রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বাংলাদেশের বন্ধু প্রণব মুখার্জি


ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি চলে গেলেন। ৮৪ বছরের জীবনে তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও ভারতের রাষ্ট্রপতির পদসহ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একটি সম্ভাবনাও তার ছিল। কিন্তু ‘হিন্দি বলয়ের রাজনীতির’ কারণে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি।

ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি চিরচেনা রাজনীতির অঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তবে একজন সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে গত কয়েক বছর তিনি তার ভূমিকা পালন করে গেছেন।

গেল বছরের এই আগস্ট মাসেই ভারতের সর্বোচ্চ পদক ভারতরত্নে তাকে সম্মানিত করেছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তিনি কট্টর কংগ্রেসবিরোধী বিজেপি নেতাদের কাছেও সমান গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তার দীর্ঘ কংগ্রেসীয় রাজনীতি বিজেপি নেতাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি কখনও। একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদের সফলতা এখানেই।

একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল তার। ইন্দিরা গান্ধীই তাকে রাজনীতিতে প্রথম ব্রেক দিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথম রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। এই ‘বাঙালি বাবুর’ সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা ও দক্ষতায় আস্থা রেখেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। আর এর প্রতিদান হিসেবেই ১৯৭৩ সালে তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তিনি। সেই থেকেই তার যাত্রা শুরু। পেছনে আর তাকাতে হয়নি। একজন সফল মন্ত্রী এবং সর্বশেষ একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জি বারবার আলোচিত হবেন।

বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে তিনি বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল তার ‘আত্মার’ সম্পর্ক। স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির আদি বাড়ি নড়াইলে। তিনি যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তার পৈর্তৃক ভিটা দেখে যেতে ভোলেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করতেন (১৯৭৫-৮১), তখন প্রণব মুখার্জি আর তার স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রণব মুখার্জি ছিলেন তার প্রিয় ‘কাকা বাবু’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণব মুখার্জির পরিবারের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৫ সালে শুভ্রা মুখার্জি প্রয়াত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি ছুটে গিয়েছিলেন সমবেদনা জানাতে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া ও সাহায্য করার ব্যাপারে প্রণব মুখার্জি ছিলেন সক্রিয়। অনেক বাংলাদেশি রাজনীতিবিদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও সখ্য ছিল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে তিনি বরাবরই ছিলেন বাংলাদেশের পাশে। তিনি চেষ্টা করেছেন তার অবস্থানে থেকে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৩ সালের মার্চে।

সেটা ছিল ১৯৭৪ সালের পর কোনো ভারতীয় রাষ্ট্রপতির প্রথম বাংলাদেশ সফর। দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৮ সালে, ব্যক্তিগত সফরে। তখন তিনি অবসর নিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ তাকে কার্যত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদাই দিয়েছিল। এ সফরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছিল।

একজন শিক্ষক (বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক) এবং পরে একজন রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৫০ বছরের। ১৯৬৯ সালে যে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা, তা শেষ হয় ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অবসরগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

পাঁচবার রাজ্যসভার সদস্য, দু’বার লোকসভার সদস্য ছিলেন তিনি। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান অভিজিৎ কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ও লোকসভার সদস্য। একমাত্র মেয়ে শর্মিষ্ঠা একজন নৃত্যশিল্পী। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেয়া প্রণব মুখার্জি একজন সফল রাজনীতিবিদ, একজন সফল মন্ত্রী, একজন সফল সংগঠক। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- সব জায়গাতেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন এবং থাকবেনও।

Jugantor

1.9.2020

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ কোন পথে

 

 

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে? সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবন একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ২০১৭ সালে যে ‘রোহিঙ্গা ঢল’ এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, গত ২৫ আগস্ট ছিল তার তৃতীয় বার্ষিকী। অর্থাৎ বর্তমান সংকট তিন বছর পার করে চার বছরে ‘পা’ দিল। কিন্তু বিশ্ব এই তিন বছরে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেনি। 

এটা ঠিক, রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৭ সালে যে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সে ব্যাপারে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ বা ‘আইসিজে’ একটি রায় দিয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু ওই রায় সংকট সমাধানে কোনো বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু এ ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি নেই। বরং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গেল জুন মাসেও রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর দিয়েছে আল-জাজিরা। এক প্রতিবেদনে তারা আমাদের জানিয়েছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০০ রোহিঙ্গা বসতি পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে রাখাইন ত্যাগ করতে। আরেকটি খবরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তিনজন সেনা সদস্যকে রাখাইনে ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কোর্ট মার্শাল করে শাস্তি দিয়েছে। 
যদিও এদের নামপরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি যখন আরও অবনতি ঘটেছে, তখন গত ২৯ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন। ওই ফোনালাপে তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রকাশিত এই ঘটনা কতগুলো প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। 

এক. গেল ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা জানানো হয়েছিল (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৮ ডিসেম্বর) কিন্তু নতুন করে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে মিয়ানমার সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তকে আদৌ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। 

দুই. রোহিঙ্গা সংকট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। আর তা হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার বারবার বলে আসছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন। সর্বশেষ আসিয়ান নেতাদের টেলি সম্মেলনেও মিয়ানমারের প্রতিনিধি একই কথা বলেছেন। এর অর্থ সারা বিশ্বের মতামতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। 

তিন. মিয়ানমারের কৌশল হচ্ছে রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্ত করা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের জমি এখন চীন ও জাপানি বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়েছে। রাখাইনে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে (Kyaukphyu), যেখান থেকে দেশটি বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখতে পারে। এখানে চীনের স্বার্থ অনেক বেশি। সুতরাং চীন কখনোই মিয়ানমারের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। রোহিঙ্গামুক্ত রাখাইনে চীন তার স্বার্থকে বড় করে দেখছে। 

চার. গেল ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ বা ‘আইসিজে’ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিল। তাতে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ, কোনো সামরিক ব্যবস্থা না দেওয়া, আলামত নষ্ট না করা, আদালতে চার মাস অন্তর রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আদালতের আদেশ মিয়ানমার মানছে না। তিনজন সেনা সদস্যের বিচার লোক দেখানো। আইসিজের আদেশ মিয়ানমারকে বাধ্য করেনি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে এবং তারা নেবেও না। 

পাঁচ. আসিয়ান শীর্ষ টেলি কনফারেন্সে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী এদের সন্ত্রাসী কর্মকন্ডের জন্য রিক্রুট করবে। এ ধরনের আশঙ্কাকে ফেলে দেওয়া যায় না। এতে করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। 

ছয়. রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর খবরও রিপোর্ট হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ^ব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই সুযোগটি নিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে। 

মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। এ বিষয়টি আমরা বারবার বলে এলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমনকি বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে চীন ও ভারত। চীন ও ভারতের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা এর কোনো ফল পাইনি। 

চীনের পাশাপাশি ভারতেরও বিনিয়োগ রয়েছে মিয়ানমারে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরের সময়ও মিডিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের সাহায্যের প্রশ্নটি উঠেছিল। কিন্তু আশ্বাসসের মধ্যেই তা থেকে গেছে। ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইন স্টেটে যেখানে রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম, সেখানে ভারতের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। ভারতের ‘কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের’ কথা অনেকেই স্মরণ করতে পারেন। এই প্রজেক্টের আওতায় ভারত রাখাইন স্টেটের সিটওয়েতে (Sittw) একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ের (একসময়ের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে এই সমুদ্রবন্দর (সিটওয়ে) ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে পণ্য পরিবহনে (সাত বোন রাজ্যে) এই রুটটি ব্যবহৃত হবে। কালাদান নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত বিধায় এটা ‘কালাদান প্রজেক্ট’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের চিন স্টেটের পালেটওয়া (Paletw) বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়ক পথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুই (Zorinpui) এর সঙ্গে। এই প্রজেক্টটি সম্পন্ন হলে একদিকে মিয়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাত বোন রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। সুতরাং ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। 

ভারতের ‘Act East Policy’র গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মিয়ানমার। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। চলতি বছরই ভারতের অর্থনীতি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে ও ২০২৫ সালের মধ্যে বিশে^র তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ দেশটিকে ১১তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে পরিণত করেছে। ভারতের ৩০টি কোম্পানির সেখানে বিনিয়োগর পরিমাণ ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার (চীনের বিনিয়োগ ২০ বিলিয়ন ডলার)। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও, মিয়ানমারের বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে পশ্চিমা বিশে^র কাছে একটি আকর্ষণীয় দেশে পরিণত করেছে। ভারতও এই প্রতিযোগিতায় আছে। সুতরাং রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যাবে বলে মনে হয় না। কূটনৈতিকভাবে ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে আছে। কিন্তু বড় কোনো ভূমিকা পালন করছে না। 

এ অবস্থায় আগামীতে সব রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। হয়তো কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নেবে। কিন্তু বড় অংশই রয়ে যাবে। আর এ কারণেই বাটিল লিন্টনার  Asia Times-এ লিখেছেন, ‘Rohingya refugees becoming Palestinians of Asia’ ফিলিস্তিনিদের মতো ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা! এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মিয়ানমারের অসহযোগিতা, আন্তর্জাতিক মতামতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ও রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। এ থেকে বের হওয়ার পথ মিয়ানমারকেই বের করতে হবে।

Desh Rupantor

1.9.2020

রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো ভালো সংবাদ নেই


রোহিঙ্গাদের জন্য ভালো কোনো সংবাদ নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজার এলাকায় বসবাস করছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করা হলেও এটা ছিল পরিকল্পনার শেষ অংশ। এর আগেও রোহিঙ্গাদের উৎখাত করা হয়েছিল।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতিক্রিয়া জানালেও মিয়ানমার এ ব্যাপারে কর্ণপাত করেনি। এমনকি চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি মামলা ও একটি অন্তর্বর্তীকালীন রায় এলেও মিয়ানমার কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। নিজ নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করলেও তা ছিল ‘লোক দেখানো’।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের তালিকা সরবরাহ করা হলেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছে না; বরং তথাকথিত ‘যাচাই-বাছাইয়ের’ নামে সময়ক্ষেপণ করছে। ফলে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফেরত যাবে কিংবা আদৌ যাবে কি না, এ ব্যাপারে সৃষ্টি হয়েছে একটা বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। এই যখন পরিস্থিতি, তখন বার্টিল লিন্টনারের একটি তথ্যবহুল লেখা ছাপা হয়েছে এশিয়ান টাইমসে ২৬ আগস্ট। লেখাটির শিরোনাম Rohingya Refugees Becoming Palestinians of Asia. লিন্টনার রোহিঙ্গাদের ‘এশিয়ার প্যালেস্টাইনিয়ান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; অর্থাৎ ফিলিস্তিনিরা যেভাবে নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত হয়ে দীর্ঘ ৭৩ বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যত্র বসবাস করছে, রোহিঙ্গাদের অবস্থা অনেকটা তেমনই। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে, আজ রোহিঙ্গাদের ব্যাপারেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্তে (ডিসেম্বর ২০১৯) মিয়ানমারের ভূমিকায় নিন্দা জানালেও জাতিসংঘ বাধ্য করাতে পারেনি মিয়ানমারকে, নিজ নাগরিকদের ফেরত নিতে। জাতিসংঘ তথা বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যর্থতা এখানেই।

এদিকে মিয়ানমার প্রস্তুত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচনের জন্য। ৮ নভেম্বর সেখানে সাধারণ নির্বাচন। অং সান সু চি ও তার দল ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি’ আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছে এবং সু চি বিজয়ী হবেন, এটাও অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু এ নির্বাচন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো ইতিবাচক ফল দেবে না। কেননা অং সান সু চি সরকারের মূল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর স্বার্থে তিনি কাজ করছেন। তিনি উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের (ধর্মীয় নেতা) পক্ষ অবলম্বন করে ‘রোহিঙ্গাবিরোধী’ একটি অবস্থান নিয়েছেন। সে কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। রোহিঙ্গা তথা মুসলমান বিদ্বেষ কোন পর্যায়ে গেছে, তা আবদুল রশিদের দৃষ্টান্ত দিয়ে আলজাজিরা তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে (২৫ আগস্ট ২০২০)।

আবদুল রশিদের জন্ম মিয়ানমারে, তার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে তার foreign roots বা ‘বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক’ থাকার। যদিও তিনি মিয়ানমারের নাগরিক। আলজাজিরা আমাদের জানাচ্ছে, মুসলমান ধর্মাবলম্বী প্রায় ১২ প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এ ঘটনা এ কথাই প্রমাণ করল যে, মিয়ানমারের সামরিক তথা রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায় না, মুসলমানরা সে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিক। মুসলমানদের সেখানকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাদ দেয়ার বিষয়টির সঙ্গে মিয়ানমারের নাগরিকত্বের বিষয়টি সরাসরিভাবে জড়িত। মিয়ানমারে ১৯৮২ সালে যে আইনটি (1982 Citizenship Law) পাস হয়েছে, এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে আবিষ্কার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান এখানেই নিহিত। এ আইনটি যতদিন পর্যন্ত না সংশোধন করা হবে, ততদিন একজন নাগরিকও মিয়ানমারে ফিরে যাবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে, সে তালিকা নিয়ে তারা যাচাই-বাছাই করছে। সময়ক্ষেপণ করছে। ভারত ও চীনের ভূমিকাও মিয়ানমারের পক্ষে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানুয়ারিতে মিয়ানমার সফর করেছেন। গত ১৯ বছরের মধ্যে কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য এটা ছিল প্রথম মিয়ানমার সফর। একাধিক কারণে ওই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে সারা বিশ্ব যখন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং আইসিজেতে একটি রায়ের জন্য যখন সবাই অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই চীনা প্রেসিডেন্ট মিয়ানমার সফর করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চীনা সমর্থন আবারও ব্যক্ত হয়েছিল এবং বিশ্ব আসরে মিয়ানমারের পাশে যে চীন থাকবে, তার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

ওই সফরে মিয়ানমার ও চীন ৩৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে; যার মধ্য দিয়ে চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। চীন রাখাইনে কিয়াউকপিউ (Kyaukpyu) গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এ ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এ গভীর সমুদ্রবন্দরটি চীনের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চীনা জাহাজের প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ১২১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কিয়াউকপিউ-কুনমিং রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ ব্যাপারেও একটি চুক্তি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইউনান রাজ্যের পণ্য কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে রফতানি করা সহজ হবে। এটা মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরের অংশ। একসময় এ করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত ছিল, যা বিসিআইএম করিডর নামে পরিচিত ছিল (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার)। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে এ অর্থনৈতিক করিডরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

বিসিআইএম করিডরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে সোনাদিয়ার প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরটি। চীন এ বন্দরটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে সেই পরিকল্পনাটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। পাঠক, ভারতের ‘কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের’ কথা স্মরণ করতে পারেন। ভারত রাখাইন স্টেটের সিটওয়েতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ের (এক সময়ের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল।

বঙ্গোপসাগার ঘেঁষে এ সমুদ্রবন্দর (সিটওয়ে) ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে পণ্য পরিবহনে (সাত বোন রাজ্যে) এ রুটটি ব্যবহৃত হবে। কালাদান নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত বিধায় এটা ‘কালাদান প্রজেক্ট’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের চীন স্টেটের পালেটওয়া (Paletwa) বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়কপথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুই (Zorinpui)-এর সঙ্গে। এ প্রজেক্টটি সম্পূর্ণ হলে একদিকে মিয়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাত বোন রাজ্যগুলোয় পণ্য পরিবহন সহজ হবে। সুতরাং ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে।

ভারতের ‘Act East Policy’র গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মিয়ানমার। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। চলতি বছরই ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে ও ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্য বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ দেশটিকে ১১তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে পরিণত করেছে। ভারতের ৩০টি কোম্পানির সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার (চীনের বিনিয়োগ ২০ বিলিয়ন ডলার)। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একটি আকর্ষণীয় দেশে পরিণত করেছে। ভারতও এ প্রতিযোগিতায় আছে। সুতরাং রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যাবে বলে মনে হয় না।

কূটনৈতিকভাবে ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে আছে। কিন্তু তার জাতীয় স্বার্থের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি যেতে পারছে না। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভারত যদি অবস্থান নেয়, তাহলে কালাদান প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মিয়ানমার অন্তরায় সৃষ্টি করবে। এখানে আরও একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- আর তা হচ্ছে, অং সান সু চি স্বয়ং ও মিয়ানমারের রাজনৈতিক কাঠামো, যা রোহিঙ্গাবিরোধী। লক্ষ করলে দেখা যাবে, গত বেশ কিছুদিন ধরে মিয়ানমারে একটি উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বিকাশ লাভ করেছে। এরা কট্টরপন্থী থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ধর্মগুরুদের প্রতি এদের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি। এরা সংস্কারে বিশ্বাসী নয়। এদের প্রচুর অনুসারী রয়েছে মিয়ানমারে। এ থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মিয়ানমারকে বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। অনেক সিরিয়াস পাঠক আশিন উইরাথুর কথা মনে করতে পারেন। তাকে নিয়ে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কভার স্টোরি করেছিল ২০১৩ সালের ১ জুলাই। কভার স্টোরির শিরোনাম ছিল ‘দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর’। তিনি প্রচণ্ড রকম মুসলমানবিদ্বেষী। এজন্য তাকে ‘মিয়ানমারের লাদেন’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তিনি মিয়ানমারে তরুণ বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের সংগঠিত করে মুসলানবিদ্ধেষী একটা সেন্টিমেন্ট গড়ে তুলেছিলেন।

এ সেন্টিমেন্টকে সু চি ধারণ করেন। অত্যন্ত ক্ষমতালিপ্সু সু চি এ মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাবকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সু চির বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে তার বাবা আউং সানের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আউং সান ছিলেন তৎকালীন বার্মার স্বাধীনতাকামী নেতা, ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সার পর্যন্ত তিনি ছিলেন বার্মার প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে আউং সান প্রথমদিকে ছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী। পরবর্তী সময়ে তিনি পরিচিত ছিলেন মডারেট ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেট’ হিসেবে। এ আউং সানের সন্তান হিসেবে সু চি কীভাবে এখন কট্টর বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হলেন, সেটাই অবাক করার বিষয়!

এর পেছনে কাজ করেছে মূলত তার সুবিধাবাদী রাজনীতি। একদিকে তিনি সেনাবাহিনীকে খুশি রাখতে চান, যারা থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মকে ‘প্রমোট’ করছে। সু চি মনে করছেন, সেনাবাহিনীকে হাতে রেখেই তিনি আবার ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু একটি সম্প্রদায়কে নির্বাচনে অংশ দিতে না দেয়া, তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা প্রকারন্তরে গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এটা গণতন্ত্র নয়। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ ইউসুফ (ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়) মন্তব্য করেছেন এভাবে- With election approaching in November 2020 Myanmar's government-sanctioned 'democracy without rights' may bring free election, but as long as ethnic clamming continues against Rohingya Muslims, any are claiming these election will smooth the path for democracy road to democracy is deluded (The Conversation, August 20, 2020); একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন, সে নির্বাচন শঠতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য তাই ভালো কোনো সংবাদ আগামী দিনে অপেক্ষা করছে না।

Jugsntor

30.8.2020

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও বিবিধ প্রসঙ্গ

 


করোনাকালে বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি উত্থান

করোনাকালে বিশ্ব রাজনীতিতে যেসব পরিবর্তন আসছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি দক্ষিণপন্থি উত্থান ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবর্তন। এই কর্তৃত্ববাদী শাসন সেখানে গণতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে সংকুচিত করেছে ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ায় এটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য একটি অশনিসংকেত। সনাতন গণতান্ত্রিক সমাজে যে চর্চা, অর্থাৎ মুক্তচিন্তা, অবাধ ভোটাধিকার, আইনের শাসন এ সবই অনেক দেশে ব্যাহত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং Internationl IDEA’র সমন্বয়ে ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে The Global Monitor of Covid-19’s Impact on Democracy and Human Rights নামে একটি উদ্যোগ, যারা ১৬২টি দেশে কভিড-১৯ কীভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আঘাত করছে, তা মনিটর করছে। ১৪ আগস্ট (২০২০) তাদের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় এশিয়ায় যেসব দেশে Authoritarian regime বা কর্তৃত্ববাদী শাসন রয়েছে, সেখানে মহামারীর সময় কিছু কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।

গত ৩০ মার্চের (২০২০) হাঙ্গেরির পার্লামেন্টে একটি আইন পাস হয়েছে। এই আইনবলে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জরুরি প্রয়োজনে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিল। এই আইনবলে তিনি ডিক্রি জারি করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায়ও থাকতে পারবেন। তার কর্মকান্ডের জন্য তাকে পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে হবে না। তিনি ইচ্ছে করলে দেশের প্রচলিত যে আইন রয়েছে, সেই আইনের বিরুদ্ধে যেতে পারবেন।

প্রয়োজন হলে সংবিধান স্থগিত রাখতে পারবেন। ভিক্টর ওরবান করোনাভাইরাসের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। এটা হচ্ছে একটা দৃষ্টান্ত, যেখানে ক্ষমতাসীনরা পৃথিবীর কয়েকটি দেশে এ ধরনের আইন পার্লামেন্টে পাস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। করোনাভাইরাস তাদের সবার জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নিঃসন্দেহে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী একটি বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি করেছে। এই সংকটকে কেন্দ্র করে এ থেকে সুবিধা নেওয়া, পার্লামেন্টে বিশেষ আইন পাস করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেওয়া প্রকারান্তরে একনায়কতন্ত্রী মানসিকতারই প্রতিফলন। একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ইউরোপে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল এর ইতিহাস মানুষ জানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদের ভস্মস্তূপ থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। এখন সেই ইউরোপেই, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতন তথা ‘ভেলভেট রেভ্যুলেশন’ (সাবেক চেকোস্লাভাকিয়ায় ভাসলাভ হাভেলের নেতৃত্বে) সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বীজ বপন করলেও ভিক্টর ওরবানের মতো লোক তখন তার ‘কবর’ রচনা করতে চলেছেন। ২০১৮ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। শুধুমাত্র হাঙ্গেরিতে ওরবানের ঘটনাকে আমরা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাবতে পারতাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমরা বিশ্লেষণ করেছি। তাতে আমরা একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করেছি অর্থাৎ সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ আইন প্রণয়ন, ক্ষমতা শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে কুক্ষিগত করা, পার্লামেন্টের ক্ষমতা কমানো, বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা ইত্যাদি। আমরা আজারবাইজান, রাশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, ইসরায়েলের কিংবা তুরস্কের দৃষ্টান্ত দিতে পারব। এইসব দেশ গণতন্ত্রের প্রতি ‘কমিটমেন্ট’ এর কথা বলেছে। তাদের স্ব স্ব দেশের সংবিধানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সুযোগে তারা এখন নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করছেন। শীর্ষ নেতৃত্বের হাতকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

করোনাকালে আমরা বেলারুশের সর্বশেষ ঘটনা উল্লেখ করতে পারব। এই দেশটি এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বেলারুশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন আলেকজান্ডার লুকাসেনকো। ১৯৯৪ সাল থেকেই তিনি ক্ষমতায়। পঞ্চমবারের মতো তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন ২০১৫ সালে এবং ষষ্ঠবারের জন্য ৯ আগস্ট (২০২০) তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে ঘোষণা করা হলেও, নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও ভোটডাকাতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাভিতলানা সিকানউস্কায়া, যিনি প্রাণের ভয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট (২০২০) সেখানে স্মরণকালের বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্ষোভে ব্যাপক শ্রমিক সমাবেশ ঘটেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলছে। দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনামলে লুকাসেনকো এককভাবে দেশ চালাচ্ছেন। কভিড-১৯ এর সুযোগ নিয়ে তিনি অনেক ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে আজারবাইজানের দীর্ঘদিনের শাসক ইলহাম আলিয়েভ। ক্ষমতায় আছেন ২০০৩ সাল থেকে। তার বাবা হায়দার আলিয়েভও সে দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইলহাম করোনাভাইরাসের কারণে সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করেছেন। বিরোধীদের অফিস বন্ধ করে দিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়াতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১৫ এপ্রিল (২০২০)। অথচ, জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-হু’র পক্ষ থেকে বারবার ‘সামাজিক দূরত্বের’ কথা বলা হয়েছিল। সিঙ্গাপুর সরকার নাগরিকদের ‘ডাটা’ সংগ্রহ করছে, যা মানুষ মেনে নিয়েছে বলেই মনে হয়। এ কারণেই সিঙ্গাপুরে মৃত্যুর সংখ্যা কম। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুর্তাতে জুলাই মাসে (২০২০) আইন পাস করে নিজের হাতে অনেক ক্ষমতা নিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বাস্তবায়ন করছেন। থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীকে জরুরি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করতে প্রধানমন্ত্রী নতুন ডিক্রি জারি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ও-চা তার ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছেন। হাঙ্গেরির মতো পোল্যান্ডও একদলীয় পথে হাঁটছে। ক্ষমতাসীন ‘ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ সব ধরনের উপদেশ ও সাজেশন উপেক্ষা করে জুন মাসে (২০২০) প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। সেখানে আদৌ কোনো ‘লকডাউন’ কাজ করেনি। করোনাভাইরাসের সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না দিয়ে দলীয় প্রার্থী আন্দ্রেই দুদাকে পাস করিয়ে এনেছে দলটি। সেখানে নতুন আইন প্রণয়ন করে সরকারকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তানে করোনা শব্দটি পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে আইন করে। কম্বোডিয়ায় হুনসেন করোনার সুযোগে নিজের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছেন। বিরোধী দল ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টির শীর্ষস্থানীয় সব নেতাকে গ্রেপ্তার করে তিনি কার্যত দেশটিতে একদলীয় শাসন চালু করেছেন। হুনসেন ১৯৮৫ সাল থেকে ক্ষমতায়। আমরা আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিতে পারব, যেসব দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছেন। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ক্রিমিনাল চার্জ’ থাকা সত্ত্বেও তিনি আইন করে বিরোধীদলীয় জমায়েত নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে তার বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন গড়ে না ওঠে। তিনি বিরোধী দলকে ভেঙে এখন একটি কোয়ালিশন সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাশিয়ায় এই সুযোগে প্রেসিডেন্ট পুতিন নতুন নতুন সব আইন করছেন, যাতে করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুতিন চীনের মতো নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। তুরস্কের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

করোনাভাইরাস পুরো বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনেছে। এতে করে আগামীতে প্রতিটি দেশেই এর একাধিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাবে। এক্ষেত্রে সরকারগুলোর আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি। গণতান্ত্রিকভাবে এরা নির্বাচিত হলেও (জনগণের ভোট, পার্লামেন্টের সুপ্রিমেসি) করোনাভাইরাসের কারণে তারা আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছেন। তাই ওয়াশিংটন পোস্টে (৩ এপ্রিল, ২০২০) জশুয়া কুলান্টঝিক (Joshua Kurtantzick) হুনসেন, ওরকান, দুতার্তের নাম উল্লেখ করে বলেছেন এরা ধীরে ধীরে নিজের দেশকে গণতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসছেন। এই ‘গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে আসা’ই হচ্ছে একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটা। ওরবানের কর্মকান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তাকে সমালোচনা করেছেন। অতীতেও তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন, যখন হাজার হাজার সিরীয় অভিবাসী তার দেশে প্রবেশ করে জার্মানিতে ঢুকতে চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি শুধু খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয় দেবেন, মুসলমানদের দেবেন না। হুনসেনের কম্বোডিয়ায় বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণাসহ সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে তিনি জেলে পাঠিয়েছিলেন। আর দুতার্তের ‘ড্রাগ ওয়ার’ এর কথা কে না জানে? কোনো ধরনের আইনের মুখোমুখি না করে তিনি শত শত মানুষকে গুলি করে মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাদের তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘ড্রাগ ডিলার’ হিসেবে। ওইসব নেতা গণতন্ত্র চর্চা করেন না, গণতন্ত্রকে ধারণ করেন না, এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার, তাই তারা করছেন। এখন করোনাভাইরাস তাদের জন্য একটি ‘মহা সুযোগ’ সৃষ্টি করেছে তাদের ক্ষমতাকে আরও সংহত ও শক্তিশালী করতে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এ ধরনের ঘটনা কোনো ভালো খবর নয়।

Desh Rupantor

22.8.2020

কতটা চমক দেখাতে পারবেন কমলা হ্যারিস


কমলা হ্যারিস এ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচিত একটি নাম। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদলীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী, জো বাইডেনের রানিং মেট। ৩ নভেম্বর সেখানে নির্বাচন। কমলা হ্যারিস আলোচিত নানা কারণে। তাঁর শরীরে ভারতীয় রক্ত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জ্যামাইকান রক্তও। মা শ্যামালা গোপালান ভারতীয়, আর বাবা ডোনাল্ড হ্যারিস এসেছিলেন জ্যামাইকা থেকে। দুজন ইমিগ্র্যান্টের সন্তান কমলা, জন্ম ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে। নিজেকে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে পরিচয় দিলেও শতভাগ কৃষ্ণাঙ্গ, এটা বলা যাবে না। অনেকটাই বাদামি রং তাঁর শরীর ধারণ করে। কমলা হ্যারিসের জন্ম ও গায়ের রং নিয়েও কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প; যদিও ট্রাম্প নিজেও ইমিগ্র্যান্টের সন্তান। তবে পার্থক্যটা হলো তিনি শ্বেতাঙ্গ, কমলা শ্বেতাঙ্গ নন, বাদামি। কমলা হ্যারিসকে নিয়ে শ্বেতাঙ্গদের ভয়টা কি এ কারণে যে কমলা হ্যারিস ডেমোক্র্যাট দলের উঠতি স্টার! ৭৭ বছরের জো বাইডেনের রানিং মেট হয়ে কমলা কি সবাইকে জানিয়ে দিলেন, তিনি ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী! ২০২৪ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কি কমলা হ্যারিস টার্গেট করছেন?


এটা ঠিক, আমেরিকার রাজনীতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না। নীতিনির্ধারণে প্রেসিডেন্টের ভূমিকাই আসল। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট ওবামার অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন (২০০৯-১৭)। তবে এটা সত্য, তিনি কোনো ‘ক্যারিসমেটিক’ লিডার নন, যেমনটা ছিলেন বারাক ওবামা। এ ক্ষেত্রে কমলা হ্যারিসের মনোনয়ন ডেমোক্র্যাটদের ইমেজ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে কিছুটা হলেও।


কমলা হ্যারিসের ভারতীয় ও জ্যামাইকান ‘কালেকশন’ ভারতীয় ও ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূতদের মাঝে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে। এ ক্ষেত্রে ক্যারিবীয় কিংবা ভারতীয় আমেরিকানদের সংখ্যা যে বেশি, তা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান বলছে, ক্যারিবীয়দের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৪ শতাংশ আর ভারতীয়দের ক্ষেত্রে ০.৯ শতাংশ। নতুন প্রজন্মের ক্যারিবীয় ও ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের আদি বাসস্থানের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। কমলা হ্যারিসের মা এসেছিলেন চেন্নাই থেকে। তাঁর যখন বয়স সাত বছর, তখন তাঁদের মা-বাবার মাঝে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। চেন্নাইয়ে তাঁর মাতৃকুলের আত্মীয়-স্বজন আছেন। তবে তাঁদের সঙ্গে কমলা হ্যারিসের যোগাযোগ খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। মায়ের কারণে সনাতন ধর্মের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ভক্তি আছে। আবার বাবার কারণে তিনি চার্চেও যান। তবে তিনি কোনো একটি বিশেষ ধর্ম পালন করেন কি না তা জানা যায়নি। তাঁর মা-বাবা উভয়েই উচ্চ শিক্ষিত এবং পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী। তাঁর বাবা ডোনাল্ড জে হ্যারিস স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। আর তাঁর মা শ্যামালা গোপালান ব্রেস্ট ক্যান্সার গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী ইহুদি। তিনি ইসরায়েলের জোরালো সমর্থক।


কমলা হ্যারিস একজন আইনজীবী, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনেটর। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি আসবেন, এমন কথা অনেক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল। তিনি নিজে জো বাইডেনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। তাতে সফল হননি। শেষ পর্যন্ত জো বাইডেনই তাঁকে তাঁর রানিং মেট হিসেবে বেছে নেন। বলা ভালো, কমলা হ্যারিসই প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান তথা প্রথম এশিয়ান-আমেরিকান, যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগে মাত্র দুজন মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অবৈধ অভিবাসীদের কাজের অনুমতি দিতে তিনি Dream Ac (২০০১)-এর প্রস্তাব করে অভিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে প্রিয়পাত্র হলেও তাঁর ইসরায়েলপ্রীতি আরবদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করেনি। এমনকি ভারতীয়-আমেরিকানদের মাঝে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বেশি। সুতরাং তাঁর ভারতীয় ‘কানেকশন’ নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা একটা প্রশ্ন বটে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, সারা বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। একদিকে কভিড-১৯ মোকাবেলা করার ব্যর্থতা, অন্যদিকে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ইত্যাদি কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তাই তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব। কমলা হ্যারিস তাই কতটুকু চমক আনতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।

Kalerkontho

22.8.2020

ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি




এটা মোটামুটিভাবে এখন নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, ভ্যাকসিন ছাড়া করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আসবে না। কিন্তু এই ভ্যাকসিন বাজারে আসার আগেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনীতি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গেল সপ্তাহে ঘোষণা করেছেন, রাশিয়া কোভিড-১৯ এর একটি ভ্যাকসিন স্পুটনিক ৫-এর অনুমোদন দিয়েছে। রাশিয়া মহাশূন্যে প্রথম একটি নভোযান পাঠিয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যার নাম ছিল ‘স্পুটনিক’। আর ওই নামকে সামনে রেখেই রাশিয়া করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনটি আনল।


তবে রাশিয়ার ওই ভ্যাকসিনটি নিয়ে ইতোমধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন, তারা বলেছেন রাশিয়া ব্যাপক ‘পাবলিক ট্রায়াল’ ছাড়াই ‘স্পুটনিক ৫’-এর অনুমোদন দিয়েছে। যদিও পুতিন প্রকাশ্যেই বলেছেন, তার দুই কিশোরী মেয়ে ‘স্পুটনিক ৫’-এর ট্রায়ালে অংশ নিয়েছে। তবে মজার বিষয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনা ভ্যাকসিনের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক মনোভাব দেখালেও (চীনা ভ্যাকসিনকে তিনি অবজ্ঞা করে বলেছি Kung Flu ) রাশিয়ার ভ্যাকসিনের ব্যাপারে তার মন্তব্য অনেকটা ইতিবাচক।


গত ১৪ আগস্ট হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, তিনি আশা করছেন এই ভ্যাকসিনটি কাজ করবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভ্যাকসিনটির ব্যাপক ব্যবহারের পরও কোভিড-১৯ এর সঙ্গেই মানবগোষ্ঠীকে বসবাস করতে হবে। অনেকটা স্মলপক্সের মতো। ১৯৮০ সালে স্মলপক্স নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। বহুল আলোচিত স্পেনিস ফ্লুর কথাও আমরা বলতে পারি। ১৯১৮-১৯২০ সালে স্পেনিস ফ্লু মহামারী আকারে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে মারা গিয়েছিল প্রায় ৫ কোটি মানুষ। এটা ছিল এক ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত ভাইরাস, যা পরে নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কোভিড-১৯ ওই গোত্রীয় একটি ভাইরাস।


এযাবৎকালের যতগুলো মহামারীর কথা জানা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক সময় তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাই করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলেই আমার ধারণা। তবে এই ভাইরাসটি আর কতদিন দাপিয়ে বেড়াবে, তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। এই করোনা ভাইরাস ও এর প্রতিষেধক ধনী ও গরিব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও তার পার্টনার Astra-Zeneca এবং ফাইজার- BioN Tech SE সম্মিলিতভাবে করোনা প্রতিরোধে একটি টিকা আবিষ্কারের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একে এখনো যেতে হবে অনেক দূর- এখনো তৃতীয় ট্রায়াল সম্পন্ন হয়নি।


ব্লুমবার্গ গবেষকদের তথ্যমতে, ২০২২ সালের প্রথম কোয়ার্টারের আগে কোনোমতেই এক বিলিয়ন ডোজের এই টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না (আগস্ট ২, ২০২০)। টিকা আবিষ্কারের আগেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইইউ ও জাপান ১ বিলিয়ন ডোজ টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গেল জুন মাসেই ১৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছিল পরীক্ষামূলক টিকার জন্য। ২০২১ সালের জন্য তাদের বরাদ্দ ২০ মিলিয়ন ডলার। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো কী পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এই টিকা পাবে? এই টিকা সরবরাহের ব্যাপারে গঠিত হয়েছে COVAX Initiative. ৭৫টি দেশ ইতোমধ্যে ইচ্ছা পোষণ করেছে এই উদ্যোগে যোগ দিতে।


মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ এই উদ্যোগের সঙ্গে নেই। এরা টিকা বিপণনে অর্থায়ন করবে। তবে GAVI  বা The Global Alliance for Vaccines and  Immunization  আরও একটি উদ্যোগ নিয়েছে, যারা গরিব দেশগুলোকে বিনামূল্যে টিকা সরবরাহ করবে! GAVI -এর অনেক উদ্যোগ অতীতে প্রশংসিত হয়েছিল। GAVI বিশ্বের ৭৬০ মিলিয়ন শিশুকে টিকা দিয়ে তাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। বাংলাদেশ GAVI প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এখন দেখার পালা, বাংলাদেশ কোন প্রক্রিয়ায় এই টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।


বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের টিকার ট্রায়াল নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, একটি চীনা কোম্পানি Sinovac-কে সরকার বাংলাদেশে তাদের উৎপাদিত ওষুধের ট্রায়াল করার অনুমতি দেবে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল ওই অনুমোদনটি দিয়েছিল (৩১ জুলাই)। সংবাদে এটাও জানানো হয়েছিল যে, ট্রায়ালের জন্য ৪২০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকেও নির্বাচিত করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পরে জানানো হয়, এ ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর কারণ কী হতে পারে?


একজন বিশেষজ্ঞ, যিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি সংবাদকর্মীদের কাছে জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা একটা  Geo political issue অর্থাৎ এই ট্রায়ালের সঙ্গে একটা ‘রাজনীতি’ জড়িত (ওই)! আমরা আসলেই জানি না কেন চীনের কোম্পানি (বেসরকারি) Sinovac-এর ট্রায়ালের সঙ্গে ‘কোন রাজনীতি’টা জড়িত? তবে সংবাদপত্র মাধ্যমেই আমরা জেনেছি, চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান Sinopharma  আরব আমিরাতে ১৫০০ ব্যক্তির ওপর তাদের ট্রায়াল প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আবার Sinovac  ব্রাজিলেও তাদের ট্রায়াল শুরু করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ব্রাজিলে করোনা ভাইরাসে এযাবৎ মৃত্যুর সংখ্যা ৯৪১৩০ জন। আর আক্রান্তের সংখ্যা ২৭৩৩৬৭৭ জন।


সে তুলনায় আমাদের অবস্থান অনেক ভালো। চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যদি Sinovac -এর ট্রায়াল বাংলাদেশে সফল হয়, তা হলে বাংলাদেশ বিনামূল্যে এই ওষুধটি পাবে। এমনকি স্থানীয়ভাবে Sinovac  বাংলাদেশেও এটি উৎপাদন করবে ও বাজারজাত করবে- এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। Sinovac  তাদের উৎপাদিত ওষুধের তৃতীয় স্টেজের ট্রায়াল ইতোমধ্যে জীবজন্তুর ওপর এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছে। আমরা এখনো জানি না চূড়ান্ত পর্যায় Sinovac  তাদের তৃতীয় স্টেজের ট্রায়াল বাংলাদেশে সম্পন্ন করবে কিনা? আর শেষ পর্যন্ত যদি ট্রায়াল না-ই হয়, তা হলে বাংলাদেশ একটা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো কিনা, সেটাও একটা প্রশ্ন। করোনা টিকা উদ্ভাবন, বিপণন কিংবা ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রশ্ন জড়িত।


বিশ্বের বড় বড় ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ব্যবসায়িক স্বার্থে’ এ ধরনের ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত হয়। তাদের স্বার্থ থাকে টাকা কামানো। করোনা ভাইরাসের টিকার সঙ্গে এ রকমটি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। সুতরাং একটা মৌলিক প্রশ্ন থাকলই- যেখানে বড় বড় বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, সেখানে তারা চীনা কিংবা রাশিয়ান কোম্পানিকে বিনামূল্যে উন্নয়নশীল বিশ্বে তা সরবরাহ করতে দেবে কিনা? চীন ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা বিনামূল্যে তা সরবরাহ করবে। রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের ওষুধ তারা সৌদি আরব ও ব্রাজিলে ট্রায়াল দেবে। তারাও বিনামূল্যে তা সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে।


ইতোমধ্যে ওই ভ্যাকসিন নিয়ে এক ধরনের ‘রাজনীতি’ শুরু হয়ে গেছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাই অক্টোবরেই তিনি ভ্যাকসিনটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আনতে চান। কিন্তু সেখানেও আপত্তি উঠেছে- এটা সম্ভব নয় বলে অনেকেই মনে করছেন। যেখানে করোনা ভাইরাসের ‘দ্বিতীয় স্রোত’ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো রাজ্যে নতুন করে আঘাত করেছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাকসিনের ব্যাপক ট্রায়াল ছাড়াই অক্টোবরে ভ্যাকসিনটি বাজারে আনা, নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কোভিড-১৯ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিগুলো এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা প্রয়োজন।


কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক নীতি ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। যেমন বলা যেতে পারে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার। নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্ত মহামারী নির্মূল প্রক্রিয়ায় শ্লথগতি এনে দেবে। অতীতে আমরা দেখেছি, স্নায়ুযুদ্ধকালীন পোলিও ও স্মলপক্স নির্মূলে ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তার ব্যাপক ব্যবহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন একসঙ্গে কাজ করেছিল। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে সহায়তা করেছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে এমনটি লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীনবিরোধী বক্তব্য ও ‘চীন থেকে এই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে’- এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তিনি চীনকে একটি ‘শত্রু শিবিরে’ ঠেলে দিয়েছেন। ফলে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিপণনের কাজটি খুব সহজ হবে না।


কোভিড-১৯ একটি মহামারী। পৃথিবীর ২১৩ দেশ ও অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭ আগস্ট পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২১৮২৬৪৫০ জন, আর মৃত্যুর সংখ্যা ৭৭৩০৭২ জন। নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও রিপোর্ট হচ্ছে। সংক্রমণ বাড়ছে এমন দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এমন এক পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় ৮ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হলে কত বছর লাগবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন।

Daily Amader Somoy

20.8.2020

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পথে

 


খোলা জানালা

 

বেশ কিছুদিন যাবত চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। গেল বছর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার মধ্য দিয়ে যে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল, তা গড়িয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার অব্দি। ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে।

এ সামরিক উপস্থিতি চীনের জন্য একটি চিন্তার কারণ। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সচিব আলেস্ক্র আজার গত ১১ আগস্ট তাইওয়ান সফর করেছেন। ওই সফরে মি. আজার আবার তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এটা নিঃসন্দেহে এক ধরনের উস্কানি। এরই মধ্যে গত ৪ আগস্ট New Eastern Outlook নামে একটি ম্যাগাজিন দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে ট্রাম্পের ‘গোপন যুদ্ধের’ একটি খবর প্রকাশ করেছে (Trump's Secret War Plan for the South China Sea)। এ ধরনের তৎপরতা নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিতে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যা স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করেছিল। যেমন- বার্লিন ব্লকেড (১৯৪৮-৪৯), কোরিয়া যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩), সুয়েজ সংকট (১৯৫৬), বার্লিন সংকট (১৯৬১) ও কিউবান মিসাইল সংকট (১৯৬২)। এসব ঘটনায় মার্কিন নীতিনির্ধারকরা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ইন্ধন’ ও ‘প্ররোচনা’কে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করেছিলেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল জর্জ কেনানের ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’। তিনি ছিলেন ওই সময়ে মস্কোতে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক। তিনি বিখ্যাত ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে মি. ‘এক্স’ নামে বেনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন (The Sources of Soviet Conduct, February 1946)। এই প্রবন্ধই তাকে বিখ্যাত করে তোলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তিনি একজন ‘স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে পরিচিতি পান। তার প্রবন্ধের মূল বিষয় ছিল ‘যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করছে, সেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়নকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে হবে।’ অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা (কূটনৈতিক, সামরিক, জোট) গ্রহণ করে দেশটির ক্ষমতা খর্ব করতে হবে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এ পলিসি গ্রহণ করেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘসময় ধরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক ধরনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে গিয়েছিল, যা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে স্নায়ুযুদ্ধ নামে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন অন্যতম ‘শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিশেষ করে বিশ্বে চীনের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাব (২০৩০ সালে চীনের জিডিপি হবে ২২.১ ট্রিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের হবে ২৪.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পিপিপিতে চীন হবে প্রথম), চীনের ওবিওআর পরিকল্পনায় ৬১টি দেশকে চীনের আওতায় আনা, ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধি (জিবুতিতে নৌঘাঁটি), আফ্রিকায় বিশাল চীনা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে (সাব-সাহারা আফ্রিকাতে ২৯৯ মিলিয়ন+৬০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৮ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ মাত্র ৪৭.৮০ মিলিয়ন ডলার) নতুন এক আফ্রিকার জন্ম দেয়া, স্ট্র্যাটেজিক্যালি ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া, নৌশক্তি হিসেবে চীনের আবির্ভাব ইত্যাদি বিষয় মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্টদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ঘাটতি। ২০১৮ সালে এ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪১৯.২ বিলিয়ন ডলার। এ ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে, যা জন্ম দিয়েছে এক ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের। শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যান বলছে- চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ (২০১৮) ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে চীন কেন এখন টার্গেট। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হিউস্টনে ‘গোয়েন্দা কার্যক্রমে’ জড়িত থাকার অভিযোগে চীনা কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। চীনও এর প্রতিশোধ হিসেবে চেংডুতে মার্কিন কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করেছে। চীন ওয়াশিংটনে তাদের দূতাবাসে বোমা হামলার অভিযোগ এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও চীনা জনগণকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে চীনা জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্র এ কাজটিই করবে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সিনেটর জিম রিস ও সিনেটর করি গার্ডনার মার্কিন সিনেটে একটি বিল উপস্থাপন করেছেন, যেখানে চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব চুরি করার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ওইসব কোম্পানিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ধারণা করছি, এ বিলটি সিনেটে পাস হবে এবং এতে করে আগামীতে দু’দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এর আগে মার্চে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প Taipei Act-এ স্বাক্ষর করেছিলেন। এ আইনের আওতায় তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। চীন এ সিদ্ধান্তকে নিশ্চয়ই ভালোভাবে নেবে না। তাইওয়ানকে চীন বৃহত্তর চীনের অংশ বলেই মনে করে। ‘হংকং মডেলে’ চীন তাইওয়ানকে বৃহত্তর চীনের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। তবে বিষয়টি অত সহজ নয়। অনেক দেশের সঙ্গেই তাইওয়ানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার না করলেও ওয়াশিংটন ডিসিতে তাইওয়ানের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রয়েছে। তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাইওয়ানের নিরাপত্তার অন্যতম গ্যারান্টার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ানে অত্যাধুনিক অস্ত্র, বিশেষ করে সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ নিয়ে অতীতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়েছিল। এখন নতুন করে ট্রাম্পের Taipei Act দু’দেশের মাঝে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন ২১ জুলাই পম্পেও ব্রিটেন সফরে গিয়েছিলেন। এখানে তিনি চীনা কোম্পানি হুয়াওয়াই ৫জি (Huawei 5G) নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ব্যাপারে ব্রিটেনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী চীনের বিরুদ্ধে একটি ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেবে’ (সুমবার্গ)। মেসেজটি স্পষ্ট; যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে টার্গেট করছে এবং চীনবিরোধী একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে চাইছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর এভাবেই জন্ম হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের। এখন সেই স্নায়ুযুদ্ধের ধারণায় আবার ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র। পম্পেওর কথায় সে ধারণাই প্রতিফলিত হল।

যুক্তরাষ্ট্র চীনকে টার্গেট করে একের পর এক যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ও উদ্যোগে নৌ সামরিক মহড়া। দু-দুটো নৌ সামরিক মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিমানবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে। এ নৌ সামরিক মহড়া কার্যত চীনের প্রতি এক ধরনের হুমকি। ২২ জুলাই দক্ষিণ চীন সাগরের পার্শ্ববর্তী এলাকা ফিলিপাইনস সাগরে যুক্তরাষ্ট্র নৌ মহড়া সম্পন্ন করেছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে। একই সঙ্গে ভারতের নৌবাহিনীর সঙ্গেও নৌ মহড়া সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি চারদেশীয় সামরিক জোট গঠন করেছিল। QUAD বা Quadrilateral Security Dialogue গঠিত হয়েছিল ২০০৭ সালে। বলা হচ্ছে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এ জোট। এ জোটের উদ্যোগে ও ভারতের আগ্রহে এ জোটের পক্ষ থেকে মালাক্কা প্রণালির অদূরে প্রতিবছরই একটি নৌ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যা মালাক্কার নৌ মহড়া নামে পরিচিত। যদিও গত কয়েক বছর অস্ট্রেলিয়া মালাক্কার নৌ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে না। তবে ২০২০ সালের মালাক্কা মহড়ায় ভারত অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানাবে বলে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। চীন এসব নৌ সামরিক মহড়াকে যে খুব সহজভাবে নেবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

আমরা ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘সোভিয়েত আতঙ্কে’ মার্কিন নেতারা যেসব কথা বলতেন; বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেকটা সেরকম কথাবার্তা বলছেন। হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি চীনের কর্মকাণ্ডকে ‘কুকর্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন (২৯ মে, ২০২০)। ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, চীন এ সংস্থায় বাৎসরিক চাঁদা দেয় মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলার; কিন্তু নীতিনির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্র চাঁদা দেয় বছরে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার; অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। ট্রাম্পের উগ্রবাদী নীতি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে তাকে জনপ্রিয় করলেও ব্যাপক মার্কিনির কাছে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। জনপ্রিয়তা বাড়াতে তিনি এখন ‘চীনা কার্ড’ ব্যবহার করছেন।

ট্রাম্পের উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, চীনের বিরুদ্ধে তার কঠোর মনোভাব নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করল। একটি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ গঠনের কথাও কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে। মোদ্দা কথা, ইউরোপে প্রভাববলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক সময় স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। এখন ভারত মহাসাগরে জন্ম হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ-২ এর। খুব সঙ্গত কারণেই এশিয়ার দেশগুলো এ ‘প্রভাববলয় বিস্তারের খেলায়’ আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না। এখন দেখার পালা, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতায় এশিয়ার দেশগুলো কোন পক্ষ অবলম্বন করে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভারত মহাসাগর তথা গাল্ফ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার করে নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চিন্তার কারণ হচ্ছে চীন-ইরান অ্যালায়েন্স। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট ইরান সফর করেন। ওই সময় চীন একটি Comprehensive Strategic Partnership চুক্তির প্রস্তাব করেছিল, যা সম্প্রতি ইরান স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হল এবং এর ফলে ভারত মহাসাগরে চীন এক ধরনের সুবিধা পাবে। বলা ভালো, ইরান তার উৎপাদিত জ্বালানি তেলের শতকরা ২২ ভাগ চীনের কাছে বিক্রি করে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতির আরও একটি দিক হচ্ছে, ট্রাম্প কর্তৃক চীনা ভিডিও অ্যাপ ‘টিকটক’ নিষিদ্ধ করা, যাকে কোনো কোনো বিশ্লেষক অভিহিত করেছেন ‘টিকটক ওয়ার’ হিসেবে। এ ঘটনায় টিকটকের মূল কোম্পানি বাইটড্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক পরিচালনা করা মার্কিন কোম্পানি মাইক্রোসফটের মধ্যে চলছে তুমুল অস্থিরতা। ট্রাম্প টিকটককে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি চীনে ব্যবসা করছে। (জেনারেল মোটরস, জেনারেল ইলেকট্রিক, বোয়িং, নাইকি ইত্যাদি)। এখন চীন যদি এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সামনে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন। ৩ নভেম্বর ট্রাম্পের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। ২০১৬ আর ২০২০ এক নয়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন সর্বনিম্নে। নির্বাচনে তিনি ‘চীনা কার্ড’ ব্যবহার করছেন- এটা স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন এখানেই- যদি ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারেন, তাহলে নয়া প্রেসিডেন্ট বাইডেন কি চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেবেন? আবার যদি ট্রাম্প ‘বিজয়ী’ হন, তাহলে ট্রাম্প কি চীনের সঙ্গে একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবেন? তবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে নভেম্বর পর্যন্ত যে উত্তেজনা থাকবে, তা বলাই বাহুল্য

Jugantor

16.8.2020

প্রদীপের নিচে অন্ধকার



প্রদীপের নিচে কি সবসময় অন্ধকারই থাকে? সেই প্রচলিত বাক্যটি আবারও সত্যে পরিণত হলো যখন জনৈক প্রদীপ কুমার দাশের ‘নানা কেচ্ছা-কাহিনী’ নিত্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে।


প্রদীপ এখন কারাগারে। অভিযোগটি গুরুতর একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যা। ‘ক্রসফায়ার’! এই শব্দটি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আবার এক ধরনের ‘অ্যালার্জি’ আছে। তারা মনে করেন, এই শব্দটি এনজিওরা ব্যবহার করেন।

প্রদীপ কুমার দাশের চাকরির বয়স ২৫ বছর। ১৯৯৫ সালে সাব ইন্সপেক্টর হিসাবে তিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন কারাগারে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। এখন বরখাস্ত। গেল ২৫ বছরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়েছেন। এটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রামের ‘মাস্তান’ তিনি। ঘুরেফিরে বারবার তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানাতেই থেকেছেন। ফলে নানা দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে না। সংবাদপত্রে তার সম্পর্কে যেসব খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছে, তার কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা আমি বলতে পারব না। তবে চট্টগ্রামে তার বাড়ি, বৃহত্তর চট্টগ্রামের ‘ক্রাইম জোন’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে তার বারবার পোস্টিং যে মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবে, এটাই স্বাভাবিক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা ভেবে দেখতে পারে এভাবে নিজ জেলায় পুলিশ কর্তকর্তাদের পোস্টিং দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক?


একজন প্রদীপ, ‘ক্রাইম জোন’ হিসেবে পরিচিত টেকনাফ থানার দায়িত্বে ছিলেন ২২ মাস। টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ২২ মাসে ১৪৪টি কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন ২০৪ জন! ডিবিসি টিভি চ্যানেলটি আমাদের আরো জানাচ্ছে, 'ক্রসফায়ারে’র ভয় দেখিয়ে তিনি অবৈধ টাকা আয় করতেন। আমি জানি না অভিযোগটির পেছনে কতটুকু সত্যতা আছে! তবে প্রশ্ন তো আছে অনেকগুলোই। ডিবিসি চ্যানেলের অভিযোগটি যদি সত্য না হয়ে থাকে, যদি মিথ্যা ও বানোয়াট প্রতিবেদন হয়, তাহলে পুলিশ প্রশাসনের উচিত ছিল তার প্রতিবাদ করা। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন কি তা করেছে? আবার অভিযুক্ত হিসেবে বারবার প্রদীপের নাম আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কক্সবাজারের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি কি অজানা ছিল?

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর আরেকজন অভিযুক্ত আসামিকে পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুনেছি, যা মিডিয়ায় ‘ফাঁস’ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, পুলিশ সুপার ওই অভিযুক্তকে ‘পরামর্শ’ দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন!

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ওই কণ্ঠটি যদি পুলিশ সুপারের হয়ে থাকে, তাহলে ওই হত্যাকাণ্ডের দায় তিনিও এড়াতে পারেন না। অদক্ষতা, খুনিকে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ নিশ্চিতভাবেই তার বিরুদ্ধে উঠবে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন তদন্তে ওই সুপারের বিরুদ্ধে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফিরে যাই প্রদীপ দাশের প্রসঙ্গে। তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ অসৎ পথে উপার্জনের অভিযোগ আছে। গত ৯ আগস্ট এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে (যুগান্তর)। মজার কথা হলো, দুদক একবছর আগে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা থেমে গিয়েছিল। ২০১৮ সালেই দুদক প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। প্রদীপ দাশের স্ত্রী চুমকি গৃহিণী হলেও, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিপরীতে দেখা যায় তার মৎস্য খামার থেকে বছরে আয় কোটি টাকা!

নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় চার শতক জমি কিনে (৮৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) সেখানে ছয় তলা ভবন করেছেন (১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা), ২০১৫-১৬ সময়সীমায় জমি কিনেছেন অন্তত ১ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকার, রয়েছে কক্সবাজারে ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা দামের ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের মূল্য জানানো হয়েছে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা। এর বাইরেও আছে একটি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, আছে ৪৫ ভরি সোনা (যুগান্তর)।

প্রদীপ দাশের নিজের সম্পদের হিসাব অবশ্য আমরা পাইনি। তবে সংবাদপত্রটি আমাদের জানিয়েছে, ভারতের আগরতলা, কলকাতার বারাসাত, গৌহাটি ও অস্ট্রেলিয়ায় তার বাড়ি আছে। এগুলো নিশ্চই প্রদীপ দাশ তার সম্পদ বিবরণীতে দাখিল করেননি। এর ফলে এ সংক্রান্ত তথ্য উদঘাটন করা হবে কঠিন কাজ। প্রদীপের বাবা অত্যন্ত সৎ ছিলেন। তার বাবা হরেন্দ্র লাল দাশ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা প্রহরী ছিলেন। একজন নিরাপত্তা প্রহরীর সন্তান কিভাবে এত বিপুল সম্পত্তির মালিক হন, প্রশ্ন তো সেখানেই।

এটা ঠিক, একজন প্রদীপকে দিয়ে আমি পুরো পুলিশ বাহিনীকে বিচার করব না। কিন্তু এ ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে সাধারণ একজন নন-ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তা তার চাকরি জীবনে এত বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন কি? তার পরিচয় যা পেয়েছি, তাতে দেখা যায় তিনি প্রদকপ্রাপ্ত এবং তা একাধিকবার। অর্থাৎ তার দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাহলে একজন দক্ষ অফিসারও যে দুর্নীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পারেন, প্রদীপ তো তারই প্রমাণ। একইসঙ্গে এটিও স্পষ্ট হলো— কাউকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে দক্ষতা কোনো গ্যারান্টার নয়। সরকার অনেক আগেই বেতন বাড়িয়েছে সব সরকারি কর্মকর্তার। তার ‘বেনিফিট’ প্রদীপ দাশও পেয়েছেন। তারপরও কেন দুর্নীতি?

এখন দুদকের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা যাচাই করে দেখুক তার নামে যে সম্পত্তি রয়েছে, তার বৈধতা কতটুকু। তার হলফনামায় তো সব তথ্য দেওয়া আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, তার স্ত্রীর পাসপোর্টে ভারতীয় মাল্টিপল ভিসার স্টিকার রয়েছে। তার আদৌ কলকাতা কিংবা গৌহাটিতে বাড়ি আছে কি না, তা যাচাই করাও কঠিন কিছু নয়। দুদক নিশ্চই তার স্ত্রীকে ডাকবে।

একজন গৃহিণী ব্যবসা করতেই পারেন। এটা বৈধ। মাছের খামার তো অবৈধ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে খামার করতে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তা তিনি সংগ্রহ করলেন কোথা থেকে? একজন প্রদীপ সব পুলিশ সদস্যের ‘ইনটিগ্রিটি ও সততা’কে এখন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। র‌্যাবের ওপর সবার আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস রাখতে চাই, র‌্যাব সত্যটা বের করে আনবে। তবে একটা কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি দেখলাম, জাতীয় শ্রমিক লীগ টেকনাফ থানার ব্যানারে একটি মিছিলের ছবি। ব্যানারের বক্তব্য ‘ওসি প্রদীপ কুমারের বিকল্প নেই’। সেখানে হত্যা মামলা হয়েছে, র‌্যাব তদন্ত করছে, সেখানে এ ধরনের বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন ভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

একজন প্রদীপ পুলিশ বাহিনীর মানমর্যাদাকে কিছুটা হলেও ক্ষতি করেছেন। তবে তার কর্মকাণ্ড দিয়ে সব পুলিশ সদস্যকে আমি বিচার করব না। তবে এই ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণের দায়িত্ব নিতে হবে পুলিশকেই

Sarabangla

11.8.2020