রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও চীন সফর প্রসঙ্গে

প্রধানমন্ত্রী তার চীন সফর শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসে শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন। জাপান সফর শেষ করেও তিনি একইভাবে বক্তব্য রেখেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন তার সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, তার গুরুত্ব পায় বৈকি। যারা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি নিয়ে কাজ করেন, তাদের কাছে এ সফরের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন সে কথা। বলেছেন তার চীন সফর সফল হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। তিনি চারবার চীন সফর করেছেন। ১৯৯৩ সালে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে প্রথম, পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আর এ ব্যাপারে তিনি চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, 'চারদেশীয় একটি ইকোনমিক করিডোর হবে। প্রধানমন্ত্রী এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত বিসিআইএম নামে যে উপআঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে উঠেছে (বাংলাদেশ, চীনের ইউনান প্রদেশ, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ও মিয়ানমারের সমন্বয়ে), সে কথাটাই বলতে চেয়েছেন। পটুয়াখালীতে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক এবং কারিগরি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে একটি টানেল নির্মাণ ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি গার্মেন্টপল্লী নির্মাণ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সে কথাও প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর একটা ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি করলেও এ সফর নিয়ে প্রশ্ন যে নেই, তা বলা যাবে না। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের চীনের প্রতি 'ঝুঁকে পড়ার' এ প্রবণতাকে ভালো চোখে দেখছে না ভারতের নীতিনির্ধারকরা। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক 'দি হিন্দু' এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শেখ হাসিনা চীনা প্রধানমন্ত্রী লি চেলিয়াংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে 'চীনা নেতৃত্বাধীন' শতাব্দীতে বাংলাদেশের 'সক্রিয়' অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। যদিও সরাসরি কোনো ভারতীয় নেতার মন্তব্য এতে পাওয়া যায়নি। চলতি জুন মাসের ২৫ তারিখে ঢাকা সফরে আসছেন নয়া ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ধারণা করছি, ওই সময় ভারতীয় নেতা এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আরও ব্যাখ্যা চাইতে পারেন! তবে একটা কথা বলা প্রয়োজন। বেশক'টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকার তালিকায় যে প্রকল্পটি প্রথমে ছিল, সেই সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। বিভিন্ন ইস্যুতে দু'পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বাংলাদেশ বন্দর পরিচালনার ভার কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিতে চায় না। চীনা সরকার এটি পেতে চায়। উল্লেখ্য, চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানির পাশাপাশি ইউএই, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু একটি বাছাই কমিটি চায়না হারবারকে যোগ্য বলে অভিমত দিয়েছিল। চায়না হারবারের প্রস্তাব অনুযায়ী তিন ধাপে ১০ বছরের মধ্যে এ নির্মাণ সম্পন্ন হবে। ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। ৩ বছরে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষ হবে। বড় জাহাজগুলো তখন এখানে নোঙর করতে পারবে (এখন চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ ঢুকতে পারে না। সিঙ্গাপুর থেকে ছোট জাহাজে পণ্য আনতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয় প্রচুর)। প্রথম পর্যায়ে বন্দরে ২০ লাখ টিইইউএস (খোলা পণ্য) ধারণক্ষমতা হবে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টন। এখানে এখন অনেক দেখার বিষয় রয়েছে। আমার বিবেচনায় বাছাই কমিটির চায়না হারবারকে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক। কেননা চীনারা এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছে। এ অঞ্চলে অন্তত তিনটি গভীর সমুদ্রবন্দরের খবর জানা যায়, যা চীনা অর্থে ও চীনা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নির্মিত হয়েছে এবং পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছে চীন। একটি হামবানটোটায়, অপরটি কলম্বোতে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত হামবানটোটায় ছিল গভীর জঙ্গল। ছোট্ট একটা শহর, যেখানে কোনো ভালো হোটেল ছিল না। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের জন্মস্থান এখানে। চীন এখানে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। এর ফলে পুরো হামবানটোটার দৃশ্যপট বদলে গেছে। হামবানটোটা আজ একটি আন্তর্জাতিক নগরীর মর্যাদা পেয়েছে। নামকরা ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে এখানে। ২০১৮ সালে এখানে কমনওয়েলথ গেমস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কলম্বোতে যে বন্দরটি নির্মিত হয়েছে, তাতে বছরে ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা একটাই এখানে 'মেগা শিপ' অর্থাৎ বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারে এবং পণ্য খালাস করতে পারে। বলা হচ্ছে, বন্দর পরিচালনা কার হাতে থাকবে- এটা নিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। যদি সর্বশেষ কলম্বোর সিআইসিটি অর্থাৎ কলম্বো ইন্টারন্যাশনাল কনটেইনার টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা দেখি, তাহলে দেখতে পাব শতকরা ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনের হাতে। ১৫ ভাগের মালিকানা শ্রীলঙ্কা সরকারের হাতে। যদি পাকিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা বলি, তাহলে শতকরা ১০০ ভাগ মালিকানাই চীনাদের হাতে। এক সময় সিঙ্গাপুরের হাতে দায়িত্ব ছিল এর পরিচালনার। এখন চীনাদের হাতে রয়েছে পরিচালনার ভার। যেখানে তাদের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেখানে পরিচালনার ভার থাকলে আপত্তি কোথায়? সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিরাপত্তা যদি বিঘ্নিত না হয়, তাহলে চীনাদের হাতে বন্দর পরিচালনার ভার দেয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের বন্দর পরিচালনায় যে অভিজ্ঞ জনশক্তি প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। বরং চীনাদের সঙ্গে থেকে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারব। ডিজাইন তৈরিতেও অভিজ্ঞ চীনারা। সুতরাং তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত চুক্তি না হওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে যত দ্রুত আমরা একটা সমঝোতায় পৌঁছব, ততই আমাদের জন্য তা মঙ্গল। কেননা দেরি হলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, এ অঞ্চলের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, বিসিআইএম-এর কর্মকান্ড কে স্বাগত জানিয়েছি। বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ভারত (উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য) ও মিয়ানমারের সমন্বয়ে যে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠছে, তার উন্নয়ন ও বিকাশের স্বার্থেই এ সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব অনেক বেশি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এ বন্দর দিয়েই তাদের পণ্য আমদানি-রফতানি করতে পারবে। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব থাকলেও, চুক্তিটি হলো না কেন? একটা ধারণা দেয়া হয়েছে যে, চীনা ঋণের ধরন নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সহজ শর্তে ঋণ চেয়েছিল। এতদিন একটা ধারণা ছিল, এ প্রকল্পে চীন নমনীয় ঋণ দেয়। এ ঋণের সুদের হার কম, মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু পরে জানা গেল, চীন এ ঋণকে বাণিজ্যিক ঋণে পরিণত করতে চায়, যেখানে সুদের হার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এখানে একটি বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। প্রথমত, বাংলাদেশ অতীতে বিভিন্ন চীনা প্রকল্পে যে ঋণ দিয়েছে, তার ধরন কী? তা কী বাণিজ্যিক ঋণ? দ্বিতীয়ত, এ প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিন আলোচনা চলে আসছিল। ওই আলোচনায় কী বাণিজ্যিক ঋণের প্রশ্নটি এসেছিল? তৃতীয়ত, কোনো সমঝোতা ছাড়াই কেন বলা হলো প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশের আলোচনাকারীরা কী চীনা অর্থে নির্মিত ও পরিচালিত গাওদার, হামবানটোটা ও কলম্বো গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং পরিচালনায় কী ধরনের চুক্তি হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করেছিলেন? এমন কথাও বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ মূলত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি ভারত কীভাবে দেখছে, এটা বিবেচনায় নিতে চায়। এজন্য বাংলাদেশ কিছুটা সময়ক্ষেপণ করছে। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের পর এ 'জটিলতা' কেটে যাবে। গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত হলে তাতে ভারতেরও লাভ। কেননা ভারতের 'সাত বোন' রাজ্যগুলো এ বন্দরটি ব্যবহার করতে পারবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা এরই মধ্যে হয়েছে। তবে ভারতের একটা উৎকণ্ঠা আছে। চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে তার 'মুক্তার মালা' বা 'String of Pearls' এর যে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তাকে ভারত খুব স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এ 'মুক্তার মালা' নীতির মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। চীন এ কাজটি করেছে শুধু তার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে। এটা এখন অনেকেই জানেন, চীনে যে ব্যাপক শিল্প বিপ্লব ঘটেছে, তার জন্য তাকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হয়। আর জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার স্বার্থেই চীন ভারত মহাসাগর এলাকায় তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। গাওদার কিংবা হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনাদের আগ্রহের পেছনে কাজ করছে এ 'জ্বালানি ক্ষুধা'র চাহিদা। গাওদারের মাধ্যমে চীন পারস্য উপসাগরের তেল তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে নিয়ে যেতে চায়। দুবাই-গাওদার উরমকি দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করছে। আর এজন্য পাকিস্তানের কারাকোবাম পর্বাঞ্চলের মধ্য দিয়ে চীন তেলের পাইপলাইন নির্মাণ করছে। উরমকি পর্যন্ত এ পাইপলাইনের দূরত্ব হবে মাত্র ৩৬০০ কিলোমিটার। আগে চীনকে ১০ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে (দুবাই-সাংহাই-উরমকি) পশ্চিমাঞ্চলে তেল নিতে হতো। এখন তারা সময় বাঁচাবে গাওদার বন্দর ব্যবহার করে। চীন তার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে মধ্য এশিয়ার বিশাল গ্যাস রিজার্ভের দিকেও নজর দিয়েছে। জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ার কাসগার থেকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পসমৃদ্ধ প্রদেশগুলোতে গ্যাস নিতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে (কাসগার থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৫০০ কিলোমিটার। অথচ চীনের পূর্বাঞ্চলের শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে কাসগার থেকে দূরত্ব ৩৫০০ কিলোমিটার)। চীনের সদূরপ্রসারী আরেকটি পরিকল্পনা আছে মধ্য এশিয়ার এ গ্যাস ও তেল সোনাদিয়ার মাধ্যমে ইউনান প্রদেশে নিয়ে যাওয়ার। মিয়ানমারের গভীর সমুদ্র থেকে চীন গ্যাস উত্তোলন করছে। এ গ্যাস যাচ্ছে পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে। চীনের পরিকল্পনা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমার-কুনমিং পাইপলাইনকে সোনাদিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা, যাতে করে মধ্য এশিয়ার তেল/গ্যাসও আগামীতে এ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে চীনের আগ্রহ রয়েছে। এখন এ আগ্রহকে আমাদের স্বার্থে আমরা কতটুকু ব্যবহার করতে পারব, প্রশ্ন সেখানেই। চলতি বছরই চীনের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছে। ধারণা করছি, এ সময়ের মধ্যে তিনটি কাজ সম্পন্ন হবে। এক. সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে ভারতের মনোভাব আমরা জানতে পারব। বলা ভালো সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করবে। এখন ভারত যদি বন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সব ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিজেদের জড়িত করে, তাহলে তাদের সেই সুযোগটি দেয়া উচিত। দুই. চীনা ঋণের বিষয়টিও আমরা এরই মধ্যে ফয়সালা করতে পারি। তিন. যে বাকি তিনটি প্রস্তাব আছে, সেই প্রস্তাবগুলোও আমরা এরই মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি। তবে আমাদের ধারণা, নির্মাণ খরচ অন্য প্রস্তাবগুলোতে অনেক বেশি থাকবে। তবুও প্রস্তাবগুলো বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'যে দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দেবে, তাদের সহযোগিতা নেব।' এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। আমাদের স্বার্থ এখানেই নিহিত। মনে রাখতে হবে, ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম বন্দর অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। পলি পড়ে জাহাজ চলাচল বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বেড়েছে। আগামীতে আরও বাড়বে। এমনিতেই নানা জটিলতায় চট্টগ্রাম বন্দরের 'উৎপাদনশীলতা' মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। রাজনৈতিক সঙ্কট তথা শ্রমিক রাজনীতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ থাকার ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। সুতরাং আমরা যত দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব বেশি। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী। আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন বিক্রমপুরের বৌদ্ধ মনীষী অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য অষ্টম শতকে তিব্বতে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন। তার দেহভস্ম তিব্বতে দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ওই দেহভস্ম বাংলাদেশে আনা হয় এবং কমলাপুর বৌদ্ধ মন্দিরে এখন তা সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাস থেকেও জানা যায়, এ অঞ্চলের ব্যাপারে চীনেরও আগ্রহ ছিল। একজন চীনা নাবিক, যিনি এডমিরাল ঝেং হে নামে পরিচিত, তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইউনান প্রদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম মা হে। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সালের মধ্যে দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর উপকূল পর্যন্ত ৩৩টি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দেশ সফর করেন। ১৪২১ থেকে ১৪৩১ সালে পর্যন্ত তিনি দু'বার আজকের অধুনালুপ্ত বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ ভ্রমণ করেন এবং এ অঞ্চলের সঙ্গে ইউনান রাজ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেন। সুতরাং ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। তার এ সফরের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে আরও চীনের কাছাকাছি নিয়ে গেলেন। Daily ALOKITO BANGLADESH 18.06.14

0 comments:

Post a Comment