রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

সংবাদটি আমাদের কতটুকু আশাবাদী করে?


  

একটি আশাবাদী সংবাদ ছাপা হয়েছে গত ১১ মার্চের পত্র-পত্রিকায়। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, ইন্টারপোলের সাহায্যে ১১ জনকে ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (যুগান্তর)। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুদক ১১ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে।
সংবাদটি নিঃসন্দেহে আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কতটুকু সফল হতে পারবে দুদক? পাপিয়া কাহিনী যখন দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যখন পুলিশ পাপিয়াকে রিমান্ডে নিয়ে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছে, ঠিক তখনই এলো দুদকের এ উদ্যোগের খবর।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা পুরো ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের এক ধরনের অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ এখন আর ব্যাংকে তাদের আমানত রাখতে সাহস পাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের মাঝে আরও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যখন মানুষ সংবাদপত্র পাঠ করে জেনেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটকারী হালদাররা কানাডায় বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ থেকে টাকা লুট করে কানাডার টরন্টোয় ‘বেগম পাড়া’য় বাড়ি কেনার কাহিনী অনেক পুরনো। বাংলাদেশি টাকায় হালদাররা সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। বাংলাদেশে এসব ব্যাংক লুটেরার বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ কিংবা মানববন্ধনের মতো ঘটনা না ঘটলেও টরন্টোয় ঘটেছে- এটাও একটা আশাবাদী করার মতো সংবাদ। কানাডায় বাস করা প্রবাসীরা ওই ব্যাংক লুটেরাদের সামাজিকভাবে বয়কট করে সেখানে মানববন্ধন করেছেন।
দুর্নীতি আজ সমাজের কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তা সাম্প্রতিককালে উদ্ঘাটিত এনু-রুপন আর পাপিয়া-‘কাহিনী’ থেকে বোঝা যায়। এ ধরনের ‘কাহিনী’ রূপকথাকেও হার মানায়। আমরা সাধারণ আমজনতা অবাক হয়ে দেখি কীভাবে সাধারণ ঘরের মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার মালিক হন।
সম্প্রতি র‌্যাবের এক অভিযানে (২৫ ফেব্রুয়ারি) পুরনো ঢাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতার বাসায় ৫টি সিন্দুকে পাওয়া গেছে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর আর ১ কেজি স্বর্ণ। এর আগে গেল বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালিয়ে ৫ কোটি টাকা ও সাড়ে ৭ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেছিল র‌্যাব।
ঢাকা শহরে তাদের অন্তত ১৫টি বাড়ির অস্তিত্বের খবর পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরা দুই ভাই এনু ভূঁইয়া ও রুপন ভূঁইয়া গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা।
একজন পাপিয়ার কাহিনীও পাঠক জেনেছে ২৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি নরসিংদী জেলা আওয়ামী যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন অবশ্য বহিষ্কৃত। তার বিলাসী জীবনের কাহিনী মানুষ জেনেছে সংবাদপত্র পাঠ করে। সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা ছাড়াই পাপিয়ার দৈনিক লাখ লাখ টাকা ব্যয়, ‘কিউ অ্যান্ড সি’ নামে একটি ব্যক্তিগত বাহিনীর মাধ্যমে গড়ে তোলা নিজস্ব সাম্রাজ্য, অবৈধ অস্ত্র, চাকরির তদবিরের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া, অর্থ পাচার, মাদক কারবার, অসহায় নারীদের নিয়ে দেহ ব্যবসা ইত্যাদি নানা কাহিনী এখন সংবাদপত্রের পাতায়।
গত তিন মাসে পাপিয়া হোটেলের বিল পরিশোধ করেছেন ৩ কোটি টাকা। একটি নামকরা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া করে তিনি থাকতেন এবং কিছু তরুণীকে দিয়ে দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিলেন। ওই হোটেলের মদের একটি বার তিনি সারা রাতের জন্য ভাড়া করে রাখতেন। পাপিয়া কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও তার বাবার সংসার চলে অটো গাড়ির ভাড়ায়।
পতিতালয়ের সর্দারনি মার্কা পাপিয়ার একটি ছবি তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। একটি অনলাইন পোর্টালের খবর (বাংলা ইনসাইডার)- পাপিয়ার কললিস্টে ১১ মন্ত্রী ও ৩৩ এমপির নাম। এ পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন এখন দু’দফায় আরও ১৫ দিনের রিমান্ডে। আমরা জানি না তার অবৈধ অর্থের হিসাব পুলিশ কতটুকু উদ্ধার করতে পারবে!
কিন্তু যারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে ব্যবহার করে, উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে, অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে শত শত কোটি টাকার মালিক হন, তারা রাজনীতির জন্য আশীর্বাদ নন, বরং অভিশাপ। যারা তাকে জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন, তারাও সমান অপরাধী।
পাঠক, জি কে শামীম ও সম্রাটের কথা নিশ্চয় মনে আছে আপনাদের। দু’জনই এখন জেলে। কীভাবে রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলে ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ব্যবহার করে সম্রাটরা টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন, তা পাঠকরা এর মধ্যে জেনে গেছেন। জেনে গেছেন ক্যাসিনো সম্রাটদের নাম, ঠিকানা ও তাদের কর্মকাণ্ড। প্রধানমন্ত্রী ক্যাসিনো সম্রাটদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বিশেষ করে যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে যুবলীগকে ব্যবহার করে এই ক্যাসিনো সম্রাটরা অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের প্রয়োজন ছিল। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি- ছয় মাসের ব্যবধানে পাপিয়ারা যখন গ্রেফতার হন, তখন বুঝতে হবে রাজনীতির নামে যারা অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযান প্রয়োজন।
একজন সম্রাট, একজন এনু-রুপন কিংবা পাপিয়ার কারণে রাজনীতিটা ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে। রাজনীতি আর রাজনীতির জায়গায় থাকেনি। সম্রাট আর পাপিয়ারা রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে। এদের রাজনীতি দলের জন্য তো বটেই, জাতিরও কোনো মঙ্গল ডেকে আনছে না। অথচ এ দেশে অনেক কৃতী রাজনীতিবিদ আছেন ও ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির কারণেই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো জেলে কাটিয়েছেন। মওলানা ভাসানী রাজনীতি করে শেষ জীবন কুঁড়েঘরেই কাটিয়ে দিয়েছেন। কোনো দিন প্রয়োজনবোধ করেননি ঢাকায় প্লট, ফ্ল্যাট নেয়ার। আবেদনও করেননি কোনোদিন। এমন খবরও আমরা জানি, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির বিরোধিতা করলেও বঙ্গবন্ধু তাকে নিয়মিত লুঙ্গি ও গেঞ্জি সরবরাহ করতেন। এটা ছিল ভাসানীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ভালোবাসা।
আজ যারা বঙ্গবন্ধুর নামে রাজনীতি করেন, তারা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেন? অবৈধ কোটি কোটি টাকা যারা সিন্দুকে রেখে দেন, তিন দিনে হোটেলে তিন কোটি টাকা ‘বিল’ দেন, তাদের আয়ের উৎস কী? সর্দারনি মার্কা চেহারা আর বেশ-ভুষা যাদের, তারা আর যাই হোক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেন না। আমি জানি না এসব অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীদের বিচারে কী হবে।
আশঙ্কার একটা জায়গা হচ্ছে, এসব তথাকথিত ‘রাজনীতিকদের’ সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ‘যোগসাজশ’। র‌্যাবের কর্মকর্তারাও সংবাদকর্মীদের কাছে তা স্বীকার করেছেন। এখন এই ‘যোগসাজশ’ তাদের পুনর্বাসন তথা মুক্তির ব্যাপারে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
আরও কিছু কথা। একটি জাতীয় সংবাদপত্র (বণিক বার্তা) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০) ‘ভালোই আছেন ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুষ্কৃতকারীরা’। ভালো আছেন- সংবাদপত্রটি আমাদের জানাচ্ছে! তিনজনের নাম সংবাদপত্রটি উল্লেখ করেছে- প্রশান্ত কুমার হালদার, আবদুল আজিজ ও আবদুল হাই বাচ্চু। এ তিনজনের নতুন করে পরিচয় দেয়ার দরকার নেই। পাঠক মাত্রেই এদের নামে চেনেন।
পত্রিকার ভাষ্যমতে, প্রশান্ত কুমার হালদার কানাডায় আছেন। একই দেশে আছেন আবদুল আজিজও। আর আবদুল হাই বাচ্চু নিউইয়র্ক-লন্ডনে সপরিবারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রশান্ত কুমার হালদার কানাডায় একটি কোম্পানি গঠন করে সেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। বিদেশে ৯১৯ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে আজিজের বিরুদ্ধে। এটা শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের।
দুদকের অভিযোগ ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের। আর জনতা ব্যাংকের অভিযোগ ৩ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা ফেরত না দেয়ার। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুল হাই বাচ্চু। বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬১টি মামলা করেছে দুদক। দুদক তাকে কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
অভিযোগ আছে, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের মামলায় আসামি করা হলেও অজ্ঞাত কারণে আসামি করা হয়নি পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের। এসব ‘কাহিনী’ আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
তবুও আমরা আশাবাদী হতে চাই। দুদকের ওপর আস্থাটা রাখতে চাই। শামীম আর হালদারদের চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। দায়িত্বটা তাই দুদকের। সম্প্রতি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আপিল বিভাগে এক শুনানিতে মন্তব্য করেছেন এভাবে : ‘এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের টাকা লুটের জন্য’ (যুগান্তর, ২৫ ফেব্রুয়ারি)।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন, তখন একটা হতাশা প্রকাশ পায় বৈকি! জনগণের টাকা লুটের জন্য ব্যাংক। কী সাংঘাতিক কথা! এ সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে অবৈধ পন্থায় টাকা ‘লুট’ করে নেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
দুদককে মাঝে মধ্যে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে দেখি। কিন্তু তারপরও অর্থ পাচারকারীরা, ব্যাংক লুটপাটকারীরা দুদককে বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে অভিযোগ থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংক নিশ্চয়ই লুটপাটের জায়গা হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারে তার চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না।
সুতরাং দুদক যখন ইন্টারপোলের মাধ্যমে অর্থ লুটপাটকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়, আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে দুদক যেন শুধু ইন্টারপোলে চিঠি লিখেই তাদের দায়িত্ব শেষ না করে। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। আর্থিক দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের মাঝে দুদকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
Jugantor
14.03.2020

0 comments:

Post a Comment