেচ্য হয়েছে বেশি, তা হচ্ছে সরকারের সকল ‘অপরাধের’ দায়ভার গ্রহণ না করা। দ্বিতীয়ত আরেকটি চিন্তা তার ভেতরে কাজ করে থাকতে পারে। আর তা হচ্ছে আগামীতে মহাজোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে বামন্থীদের সমন্বয়ে তৃতীয় একটি ‘ধারা’র সূচনা করা। তবে তাতে তিনি সফল হবেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। জনাব হাসানুল হক ইনুর মন্ত্রিসভায় যোগদানে আমি অবাক হইনি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেই ইনু সাহেবরা প্রথম বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি আক্রমণ থেকে শুরু করে গণবাহিনীর জন্ম দিয়েছিল জাসদ। জাসদের গণভিত্তি কতটুকু তার পরিসংখ্যান শুধু নির্বাচন কমিশন  নয়, আমাদের কাছেও আছে। ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচন না করলে (নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন), তিনি তার জামানত ফিরে পেতেন কি না, আমি নিশ্চিত নই। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘সাবেক মন্ত্রী’ এ পরিচয়টা তিনি দিতে পারবেন বটে, কিন্তু আগামী তের মাসের যে রাজনীতি তাতে আদৌ গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবেন না। ইনু সাহেবের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির মধ্যে দিয়ে এখন মহাজোট সরকারে আওয়ামী লীগের বাইরে তিনটি দলের প্রতিনিধিত্ব ঘটলো। জাতীয় পার্টি, সাম্যবাদী দল ও জাসদ। জি এম কাদের ও হাসানুল হক ইনু নির্বাচিত সংসদ সদস্য হলেও, দিলীপ বড়–য়া সংসদ সদস্য নন। তার নিজের সংসদীয় নির্বাচনের রেকর্ড খুবই খারাপ। অতীতে  কখন পাঁচশত ভোটের উপর তিনি পাননি।  মহাজোটে জাতীয় পার্টির অন্তর্ভুক্তিতে স্ট্রাটেজিকলি শেখ হাসিনা ও তার সরকার নিঃসন্দেহে উপকৃত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বেশ ক’জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যারা লাঙ্গল মার্কা নিয়েই বিজয়ী হয়েছেন, ইনু সাহেবদের মত তাদের ‘নৌকা’ প্রতীক নিতে হয়নি। তবে এই জাতীয় পার্টিকে কি শেখ হাসিনা মহাজোটে পাবেন আগামী দিনে! এরশাদ সাহেব তো এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও নিন্দুকেরা এরশাদের এই ঘোষণায় ‘অন্য কিছু’র গন্ধ খুঁজে পান।
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করলেন। এটা তার অধিকার। তিনি যখন ইচ্ছা মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করতে পারেন। কিন্তু এই মুহূর্তে এটা করে কতটুকু লাভবান হবেন তিনি? মন্ত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে করে বাড়লো রাষ্ট্রের খরচ। সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে এখনও যখন স্থিরতা আসছে না, ইউরোপের অনেক দেশে যখন এখনও কৃচ্ছ্রতাসাধন চলছে, তখন আমাদের মত দেশে এত বড় একটি মন্ত্রিসভা রাখার আদৌ প্রয়োজন নেই। অনেক মন্ত্রীর অদক্ষতা ও দুর্নীতি দেশে ও দেশের বাইরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, সেখানে এই মুহূর্তে মন্ত্রিসভার কলেবর বৃদ্ধি করার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। সরকার নানাবিধ সমস্যায় আক্রান্ত। সর্বশেষ হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে পুরো অর্থনীতি এখন ঝুঁকির মুখে। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে শুধু সোনালী ব্যাংকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এতে আরো ২৯টি ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হলমার্কের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার বাইরেও ডেসটিনির ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার অর্থ পাচার, যুবক এর ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ইউনিপেটুইউর সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট কিংবা আইটিসিএলের ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার সাথে সরকারের প্রভাবশালী মহল জড়িত। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া ও ইব্রাহিম খালেদ তদন্ত রিপোর্টে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিচার হয়নি। কাকতালীয়ভাবে কি না জানি না, রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক রেলমন্ত্রী  সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস গভীর রাতে ৭০ লাখ টাকাসহ বিজেবির হাতে ধরা পড়ার পর মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সুরঞ্জিত ফিরে এসেছিলেন দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে। আজ হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সারা জাতি যখন ওই একটি বিষয়ের দিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখছেন এবং বামমনা দলগুলো যখন আওয়ামীবলয়ের বাইরে একটি ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে, ঠিক তখনই মন্ত্রিসভায় ৭ জন মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত হলেন। কিন্তু তাতে করে কি মানুষ হলমার্ক কেলেঙ্কারি ভুলে যাবে? নানা ফ্রন্টে সরকারের পারফরমেন্স খুব আশাপ্রদ নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে জটিলতা এখনও কাটেনি। অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ফিরে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। ড. ইউনূস ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরকারের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রেন্টাল আর কুইক রেন্টাল  এখন সরকারের গলার কাঁটা। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এখন ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিমেয় এই ‘বিদ্যুৎ সেবা’ নিতে হচ্ছে। ২০০৬ সালের আগে যেখানে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়নি, সেখানে গত অর্থবছরে দিতে হয়েছিল ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। আর গত তিন মাসে এ খাতে তেলে ভর্তুকির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা। (আমার দেশ, ১২ সেপ্টেম্বর)। কিন্তু তারপরও লোডশেডিং এখন খোদ ঢাকা শহরে দু’ ঘণ্টার ওপরে প্রতিদিন।
মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমবাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেখান থেকে নিত্য কর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক বছরে ব্যবসা সক্ষমতা সূচকে ১০ ধাপ অবনমনের ফলে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে ঠেকেছে। ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮ তম, অথচ এক বছর আগেও ছিল ১০৮তম। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ০.৮০ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১ ভাগ। এসব বিষয় সরকার প্রধানের গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া উচিত। কেননা সরকারকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। জনগণের কাছে ভোট চাইতে হবে। তাদের দক্ষতা দেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে নজর না দিয়ে শুধু মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়িয়ে আর যাই হোক জনগণের আস্থা অর্জন করা যাবে না।
সরকারের বয়স আর আছে মাত্র তের থেকে পনের মাস। সরকার নিজেও জানে যে বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, তা তারা পূরণ করতে পারেনি। সুশাসন তারা নিশ্চিত করতে পারেনি বরং উল্টোটি ঘটেছে। দুর্নীতি আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে গেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যখন দুর্নীতি হয় এবং তা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে বৈকি! দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছিলেন। অথচ আজ এমন একজন মন্ত্রী হলেন, তিনি ওই আবুল হোসেনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘সাকো’র এমডি। তাহলে ওই নয়া মন্ত্রীর মাধ্যমে কি দুর্নীতি ছড়াবে না? এ প্রশ্ন আজ অনেকের। ত্যাগী, যোগ্য ও সৎ লোক আওয়ামী লীগে আছে। তাদেরকে বাদ দিয়ে অচেনা, অযোগ্য লোকদের যখন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। ‘কালো বিড়াল’কে মন্ত্রিসভায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা, অযোগ্য লোকদের মন্ত্রী বানানোর মধ্যে দিয়ে আর যাই হোক সরকারের ইমেজ বৃদ্ধি হবে না। মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের চাইতেও এই মুহূর্তে যা জরুরি তা হচ্ছে দুর্নীতি রোধের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হওয়া, বিরোধী দলের সাথে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার গঠনে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে দশম জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। সরকার প্রধান এ পথে হাঁটছেন না। ইতিহাস থেকে তিনি শিক্ষা নেননি। অযোগ্য, মূর্খ লোকদের মন্ত্রী বানিয়ে তিনি সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। কিন্তু সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারেননি।

সরকারের পড়ন্ত বেলা ও কিছু প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত বহুল প্রত্যাশিত মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হলো। কিন্তু তাতে চমক নেই। ৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী, ২ জন প্রতিমন্ত্রী। ৭ জনের মধ্যে একজন শুধু শরিক দলের। ইতিমধ্যে তাদের দফতর বণ্টনের পাশাপাশি পুরনো কিছু জায়গায়ও হাত দেয়া হয়েছে। হাসানুল হক ইনু মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার চেষ্টা অনেক দিন ধরেই করে আসছিলেন। সরকারের পড়ন্ত বেলায় এসে সফল হলেন। চমক নেই এ কারণে যে, মন্ত্রিসভার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও যোগ দেননি তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন। মেনন সাহেবের দলের একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। আর মানসিকভাবে প্রস্তুত নন জানিয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। এদের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেয়ার নানা সমস্যা থাকতে পারে। তোফায়েল আহমেদের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ‘ম্যাসেজ’। বলা হয় নতুন বার্তাও বটে। কিছুটা অভিমান তার আছে। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না করা, দলে তাকে ‘ক্ষমতাহীন’ করে দলের উপদেষ্টা পরিষদে ‘পাঠিয়ে’ দেয়া ইত্যাদি কারণে খোদ প্রধানমন্ত্রীর ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। তবে তিনি দলের বিরুদ্ধে যাননি। দলের ও সরকারের সংকটে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে বারে বারে সমর্থন করে গেছেন। শেষের দিকে মাঝে মধ্যে সরকারের ‘মৃদু’ সমালোচনা করেছেন বটে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা তিনি কখনো করেননি। শেষ বেলায় এসে মন্ত্রী না হয়ে তিনি তার সংসদীয় আসনটি নিশ্চিত করতে চান। তিনি ভালো করে জানেন সরকারের দিনকাল খুব ভালো যাচ্ছে না। নানা সংকটের মাঝে আছে সরকর। জনপ্রিয়তা যে ভাটির দিকে, একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি তা ভালো বোঝেন। তাই ‘বেলা শেষে’র মন্ত্রী তিনি হলেন না। বরং একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ইতিহাসে নিজের নাম লেখাতে চান। অতীতে সংস্কারবাদীদের তালিকায় তার নাম যুক্ত হয়েছিল। তার সেই অবস্থান থেকে তিনি সরে গেলেও মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হননি। মন্ত্রী তো তিনি অনেক আগেই হয়েছিলেন। ‘শেষ বেলা’র মন্ত্রী তাকে নতুন কোনো মর্যাদায় নিয়ে যাবে না।  মেনন মন্ত্রী হননিÑএটা দলীয় সিদ্ধান্ত। সম্ভবত মেনন সাহেবের কাছে যা বিবেচ্য হয়েছে বেশি, তা হচ্ছে সরকারের সকল অপকর্মের দায়ভার গ্রহণ না করা। দ্বিতীয় আরেকটি চিন্তা তার ভেতরে কাজ করে থাকতে পারে। আর তা হচ্ছে আগামীতে মহাজোট থেকে বেবিয়ে গিয়ে বামপন্থিদের সমন্বয়ে তৃতীয় একটি ‘ধারার’ সূচনা করা। তবে তাতে তিনি সফল হবেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। হাসানুল হক ইনুর মন্ত্রিসভায় যোগদানে অবাক হইনি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তারাই প্রথম বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। জাসদের গণভিত্তি কতটুকু তার পরিসংখ্যান শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, আমাদের কাছেও আছে। ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন না করলে (নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন), তিনি তার জামানত ফিরে পেতেন কিনা, আমি নিশ্চিত নই। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘সাবেক মন্ত্রী’ এ পরিচয়টা তিনি দিতে পারবেন বটে, কিন্তু আগামী ১৩ মাসের যে রাজনীতি, তাতে আদৌ গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবেন কি? তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে এখন মহাজোট সরকারে আ’লীগের বাইরে তিনটি দলের প্রতিনিধিত্ব ঘটল। জাতীয় পার্টি, সাম্যবাদী দল ও জাসদ। জিএম কাদের ও হাসানুল হক ইনু নির্বাচিত সংসদ সদস্য হলেও, দিলীপ বড়–য়া সংসদ সদস্য নন। তার নিজের সংসদীয় নির্বাচনের রেকর্ড খুবই খারাপ। অতীতে কখনো ৫০০ ভোটের ওপরে তিনি পাননি। মহাজোটে জাতীয় পার্টির অন্তর্ভুক্তিতে স্ট্র্যাটেজিক্যালি শেখ হাসিনা ও তার সরকার নিঃসন্দেহে উপকৃত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বেশ ক’জন সংসদ সদস্য রয়েছেন যারা লাঙ্গল মার্কা নিয়েই বিজয়ী হয়েছেন, ‘নৌকা’ প্রতীক নিতে হয়নি। তবে এই জাতীয় পার্টিকে কী শেখ হাসিনা মহাজোটে পাবেন আগামী দিনে? এরশাদ সাহেব তো এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও নিন্দুকেরা তার এই ঘোষণায় ‘অন্য কিছু’র গন্ধ খুঁজে পান।
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করলেন। কারো কারোর দফতরও বদল করেছেন। এটা তার অধিকার। তিনি যখন ইচ্ছা মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করতে পারেন। কিন্তু এই মুহূর্তে এটা করে কতটুকু লাভবান হবেন তিনি? মন্ত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে করে বাড়ল রাষ্ট্রের খরচ। সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে এখনো যখন স্থিরতা আসছে না, ইউরোপের অনেক দেশে যখন এখনো কৃচ্ছ সাধন চলছে তখন আমাদের মতো দেশে এত বড় একটি মন্ত্রিসভা রাখার আদৌ প্রয়োজন নেই। অনেক মন্ত্রীর অদক্ষতা ও দুর্নীতি দেশে ও দেশের বাইরে নানা প্রশ্নের জš§ দিয়েছে। সেখানে এই মুহূর্তে মন্ত্রিসভার কলেবর বৃদ্ধি করার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি? সরকার নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। সর্বশেষ হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে পুরো অর্থনীতি এখন ঝুঁকির মুখে। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে শুধু সোনালী ব্যাংকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এতে আরো ২৯টি ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হলমার্কের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার বাইরেও ডেসটিনির ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার অর্থ পাচার, যুবক এর ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা আÍসাৎ, ইউনিপেটুইউ’র সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট, কিংবা আইটিসিএলের ১০০ কোটি টাকা আÍসাতের ঘটনার সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী মহল জড়িত। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া ও ইব্রাহিম খালেদ কমিশন তদন্ত রিপোর্টে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিচার হয়নি। কাকতালীয়ভাবে কি না জানি না, রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস গভীর রাতে ৭০ লাখ টাকাসহ বিজিবির হাতে ধরা পড়ার পর মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সুরঞ্জিত সেন ফিরে এসেছিলেন দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সারা জাতি যখন ওই একটি বিষয়ের দিকে তাদের দৃষ্টি নিবন্ধ রাখছেন এবং সমমনা দলগুলো যখন আওয়ামী বলয়ের বাইরে একটি ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে, ঠিক তখনই মন্ত্রিসভায় ৭ জন মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত হলেন। কিন্তু তাতে করে কি মানুষ হলমার্ক কেলেঙ্কারি ভুলে যাবে? নানা ফ্রন্টে সরকারের পারফরমেন্স খুব আশাপ্রদ নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ফিরে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। ড. ইউনূস ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রেন্টাল আর কুইক রেন্টাল এখন সরকারের গলার কাঁটা। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এখন ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা চলছে।
সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে এই ‘বিদ্যুৎ সেবা’ নিতে হচ্ছে। ২০০৬ সালের আগে যেখানে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়নি, সেখানে গত অর্থবছরে দিতে হয়েছিল ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। আর গত তিন মাসে এ খাতে তেলের ভর্তুকির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা (আমার দেশ, ১২ সেপ্টেম্বর)। কিন্তু তার পরও লোডশেডিং এখন খোদ ঢাকা শহরে ২ ঘণ্টার ওপরে প্রতিদিন। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমবাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেখান থেকে প্রায়ই কর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক বছরে ব্যবসা সক্ষমতা সূচকে ১০ ধাপ অবনমনের ফলে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে ঠেকেছে। ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮তম, অথচ এক বছর আগেও ছিল ১০৮তম। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৮০ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১ ভাগ। এ বিষয়গুলো সরকার প্রধানের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল। কেননা সরকারকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। জনগণের কাছে ভোট চাইতে হবে। তাদের দক্ষতা দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে নজর না দিয়ে শুধু মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়িয়ে আর যাই হোক জনগণের আস্থা অর্জন করা যাবে না।
Daily Manobkontho
18.09.12

এ বৃত্ত আমরা ভাঙবো কীভাবে

সরকার আবার নতুন করে ৭ জন মন্ত্রী নিলেন। ৬ জন আওয়ামী লীগের, একজন জাসদের। হাসানুল হক ইনুর অনেক দিনের শখ মন্ত্রী হওয়ার। হলেন। কিন্তু হননি তোফায়েল, মেনন। তারা এর যুক্তি দেখিয়েছেন। সেই যুক্তি মানুষ কতটুকু গ্রহণ করেছে, কিংবা আদৌ গ্রহণ করেছে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু দেশ যখন নানা সঙ্কটে, হলমার্ক কেলেঙ্কারি যখন অর্থ ব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, এখন সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে নূ্যনতম ইস্যুতে একটা বিরোধ আরো বাড়ছে। ইস্যু এখন একটিই নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। বিরোধী দল বলছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংবিধান সংশোধন করে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। সরকার প্রধান অবশ্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেয়ার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত মানুষ- কোন দিকে যাচ্ছে দেশ? আবারো কী মানুষ এক-এগারোর মতো অবস্থা প্রত্যক্ষ করবে? নির্বাচনের এখনো অনেক দিন বাকি। কিন্তু তারপরও এই নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। দেশের সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ, এমনকি হিলারি ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্বও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করেছেন। এটা ঠিক সমঝোতা যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং আওয়ামী লীগ যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, সেই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। এ দেশে ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু একটি বড় দল (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ) অংশগ্রহণ না করায়, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। অন্যদিকে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দুটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করায় শুধু দেশেই নয়, বরং বিদেশেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এমন ২০১৩ সালে যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে একটি বড় দল বিএনপি যদি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সঙ্গতকারণেই ওই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি অবিসংবাদিত শক্তি। একটি দলকে বাদ দিয়ে অন্য দলটি এককভাবে যেমনি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি, ঠিক তেমনি এই দু'দলের একটিকে বাদ দেয়ার কিংবা মাইনাস করার কোনো ষড়যন্ত্রও সফল হয়নি। এই দল দুটোর মাঝে প্রচ- বিরোধ আছে। এই বিরোধ এখন ব্যক্তি পর্যায়ে চলে গেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই দল দুটোর কারণেই গণতন্ত্র এ দেশে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। আমরা যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, এ দেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাঝে ১৯৮৬ (তৃতীয়) ১৯৮৮ (চতুর্থ) ও ১৯৯৬ (ষষ্ঠ) সালে অনুষ্ঠিত হওয়া সংসদ নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। বাকি ৬টি সংসদ নির্বাচন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শতকরা ৭৩.২০ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। এই সময় সংসদে কোনো বিরোধী দল ছিল না। ওই সময়ও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে (রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের আওতায়) সদ্য গঠিত বিএনপি ২০৭টি আসন পায়। শতকরা হিসেবে প্রাপ্ত ভোটের হার ৪১.১৭ ভাগ। আওয়ামী লীগ মিজান ও মালেক গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচন করে। যৌথভাবে তারা পায় ৪১টি আসন (মালেক ৩৯), শতকরা হিসাবে যা ছিল ২৭.৩৪ ভাগ। এর বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় মুসলিম লীগ ও আইডিএর ঐক্য (২০ আসন, ১০.০৭ ভাগ ভোট)। গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪১ আসন (৩০.৮১ ভাগ ভোট)। ও আওয়ামী লীগ ৮৮ (৩০.০৮ ভাগ ভোট) আসন পেয়েছিল। জামায়াত ১৮ ও জাতীয় পার্টি ৩৫ আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দৃশ্যপট বদলে যায়। প্রথমবারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (১৪৬ আসন, ৩৭.৪৪ ভাগ ভোট) বিজয়ী হয়। বিএনপির আসন দাঁড়ায় ১১৬ (৩৩.৬১)। জাতীয় পার্টি ৩২ (১৬.৩৯ ভাগ ভোট) আসন নিয়ে তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০১) দৃশ্যপট আবার বদলে যায়। বিএনপি ১৯৩ আসন (৪০.৯৭ ভাগ ভোট) পেলেও, চারদলীয় জোট পায় শতকরা ৪৭ ভাগ ভোট, আর আসন পায় ২১৬। আওয়ামী লীগের আসন কমে এসে দাঁড়ায় ৬২ (৪০.১৩ ভাগ ভোট)। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (২০০৮) প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ২০০৭ সালের এক-এগারোর ঘটনা পুরো রাজনৈতিক সিস্টেমকে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের ভূমিকা এই ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন দেখা দেয়। এমনি এক পরিস্থিতিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় (২৩১), ৪৮.০৬ ভাগ ভোট)। বিএনপির আসন কমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৩০টিতে (শতকরা ৩২.৪৫ ভাগ ভোট)। জাতীয় পার্টি (২৬, ৭.০৫ ভাগ ভোট) তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখে। সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল আমাদের দেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতি বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে এবং এ দেশের রাজনীতি দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই দল দুটোর যে কোনো একটিকে বাদ দিয়ে এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করা অসম্ভব। রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় দল দুটোর মাঝে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার। দুই. বড় দল দুটোর বাইরে তৃতীয় একটি বড় দলের জন্ম হয়নি। তৃতীয় ধারার কথা বারবার বলা হলেও, সাধারণ মানুষ এই তৃতীয় ধারার প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় পার্টি তৃতীয় শক্তি নয়। বরং একটি আঞ্চলিক দল। এবং আওয়ামী লীগের সাথে তাদের 'ঐক্য,' তাদের তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার পথে প্রধান অন্তরায়। তিন. এককভাবে নির্বাচন করার ফলশ্রুতিতে, সেই নির্বাচনগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালর নির্বাচন এর বড় প্রমাণ। চার. এ দেশের রাজনীতিতে দুটি ধারা দৃশ্যমান। একদিকে ধর্মকে প্রাধান্য করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি ধারা অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এককালের সমাজতন্ত্রী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কের একটি ধারা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে যে অচলাবস্থা, তার কেন্দ্র মূলত একটি আর তা হচ্ছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন। সংবিধানে ১৫তম সংশোধনী আনার ফলে সংবিধানকে এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানেই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক পরিচালিত নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আওয়ামী লীগও অতীতে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত নির্বাচন সমর্থন করেনি। মাগুরা ও ভোলার উপ-নির্বাচন আমাদের কাছে একেকটা দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রমাণিত হয়েছে, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে প্রভাব খাটায়। তাই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি উঠেছে, তা যুক্তিযুক্ত। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠেছে, যাতে করে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কথাটা না বলে একটি 'নির্দলীয় সরকার' কথাটা বলা যায়। সরকার সংবিধান সংশোধন করে একটি 'নির্দলীয় সরকার' এর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করে তার আন্তরিকতা দেখাতে পারে। তবে সংবিধান সংশোধন না করেও সরকার একটি 'নির্দলীয় সরকার' কাঠামোর আওতায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে। সেখানে 'নির্দলীয় সরকার' এর রূপরেখা থাকবে। মহাজোট সরকারের শরিক যে কেউ (জাসদ অথবা ওয়ার্কার্স পার্টি') সংসদে এ ধরনের একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে, যাতে বিএনপিসহ সব দলের সমর্থন থাকবে। ওই প্রস্তাবটি হচ্ছে উচ্চ আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বাতিল করে যে রায় দিয়েছিলেন, সেটি। আদালত তার রায়ে উল্লেখ করেছিলেন যে আগামী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জাতীয় সংসদে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিএনপির সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। একটি 'ফর্মুলা' উপস্থাপনে আগে বিএনপির যদি সম্মতি না থাকে, তাহলে সেই 'ফর্মুলা' কোনো কাজ দেবে না। এখন একটি 'নির্দলীয় সরকার' কীভাবে গঠিত হবে, সে ব্যাপারে কয়েকটি 'বিকল্প' নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এক. বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগে মহাজোট সরকার পদত্যাগ করবে ও একটি নির্দলীয় সরকার শুধুমাত্র ৩ মাসের জন্য দায়িত্ব নেবে; দুই. একটি 'এলডার্স কাউন্সিল' নির্দলীয় সরকারের দায়িত্ব নেবে, যারা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করবে; তিন. একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির (অথবা একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি) নেতৃত্বে সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের নিয়ে একটি সরকার; চার. স্পিকারের নেতৃত্বে দুটি বড় দলের সমসংখ্যক সদস্যদের (৫ জন করে) নিয়ে একটি সরকার। তবে তাতে স্পিকার অথবা সদস্যরা কেউই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। পাঁচ. যৌথ নেতৃত্বে (একজন বিএনপি, একজন আওয়ামী লীগ মনোনীত) একটি নির্দলীয় সরকার, যাদের কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না; ছয়. রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি সরকার। মোট কথা ওই তিন মাসের জন্য একটি সরকার গঠিত হবে, যাদের কাজ হবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা এবং যারা কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশন তাদের কথা শুনে থাকবে এবং নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ক্ষমতাও তাদের দেয়া হবে। এর বাইরেও বিকল্প থাকতে পারে। আর এ জন্যই দরকার 'সংলাপ'। দেশে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বড় ধরনের কর্মসূচি দেবে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাজনীতিবিদরাই দেশ চালাবেন। এজন্য যেমনি দরকার যোগ্য নেতৃত্ব, ঠিক তেমনি দরকার পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের একটি সংস্কৃতি। এই বিশ্বাস ও আস্থা যদি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আমরা বাংলাদেশকে একুশ শতকে নেতৃত্ব দিতে পারব না। একটি সহনশীল, গ্রহণযোগ্য ও বহুমতের অধিকারী একটি বাংলাদেশকেও আমরা গড়ে তুলতে পারব না। রাজনীতিবিদদের মাঝে শুভ বুদ্ধির উদয় হোক-এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। Daily JAI JAI DIN18.09.12

অর্থমন্ত্রী ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি


আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সনাতন রাজনীতিবিদ নন। সাবেক আমলা। ছিলেন এরশাদের অর্থমন্ত্রী। আর বর্তমান মহাজোট সরকারেরও অর্থমন্ত্রী। দুর্ভাগ্য একটাই- মহাজোট সরকারের যে কজন মন্ত্রী বিতর্কিত হয়েছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। ঝানু রাজনীতিবিদদের মতো কথা পেঁচিয়ে বলতে পারেন না। বয়স একটু বেশি এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মতে, 'তিনি একটু বেশিই কথা বলেন।' আর্থিক সেক্টরকে ঠিক বাগে আনতে পারছেন না তিনি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আবারও বিতর্কিত হলেন হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে। বললেন, 'চার হাজার কোটি টাকা খুব বেশি কিছু নয়।' যে দেশের জনগোষ্ঠীর ৩২ শতাংশ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সেখানে তিনি কী করে বললেন 'চার হাজার কোটি টাকা তেমন কোনো টাকা নয়'! তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির মাসিক আয়ের ভিত্তিতে তিনি কত বছরে এই চার হাজার কোটি টাকা আয় করবেন? অঙ্কটা অনেক বড়। তাই উল্লেখ করলাম না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর আমলে আর্থিক দুর্নীতি এমন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে যে আমরা এ পরিস্থিতিকে 'ক্লেপটোক্রেসি' হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। ক্লেপটোক্রেসির সহজ-সরল বাংলা হচ্ছে চৌর্যবৃত্তি, চুরিনির্ভর একটি সমাজব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থায় একদল লোক রাষ্ট্রীয় সম্পদের চুরি আর লুটপাট করে অগাধ সম্পদের মালিক হয়। একসময় সমাজবিজ্ঞানীরা আফ্রিকার সমাজব্যবস্থার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই ক্লেপটোক্রেসি শব্দটা ব্যবহার করতেন। যাঁরা আফ্রিকার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন, তাঁরা জানেন আফ্রিকার অনেক দেশে (যেমন নাইজেরিয়া) রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল বিগত ষাট তথা সত্তরের দশকে। আজকে বাংলাদেশে হলমার্কের ঘটনার পর আমার আফ্রিকার সেসব দিনের কথা মনে হয়ে গেল। বাংলাদেশ কী শেষ পর্যন্ত একটি চোরদের রাজ্যে (!) পরিণত হতে যাচ্ছে। যারা শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার টাকা 'চুরি' করল, তাদের বিচার হলো না। হলমার্কের বড় 'চুরির' কথা প্রথম জানা যায় ২০১০ সালে। বিচার তো হয়ইনি, টাকাও ফেরত আসেনি। আজ মাহবুব-উল-আলম হানিফ যখন হলমার্ক ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবি করেন, তখন আমি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হতে পারছি না অভিযুক্তদের আদৌ গ্রেপ্তার করা হবে! হলমার্কের কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে যেসব প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, তার জবাব জানা আমাদের জন্য জরুরি। প্রশ্ন এক. সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সর্বোচ্চ ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা ২০০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে হলমার্কের মতো অখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান কী করে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ পেল? এত বিপুল পরিমাণ ঋণ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় ব্যবস্থাপকের সে ক্ষমতা নেই। তাহলে কে তাঁকে প্ররোচিত করেছে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ বরাদ্দের জন্য? কে এই 'শক্তি'? এটা জানা আমাদের জন্য জরুরি। প্রশ্ন দুই. হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে যেখানে পুরো জাতি আজ আতঙ্কিত, এ ঘটনার রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা দেখলাম সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত- তাঁরা পূর্ণ সময় কাটাবেন। এর কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? কেন তাঁদের পূর্ণ মেয়াদে রাখা হচ্ছে! কাদের স্বার্থে রাখা হচ্ছে? তাঁরা যদি পর্ষদে থাকেন, তাহলে কি তাঁরা তদন্তে প্রভাব বিস্তার করবেন না? প্রশ্ন তিন, সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে যাঁদের রাখা হয়েছে, তাঁরা সবাই রাজনৈতিকভাবে একটি দলের অনুগত। একজন সাংবাদিক কিংবা একজন রাজনৈতিক কর্মীও পর্ষদে রয়েছেন। যাঁদের ব্যাংকিং সম্পর্কে আদৌ কোনো ধারণা নেই। তাঁদের রাখা হলো কাদের স্বার্থে? প্রশ্ন চার. অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই হলমার্ক গ্রুপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এতে করে কি এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে না? বাম মোর্চা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছে। শেখ সেলিম ও তোফায়েল আহমেদের মতো প্রভাবশালী নেতারা অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। এর পরও অর্থমন্ত্রী থাকেন কী করে? প্রশ্ন পাঁচ. অর্থমন্ত্রী আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে হলমার্ককে দেওয়া ঋণের অর্ধেক পরিশোধের জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এবং পনেরো দিনের মধ্যে অর্ধেক টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। কিন্তু একটি জনপ্রিয় দৈনিক আমাদের জানাচ্ছে যে 'টাকা ফেরত দিতে চাইছে না হলমার্ক' (কালের কণ্ঠ, ৭ সেপ্টেম্বর)। সংবাদপত্রটি আমাদের জানাচ্ছে যে হলমার্কের কেনা বিভিন্ন জমিতে তাদের যে সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল, তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এমন খবরও সংবাদপত্রটি আমাদের দিচ্ছে যে হলমার্ক গ্রুপের এমডি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি এক হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা দিতে ব্যর্থ হয় হলমার্ক, তখন কী হবে? প্রশ্ন ছয়. সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী আরো ২৬টি ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে হলমার্ক। এর অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোও হলমার্কের প্রতারণার শিকার হয়েছে। হলমার্কের এই লুটপাট পুরো অর্থব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিল। মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এর জন্য আমরা কাদের দায়ী করব? প্রশ্ন সাত. একটি অনলাইন বার্তা সংস্থা আমাদের জানাচ্ছে যে হলমার্ক ঋণ পেতে ৫০ কোটি টাকার আধুনিক গাড়ি ক্রয় করেছিল। সোনালী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপঢৌকন দেওয়ার জন্য এই গাড়িগুলো ক্রয় করেছিল। ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা ওই গাড়িগুলো ব্যবহারও করেছেন। এখন ওই গাড়িগুলোর কী হবে? প্রশ্ন আট. দুদক বলছে, তারা হলমার্কের এমডি ও তাঁর স্ত্রীকে তলব করবে। শুধু হলমার্কের এমডি কেন? যাঁরা সুবিধাভোগী তাঁদের কেন দুদকে ডাকা হবে না? সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও ডাকা উচিত। প্রশ্ন নয়, প্রথমে শেয়ারবাজার, তারপর পদ্মা সেতু, এখন হলমার্ক- প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এবং একটি ক্ষেত্রেও অভিযুক্তদের বিচার হয়নি। সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী চক্র শুধু শেয়ারবাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। ইব্রাহিম খালেদ রিপোর্টে এই ঘটনায় যারা জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করা হলেও কারোরই বিচার হয়নি। ক্ষতি হয়েছিল ৪০ লাখ খুদে বিনিয়োগকারীর। কোনো রকম টেন্ডার ছাড়া কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ডেসটিনি নামের একটি এমএলএম কম্পানি অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে পাচার করেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের লোকজন এই ডেসটিনি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে অপর একটি এমএলএম কম্পানি যুবক তিন হাজার কোটি টাকা, ইউনিপেটুইউ তিন হাজার কোটি টাকা, এইমওয়ে করপোরেশন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। কোনো একটি ক্ষেত্রেও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হয়নি। হলমার্ক কেলেঙ্কারি দেখিয়ে দিল আমাদের অর্থব্যবস্থায় মারাত্মক সব ত্রুটি রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে নিয়মিত ইন্সপেকশন হওয়ার কথা, তা হয়নি। ফলে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও এসব 'অনিয়ম' অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তদারকি থাকা উচিত ছিল, ব্যাংক তা করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তাঁর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নাম উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে বহালতবিয়তে এখনো রয়ে গেছেন গভর্নর সাহেব।
হলমার্কের ঘটনায় শুধু একটি ব্যাংকের কথা আমরা জানলাম। রাষ্ট্রায়ত্ত বাকি প্রতিটি ব্যাংকেই এ ধরনের বড় ঋণ-জালিয়াতি রয়েছে বলে আমার ধারণা। খুব দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে তদারকি করা উচিত। এতে অনেক 'গোপন তথ্য' বেরিয়ে যেতে পারে। একজন তানভীর মাহমুদ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এখন সেই আস্থায় চিড় ধরল। ডেসটিনির কথা আমরা জেনেছি। এখন জানলাম হলমার্কের কথা। এ রকম শত শত 'তানভীর মাহমুদ' ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে প্রভাবশালীদের কারণে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এদের যদি আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না যায়, তাহলে 'ক্লেপটোক্রেসির' বদনাম অচিরেই আমাদের ঘাড়ে বর্তাবে। উন্নতির যত দৃষ্টান্তই আমরা দিই না কেন, বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি তাতে উজ্জ্বল হবে না। অর্থমন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি। দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে নেই। কিন্তু অর্থব্যবস্থায় দুর্নীতি রোধ করার দায়িত্বটি তো তাঁর। সেই দায়িত্ব তিনি উপেক্ষা করেন কিভাবে?Daily KALERKONTHO17.9.12

ইতিহাস তোফায়েল-মেননকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে


বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই মুহূর্তে আলোচিত বিষয় একটি আর তা হচ্ছে- আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেননের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস এদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে আগামী দিনগুলোতে? আমরা যারা রাজনীতির শিক্ষক ও রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে লেখালেখি করি, সঙ্গত কারণেই তাদের কাছে বিষয়টি আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। একজন ‘যদু-মধু’ মন্ত্রী হলেন কি হলেন না, তাতে একজন সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি তোফায়েল আহমেদ কিংবা রাশেদ খান মেনন হন তাহলে তার একটা প্রভাব রাজনীতিতে থেকে যায় বৈকি! দু’জনই তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। এক্ষেত্রে আমার কাছে রাশেদ খান মেননকে যতটুকু স্পষ্ট মনে হয়েছে, তোফায়েল আহমেদকে ততটুকু স্পষ্ট মনে হয়নি। দু’জনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবিসংবাদিত দুই পুরুষ। বিশ্ব জুড়েই বাম রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও মেনন এখনও সেই রাজনীতি ধরে রেখেছেন। একসময়ের বাম আদর্শের অনেক লোক এখন আদর্শ ত্যাগ করে সুবিধাবাদী রাজনীতিতে নিজেদের জড়িত করেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, যারা একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনীতির বিরোধিতা করতেন, তারা এখন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সৈনিক। মন্ত্রী হয়েছেন। ধনী লোকের তালিকায় নিজেদের নামও লিখিয়েছেন। কিন্তু তারা তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন-এই ইতিহাস নেই। রাশেদ খান মেনন এই ধারায় নিজেকে সম্পর্কিত করেননি বটে, তবে এটাও সত্য, মহাজোট সরকারে তিনি যখন যোগ দিলেন, তখন অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তার নিজের এলাকা বাদ দিয়ে ঢাকার একটি আসনে ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচন করবেন-এটাও অনেকে প্রত্যাশা করেননি তার কাছ থেকে। মহাজোটে যোগ দিয়ে গত সাড়ে তিন বছরে তিনি কতটুকু অর্জন করতে পেরেছেন, এর হিসাব-নিকাশ তিনি নিশ্চয়ই করেছেন। সংবিধানের অসঙ্গতি নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে যেসব মন্তব্য করেছেন, তা ছিল স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্ত। একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ যখন সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেন, মানুষের আস্থাটা ফিরে আসে।
তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন ডাকসুর ভিপি ছিলেন, গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এ দেশের মানুষ তা ভুলে যাননি। তোফায়েল আহমেদ আগেও মন্ত্রী ছিলেন। অনেক আগেই তার মহাজোট সরকারের মন্ত্রী হওয়ার কথা। সরকারপ্রধানের সঙ্গে তার একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার ভূমিকার কারণে। তিনি তথাকথিত সংস্কারের নামে নতুন একটি ‘ধারায়’ আওয়ামী লীগকে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন, তাতে দোষের কিছু ছিল না। একুশ শতকে আওয়ামী লীগকে নতুন ধারায় আসতে হবে, এটা বোধ করি সরকারপ্রধানও উপলব্ধি করেন। তাকে উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো হয়েছিল, তাতেও আমি দোষ দেখি না। কিন্তু প্রয়োজন ছিল তাকে কাজে লাগানোর। সরকারপ্রধান এখানেই ব্যর্থ। তাকে কাজে লাগাননি।
তোফায়েল-মেননের মন্ত্রী না-হওয়া রাজনীতিতে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে না-এই মতের যারা অনুসারী, আমি তাদের সঙ্গে বিনীতভাবে দ্বিমত পোষণ করছি। সম্ভবত সরকারপ্রধানের উপদেষ্টারা তাকে সঠিক উপদেশটি দিতে পারেননি। তারা অবশ্যই মন্ত্রিসভায় যোগ দিতেন, যদি সরকারপ্রধান নিজে উদ্যোগ নিতেন। ‘মানসিক চাপে তিনি এই মুহূর্তে মন্ত্রিসভায় যেতে চান না’-এটা যে তোফায়েল আহমেদের মনের কথা নয়, তা বোধ করি এ দেশের অনেক মানুষই বোঝেন। অভিমান তার আছে। এবং এটা যৌক্তিক। নানা সঙ্কটে দেশ আজ আক্রান্ত। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আমরা দেখতে পেলাম দেশের অর্থনীতি আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালীরা আজ জড়িত থাকার কারণেই ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা কেউই গ্রেফতার হননি। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ৪ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে ডেসটিনির ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার অর্থ পাচার, যুবকের ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাত্, ইউনিপেটুইউর সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট, কিংবা আইটিসিএলের ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী মহল জড়িত এমন অভিযোগ অনেকের। পদ্মা সেতুতে কথিত দুর্নীতি ও অভিযুক্ত মন্ত্রীর অনেক পরে পদত্যাগ, কিংবা অর্থ উপদেষ্টার এখনও ক্ষমতায় থাকা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অনেক ক্ষতি করেছে। অধ্যাপক ড. ইউনূসকে নিয়ে সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বিদেশে বাংলাদেশের মান-সম্মান উজ্জ্বল করেনি। এক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টির চেয়ে ব্যক্তি ইউনূস প্রাধান্য পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। সরকারের ব্যর্থতা, সরকার বিদেশিদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেনি। রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, তা-ও সরকার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখন সরকারের শেষ সময়। এসব সঙ্কট মোকাবেলা করা, কিংবা বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে একটি নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সরকারের যে ক’জন দক্ষ, অভিজ্ঞ, গ্রহণযোগ্য মন্ত্রী থাকা দরকার, তা সরকারে নেই। সরকারপ্রধান যে সাতজনকে মন্ত্রী বানালেন, তারা রাজনীতিতে কতটুকু গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে এটা দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হলে সরকারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতো। বিরোধী দলের সঙ্গে দর-কষাকষিতে এরা দু’জন যে ভূমিকা রাখতে পারতেন, বর্তমান সরকারে সেরকম লোকের অভাব রয়েছে। যে সাতজন মন্ত্রী হলেন, তারা সবাই দুর্নীতির ঊর্ধ্বে, তা বলা যাবে না। তাদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে সঙ্কট উত্তরণে ‘রাজনৈতিক ম্যাচিউরিটি’র প্রমাণ দেওয়া। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদে ও উপদেষ্টামণ্ডলীতে সেরকম লোক নেই! যারা আছেন তারা অনর্থক বেশি কথা বলেন। সরকারপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য দেন ও টকশো মাতিয়ে রাখেন, তাতে তারা সঙ্কটকেই আরও গভীরতর করে তোলেন মাত্র। ‘কালো বিড়াল’ খ্যাত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সরকারের সম্পদ নন-বরং এক আপদ। পদত্যাগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় পতাকাবাহী গাড়ি হাঁকানো সাধারণ মানুষ পছন্দ করেননি। এই তথ্যটুকু সরকারপ্রধান কতটুকু জানেন, কিংবা তার উপদেষ্টারা তাকে সঠিক উপদেশটি দিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। বিদেশমন্ত্রী বিদেশে যেতে, ক্যামেরা নিয়ে প্রটোকল ভেঙে ছবি তুলতে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের ‘অটোগ্রাফ’ নিয়ে বালখিল্যতার পরিচয় দিতে পারলেও, বৈদেশিক নীতিতে আদৌ সাফল্য পেয়েছেন বলে বলতে পারছি না। তার ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে দু’জন উপদেষ্টার ‘দৌড়ঝাঁপ’ আমরা লক্ষ করলেও ইমেজ সঙ্কটের মুখে যে বাংলাদেশ, তা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। বিনিয়োগ বাড়েনি (বরং কমেছে। ব্যবসা সক্ষমতা রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ১০ ধাপ নিচে নেমে গেছে। শ্রমবাজার ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু বিদেশমন্ত্রীর ‘ভ্রমণপ্রীতি’ বেড়েছে (এখনও তিনি বিদেশে)। আর তার পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশকে একটি ‘সফ্ট পাওয়ার’ (ঝড়ভঃ চড়বিত্) হিসেবে তুলে ধরার চেয়ে (হিলারি ক্লিনটনের মতে) দেশে ‘রবীন্দ্রপ্রেম’ নিয়ে বেশি ব্যস্ত। সরকারের এই যে পরিস্থিতি, এখন প্রয়োজন যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন নেতৃত্বের। হাসানুল হক ইনু মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে ক্যাবিনেটের এই যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। কেননা তার ব্যক্তিগত সততা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসা ঘেরাও করার রাজনীতির মধ্য দিয়ে জাসদ ‘হঠকারী’ রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল। ইনু সাহেব সেই রাজনীতিরই ‘প্রডাক্ট’। আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতা করে যার জন্ম, তিনি এখন সেই আওয়ামী লীগেরই মন্ত্রী। ইতিহাস কী নির্মম! যিনি বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিলেন, তিনিও মন্ত্রী। কিন্তু যিনি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হয়ে যিনি তরুণ বয়সে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন, পরিণত বয়সে তিনি হয়ে গেলেন ‘অযোগ্য’। প্রধানমন্ত্রী একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারতেন। অদক্ষ, অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ ‘কালো বিড়াল’দের বাদ দিয়ে তরুণ, যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসতে পারতেন। সেই সুযোগ তার ছিল। সংবিধান তাকে অগাধ ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি পারলেন না বা করলেন না। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হল না।
দেশ একটি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠেছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য নির্দলীয় সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা শক্তিশালী হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক উপদেশ দেওয়ার লোকের খুব অভাব। একটি ব্যাপক ঐকমত্যের তাগিদে মহাজোটের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একজন দিলীপ বড়ুয়া (যিনি কোনো নির্বাচনে ৫০০ ভোটও পাননি কোনো দিন), কিংবা একজন হাসানুল হক ইনুকে (যিনি মশাল মার্কা নিয়ে জামানত হারিয়েছেন বার বার) নিয়ে যে সরকার, সেই সরকার সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। প্রয়োজন ছিল তোফায়েল কিংবা মেননের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের— যারা তাদের দক্ষতা ও ম্যাচিউরিটি দিয়ে সরকারপ্রধানকে সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারতেন। এখন যা হল, তাতে সরকারের কোনো লাভ হল না। মন্ত্রী বাড়ল। সরকারের খরচ বাড়ল। নানাবিধ সঙ্কটের জালে আবদ্ধ সরকার, সেই জাল কেটে বের হয়ে আসতে পারবে বলে মনে হয় না। সরকারপ্রধানের হাতে একটি সুযোগ ছিল, সেই সুযোগটি তিনি কাজে লাগাতে পারলেন না।

‘প্লুটোক্রেসি’ : বাংলাদেশ স্টাইল

গত ষাট ও সত্তরের দশকে আফ্রিকার রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘প্লুটোক্রেসি’ ও ‘প্লুটোনমি’ কথাটা ব্যবহার করতেন। আক্ষরিক অর্থে ‘প্লুটোক্রেসি’ হচ্ছে ধনিকতন্ত্র। ভিন্ন ধারার বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি ইদানীং ব্যবহার করছেন ‘প্লুটোনমি’ শব্দটি। অর্থাৎ ধনিক শ্রেণী নির্ভর যে অর্থনীতি সেটাই প্লুটোনমি। ষাট ও সত্তর দশকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করেছেন, তারা রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহার করে নিজেরা প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন। তারা নিজেরা একটা ধনিক শ্রেণীও তৈরি করেছিলেন। আফ্রিকার সম্পদ এখন আলোচনায় আসে কম। এখন আলোচনায় আসে মধ্য এশিয়া। কেননা সেখানে রয়েছে প্রচুর গ্যাস ও তেল আর সে কারণে বৃহৎ শক্তিগুলোরও আগ্রহ বেশি ওই দেশগুলো সম্পর্কে। মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদ সেখানে একটি  ধনিক শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে একটি প্রতিবেদন- Corruptistan : The Baron, Divas & Ruling Families on central Asia। প্রতিবেদনে মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্র নায়কদের পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে যখন বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তখন ওই ‘প্লুটোক্রেসি’ আর corruptistan এর কথা মনে হয়ে গেল। বাংলাদেশ কি তাহলে সেদিকেই যাচ্ছে? ইতোমধ্যে হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে প্রচুর সংবাদ ছাপা হচ্ছে। একটা আশার কথা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতারা এই হলমার্ক কেলেঙ্কারিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেননি। তারা প্রকাশ্যেই সংসদে এই ঘটনার সমালোচনা করেছেন। এ থেকে সরকার কী শিক্ষা গ্রহণ করবে, আমরা জানি না। কিন্তু সরকার যদি এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেয়, তাহলে তা সরকারের জন্য ভালো খবর নয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ হলমার্ক ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। আমি মনে করি এটা একটা পজেটিভ দিক। কিন্তু যে প্রশ্ন আমাকে বড় বেশি ভাবিত করে, তা হচ্ছে আদৌ কি জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে? হলমার্ক কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে যেসব প্রশ্নের জন্ম হয়েছে তার জবাব জানা আমাদের জন্য জরুরি। প্রশ্ন এক. সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সর্বোচ্চ ঋণ দেয়ার ক্ষমতা দু’শ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে হলমার্কের মতো অখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান কী করে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ পেল? এত বিপুল ঋণ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় ব্যবস্থাপকের সেই ক্ষমতা নেই। তাহলে কে তাকে প্ররোচিত করেছে এত বিপুল ঋণ বরাদ্দের জন্য? কে এই শক্তি? এটা জানা আমাদের জরুরি। প্রশ্ন দুই. হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে যেখানে পুরো জাতি আজ আতঙ্কিত, এই ঘটনার রেশ ফুরিয়ে যাবার আগেই আমরা দেখলাম সোনালী ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যদের ব্যাপারে একটি সরকারি সিদ্ধান্ত তারা পূর্ণ সময় কাটাবেন। এর কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? কেন তাদের পূর্ণ মেয়াদে রাখা হচ্ছে? কাদের স্বার্থে রাখা হচ্ছে? তারা যদি পর্ষদে থাকেন, তাহলে কি তারা তদন্তে প্রভাব বিস্তার করবেন না? প্রশ্ন তিন. সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে যাদের রাখা হয়েছে, তারা সবাই রাজনৈতিকভাবে একটি দলের অনুগত। একজন সাংবাদিক কিংবা একজন রাজনৈতিক কর্মীও পর্ষদে রয়েছেন। যাদের ব্যাংকিং সম্পর্কে আদৌ ধারণা নেই, তাদেরকে রাখা হলো কাদের স্বার্থে? প্রশ্ন চার. অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই হলমার্ক গ্রুপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এতে করে কি এই কেলেঙ্কারির সাথে অর্থমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে না? বাম মোর্চা তার পদত্যাগ দাবি করেছে। শেখ সেলিম ও তোফায়েল আহমদের মতো প্রভাবশালী নেতারা অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। এর পরও অর্থমন্ত্রী থাকেন কী করে? প্রশ্ন পাঁচ. অর্থমন্ত্রী আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, হলমার্ককে দেয়া ঋণের অর্ধেক পরিশোধের জন্য তাদের চিঠি দেয়া হয়েছে এবং পনের দিনের মধ্যে অর্ধেক টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। কিন্তু একটি জনপ্রিয় দৈনিক আমাদের জানাচ্ছে যে, টাকা ফেরত দিতে চাইছে না হলমার্ক (কালের কণ্ঠ, ৭ সেপ্টেম্বর)। সংবাদপত্রটি আমাদের জানাচ্ছে যে, হলমার্কের কেনা বিভিন্ন জমিতে তাদের যে সাইনবোর্ড টানানো ছিল, তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এমন খবরও সংবাদপত্রটি আমাদের দিচ্ছে যে, হলমার্ক গ্রুপের এমডি প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি এক হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা দিতে ব্যর্থ হয় হলমার্ক, তখন কী হবে? প্রশ্ন ছয়. সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী আরো ২৬টি ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে হলমার্ক। এর অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোও হলমার্কের প্রতারণার শিকার হয়েছে। হলমার্কের এই লুটপাট পুরো অর্থব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিলো। মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে ব্যাংক ব্যবস্থা। এর জন্য আমরা কাদের দায়ী করবো?
প্রশ্ন সাত. একটি অনলাইন বার্তা সংস্থা আমাদের জানাচ্ছে যে, হলমার্ক ঋণ পেতে ৫০ কোটি টাকার আধুনিক গাড়ি ক্রয় করেছিল। সোনালী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপঢৌকন দেয়ার জন্য এই গাড়িগুলো ক্রয় করেছিল। ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা ওই গাড়িগুলো ব্যবহারও করেছেন। এখন ওই গাড়িগুলোর কী হবে? প্রশ্ন আট. দুদক বলছে তারা হলমার্কের এমডি ও তার স্ত্রীকে তলব করবে। শুধু হলমার্কের এমডি কেন? যারা সুবিধাভোগী তাদের কেন দুদকে ডাকা হবে না? সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও ডাকা উচিত। প্রশ্ন নয়. প্রথমে শেয়ার বাজার, তারপর পদ্মা সেতু, এখন হলমার্কÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে এবং একটি ক্ষেত্রেও অভিযুক্তদের বিচার হয়নি। সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী চক্র শুধু শেয়ারবাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। ইব্রাহিম খালেদ রিপোর্টে এই ঘটনায় যারা জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করা হলেও, কারোরই বিচার হয়নি। ক্ষতি হয়েছিল ৪০ লাখ খুদে বিনিয়োগকারীর। কোনো রকম টেন্ডার ছাড়া কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নামে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ডেসটিনি নামের একটি এমএলএম কোম্পানি অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে পাচার করেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের লোকজন এই ডেসটিনি গ্রুপের সাথে জড়িত। একই সাথে অপর একটি এমএলএম কোম্পানি যুবক ৩ হাজার কোটি টাকা, ইউনেটুইউ ৩ হাজার কোটি টাকা, এইমওয়ে কর্পোরেশন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। কোনো একটি ক্ষেত্রেও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হয়নি।
হলমার্ক কেলেঙ্কারি আমাদের দেখিয়ে দিল আমাদের অর্থব্যবস্থায় মারাত্মক সব ত্রুটি রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে নিয়মিত ইনসপেকশন হবার কথা। তা হয়নি। ফলে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও এসব অনিয়ম অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তদারকি থাকা উচিত ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক তা করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের নাম উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু সরকারের উচ্চমহলের সাথে যোগ সাজসের কারণে বহাল তবিয়তে এখনও রয়ে গেছেন গভর্নর সাহেব।
হলমার্কের ঘটনায় শুধু একটি ব্যাংকের কথা আমরা জানলাম। রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিটি ব্যাংকেই বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি রয়েছে বলে আমার ধারণা। খুব দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে তদারকি করা উচিত। এতে করে অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে যেতে পারে। একজন তানভির মাহমুদ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এখন সেই আস্থায় চিড় ধরলো। একজন তানভির মাহমুদ, যিনি একযুগ আগেও ছিলেন সাধারণ একজন মানুষ এবং যার পারিবারিক ব্যবসার কোনো ঐতিহ্যও নেই, তিনি হঠাৎ করে কিভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে দুদকের জন্য তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার। একসময় আফ্রিকার দেশগুলো যে প্লুটোক্রেসি বিকশিত হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলতেন কেপেটোক্রেসির কথা। অর্থাৎ চৌর্ষবৃত্তি, চুরি করা। আর চুরি করে প্রচুর সম্পদের মালিক হওয়া। ষাট ও সত্তর দশকের আফ্রিকার এক একটি দেশ (যেমন নাইজেরিয়া) ছিল কেপেটোক্রেসির মডেল। আমরা চাই না একজন তানভির মাহমুদের জন্য বিদেশী মিডিয়ায় আমাদেরকে কেপেটোক্রেসির মডেল হিসেবে তুলনা করুক। আমরা তানভির মাহমুদ তথা তার সহযোগীদের বিচার চাই। সেই সাথে চাই দ্রুত টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা।