রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব


মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার আগেই বিজেপির আসাম শাখা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে 'অবৈধ বাংলাদেশিদের' আসাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে! এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ভারতের 'ডেকান হেরাল্ড' পত্রিকায়। পত্রিকাটি ভারতের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সর্বানন্দ সান্যালের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদটি পরিবেশন করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশি খেদাও' অভিযানের সঙ্গে দু'জন মন্ত্রী জড়িত। সান্যালের সঙ্গে আরও আছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজু। সান্যাল নিজে লোকসভার সদস্য ও আসাম বিজেপির সভাপতি। অন্যদিকে কিরণ রিজু অরুণাচল থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিজেপির ন্যাশনাল সেক্রেটারি। প্রশ্ন হচ্ছে, আসাম বিজেপির এই সিদ্ধান্তের পেছনে নরেন্দ্র মোদির সমর্থন আছে কিনা? মোদি ইতিমধ্যেই ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিবকে তথাকথিত 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের' বিষয়ে পৃথক একটি দফতর খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন তার এই নির্দেশনায় অনুপ্রাণিত হয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী 'বাংলাদেশি খেদাও' অভিযানে নামলেন কিনা, প্রশ্ন সেখানেই।

নরেন্দ্র মোদি নিজে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অন্তত একটি ম্যাসেজ দিতে চেয়েছিলেন যে, তিনি তার পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন। এখন যদি আসাম কিংবা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সত্যি সত্যি তথাকথিত বাংলাদেশিদের খেদাও অভিযান শুরু হয়, তাহলে তার এই 'অ্যাপ্রোচ' বাধাগ্রস্ত হবে। শুধু তাই নয়, বিসিআইএমও মুখ থুবড়ে পড়বে। বাংলাদেশ, চীন (ইউনান), ভারত (সাত বোন রাজ্যগুলো) এবং মিয়ানমারকে নিয়ে যে নয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা (বিসিআইএম) তার জট খুলবে না, যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মোদি নিজে চীনের ব্যাপারে আগ্রহী। ফলে বিসিআইএমের ব্যাপারে তার আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিমধ্যে গঠিত সার্ক একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এর কারণও মূলত ভারত। ভারতের দ্বিপক্ষীয়তার রাজনীতি ও সার্ক ফোরামে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আলোচনার সুযোগ না থাকা কিংবা ভারতের এক ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য সার্কের বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়। তাই মোদির বিসিআইএমের ব্যাপারে আগ্রহ থাকবে নানাবিধ কারণে। প্রথমত, এর মাধ্যমে চীন, বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। চীনা বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মোদিকে 'ভারতের নিক্সন' হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করছেন। নিক্সন ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো চীন সফর করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন। এখন মোদিকে তারা 'চীনের বন্ধু' এবং চীনা বিনিয়োগের জন্য সহায়ক বলে মনে করছেন। চীন ভারতে টেলিকমিউনিকেশন ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছে। চীন ভারতে 'বুলেট ট্রেন' চালুরও প্রস্তাব করেছে। ৮ জুন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিলি্ল আসছেন। দ্বিতীয়ত, চীন চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রে সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায়। এতে চীনেরও স্বার্থ রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীন কুনমিংকে (ইউনান প্রদেশের রাজধানী) সমুদ্রপথে 'কানেকট' করতে পারবে। অর্থাৎ ইউনান প্রদেশ এই সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে (সাংহাই বন্দর ব্যবহার না করে) তাদের আমদানি-রফতানি বাড়াতে পারবে, এতে সময় ও অর্থ বাঁচবে অনেক। এই গভীর সমুদ্র একবার হয়ে গেলে ভারতও এ থেকে সুবিধা নিতে পারবে। সাত বোন রাজ্যের পণ্য এ পথে আসা-যাওয়া করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। তৃতীয়ত, এই মুহূর্তে ভারতের টার্গেট হচ্ছে আসিয়ানের পূর্ণ সদস্য হওয়া। সেই সঙ্গে ইস্ট এশিয়া সামিটে নিজেকে জড়িত করা। ভারত ইতিমধ্যে আসিয়ানের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আগামীতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে যে বিশাল শুল্কমুক্ত বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, ভারতের টার্গেট হচ্ছে এই বিশাল বাজারে তার পণ্য নিয়ে প্রবেশ করা। বিসিআইএমে সংযুক্তি তার আসিয়ানে সাগরপথকে আরও প্রশস্ত করবে।

মোদির শপথ অনুষ্ঠানে ওবামা তার কোনো প্রতিনিধি পাঠাননি। যদিও প্রটোকল অনুযায়ী ওবামা মোদিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি কৌশলগত চুক্তিতে আবদ্ধ থাকলেও ক্রিমিয়া ইস্যুতে ভারত রাশিয়ার পক্ষ অবলম্বন করেছে। চীনের অবস্থানও ছিল এই শিবিরে। ভারতের কুদাকুলামে ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির অধীনে রাশিয়া দুটি পারমাণবিক চুলি্ল নির্মাণ করেছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাশিয়া আরও দুটি পারমাণবিক চুলি্ল তৈরি করছে। ফলে ভারত-রাশিয়া মৈত্রী চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকবে অনেক। মোদি এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন বলেও মনে হয় না। তবে মোদি ভারতের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেবেন। ফলে সঙ্গত কারণেই অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্ব পাবে বেশি। 'ব্রিকস' ও সেই সঙ্গে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন বেশি। দিলি্ল-মুম্বাই অর্থনৈতিক করিডোর সৃষ্টিতে জাপানের বিনিয়োগ ব্যয় ৪ বিলিয়ন ডলার। চীনের বিনিয়োগও প্রচুর। চীন-ভারত বাণিজ্য আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারণা করছি, মোদির আমলে ভারতে চীনের বিনিয়োগ আরও বাড়বে। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান হবে না। যারা মোদিকে ভোট দিয়েছেন, সেই ভোটারদের শতকরা ৫০ ভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এদের চাকরি দরকার। তাই মোদিকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তার বৈদেশিক নীতির 'এপ্রোচে' চীন, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া অগ্রাধিকার পাবে বেশি।

বাংলাদেশের ব্যাপারে ইউপিএ সরকারের গৃহীত নীতি থেকে মোদি সরকার বেরিয়ে আসে কিনা, সে ব্যাপারে আগ্রহ বাংলাদেশের অনেকের। মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ঢাকায় ফিরে এসে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় ও স্থায়ী করতে সম্ভাব্য সব উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে ভারতীয় নয়া প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। যতটা শিগগির সম্ভব নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসবেন, এ কথাটা জানাতেও তিনি আমাদের ভোলেননি। এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোদিকে পাঠানো এক অভিনন্দনবার্তায় জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে তার (মোদির) 'দ্বিতীয় বাড়ি'। বিরোধী দলনেত্রী খালেদা জিয়াও মোদিকে অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছিলেন। ফলে নরেন্দ্র মোদির ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের যে আগ্রহ তা বোঝাই যায়। কিন্তু এ আগ্রহের তিনি কতটুকু সম্মান দেন, সেটা বড় প্রশ্ন এখন। তথাকথিত 'অনুপ্রবেশকারী' নামে বাংলা ভাষাভাষীদের তার সরকার যদি বাংলাদেশে পুশব্যাক করে, তাহলে বাংলাদেশে এক বড় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এটা থেকে ফায়দা উঠাবে। ইউপিএ সরকার অনেকগুলো বিষয় শুনিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশের মানুষ সমাধান চেয়েছিল। কিন্তু সমাধান পাওয়া যায়নি। এখন তিস্তা চুক্তি হবে, সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কেননা ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে বেশ ক'টি পৌরসভার নির্বাচন। ২০১৬ সালে বিধানসভার নির্বাচন। তিস্তা মমতার জন্য ট্রামকার্ড। সাংবিধানিকভাবেও একটা বাধা আছে কেন্দ্রের। ফলে ঝুলে গেল তিস্তা চুক্তি। ছিটমহল বিনিময়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সিলেটে ৩৬৬ একর জমি রয়েছে ভারতের অপদখলে। এসব জমি ফেরত দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন আসাম থেকে নির্বাচিত বিজেপির সাংসদরা। গত ৫ বছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি (বৈধ) দেড় লাখ কোটি টাকা। আর অবৈধ বাণিজ্য বছরে ১৫০ কোটি ডলার, যার পরিমাণ সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ এই ঘাটতি কমাতে পারছে না। শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। সাত বোন রাজ্যে যে বিশাল বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়েছে, তাও এখন ঝুঁকির মুখে। বিদ্যুৎ কানেকটিভিটির মাধ্যমে ভারতের বিদ্যুৎ যাচ্ছে বিহারে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্য স্পষ্ট নয়। ইউপিএ সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মোদি সরকার সেসব চুক্তি থেকে সরে আসবে না, এটা সত্য। বাস্তবগত কারণেই তার অগ্রাধিকারের তালিকায় বাংলাদেশের নাম না থাকারই কথা। তবে এটা সত্য, 'অনুপ্রবেশকারী'র বিষয়টিতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে। এই প্রশ্নে কেন্দ্র যদি স্ট্যাটাসকো বজায় রাখে তা দুই দেশের জন্য মঙ্গলই ডেকে আনবে। তথাকথিত 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের' জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বরং সৃষ্টি হবে আস্থাহীনতার, যা অমঙ্গলই ডেকে আনবে।
Daily SAMOKAL
04.06.14

0 comments:

Post a Comment