রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসবাদী হামলা কী বার্তা দেয়


Image result for Terror in Colomboশ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও শহরতলির তিনটি গির্জা ও দেশের বড় বড় তিনটি হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে এই হামলা কী বার্তা দিয়ে গেল? শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে এত বড় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অতীতে কখনো হয়নি। এটা ঠিক শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে একটা ‘কালো অধ্যায়’ আছে। শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগারদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের কারণে ইতিহাস শ্রীলঙ্কার ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট করেছিল। ১৯৮৪-৮৫ সালে শ্রীলঙ্কার তামিলরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল। ২০০৯ সালে তামিল টাইগার নেতা প্রভাকরনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তামিলদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অবসান ঘটে। দীর্ঘ ২৫ বছরের সশস্ত্র সংগঠনে তামিল টাইগাররা একাধিকবার আত্মঘাতী হামলা পরিচালনা করেছে। তামিলদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী পর্যন্ত মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে আর আত্ম্ঘাতী বোমা হামলার তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় না। সুতরাং হঠাৎ করেই আবার যখন শ্রীলঙ্কায় আত্মঘাতী বোমা হামলা হলো, তখন প্রশ্ন উঠেছে এই সন্ত্রাসী হামলার পেছনে কারা রয়েছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী? অনেকের দৃষ্টি এখন ইসলামিক স্টেটের দিকে, যারা ঘোষণা দিয়েছিল ক্রাইস্টচার্চের ৫০ জন মুসলমানের হত্যায় তারা বদলা নেবে। শ্রীলঙ্কায় ২৯০ জন মানুষকে হত্যার মধ্যদিয়ে কিংবা ৩টি চার্চে হামলার মধ্যদিয়ে আইএস কি সেই প্রতিশোধই নিল? ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল তওহিদ জমিয়াত’ নামে একটি মুসলমান প্রধান সংগঠনের নাম পাওয়া যায়, যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে। ‘ন্যাশনাল তওহিদ জমিয়াত’ বা এনটিজে আইএস-এর আদর্শ ধারণ করে। আইএস-এর পূর্বসূরি হচ্ছে এনটিজে।
মুসলমানদের বলা হয় শ্রীলঙ্কার ‘ভূমিপুত্র’ অর্থাৎ আদি বাসিন্দা। অতীতে শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু ২০১৪ সালে সিরিয়া-ইরাকে আইএস-এর উত্থানের পর পরই সারা বিশে^ই সন্ত্রাসবাদের ধারণা পাল্টে গেছে। বিশ্বে ‘ইসলামিক খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার মতবাদে উদ্ভূত হয়ে তরুণ প্রজন্ম, যারা মুসলমান, তারা সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িত করেছেন। মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে এর প্রেক্ষাপটেই জন্ম হয়েছে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী সংগঠন, যারা সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই ‘ইসলামিক আদর্শ’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শ্রীলঙ্কায় এনটিজের উত্থান এভাবেই। এখন তদন্তেই বেরিয়ে আসবে এইসব হামলার সঙ্গে আইএস জড়িত ছিল কি না। তবে এদের সঙ্গে আইএস-এর কোনো যোগসূত্র নেই কিংবা আইএস এদের উৎসাহিত করেনি এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- করতে, তা বলা যাবে না। আগামীতে যদি আইএস-এর পক্ষ থেকে এই সন্ত্রসাী কর্মকান্ডে তাদের জড়িত থাকার কথা ঘোষণা করা হয় আমি অবাক হব না।
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর শ্রীলঙ্কায় যখন স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল, ঠিক তখনই এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- শ্রীলঙ্কার জন্য কোনো ভালো খবর নয়। গৃহযুদ্ধের পর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে ৪২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ বিলিয়নে। শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে (প্রতি মাসে) ৫ গুণ। ২০০৯ সালে যে সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারে, ২০১৮ সালে তা বেড়েছে ২ লাখ ৫০ হাজারে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কাতেই মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি। এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদেশি পর্যটকদের শ্রীলঙ্কায় আসা বন্ধ হয়ে যাবে, যাতে করে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও দুটি ইসলামিক সংগঠন (শ্রীলঙ্কার) ‘দি মুসলিম কাউন্সিল অব শ্রীলঙ্কা’ ও ‘আল সিলোন জমিয়াতুল উলেমা’ এই সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের নিন্দা করেছে। যদিও শ্রীলঙ্কার শীর্ষস্থানীয় ক্রিশ্চিয়ান ধর্মীয় নেতা ‘শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে উগ্র বৌদ্ধ সংগঠন রয়েছে। তারা এটাকে ইস্যু করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে। এ দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- শুধুমাত্র শ্রীলঙ্কা তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি ‘ওয়েক আপ’ ফলই নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। অতীতে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড সংঘটিত হয়েছে। তবে আমাদের ‘কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট’কে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এই সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে, এটা বলা যাবে না, তবে অনেক ক্ষেত্রেই নির্মূল হয়েছে। ইসলামের নামে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে কোনো কোনো ওয়াজ মাহফিল, এমন অভিযোগও শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে মনিটরিং বাড়ানো দরকার। তরুণ প্রজন্ম যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যাতে শ্রীলঙ্কার ঘটনাবলিকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি না ছড়ানো হয়, সে ব্যাপারে তৎপর হওয়া জরুরি।
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের মাত্রা কমেছে, এটা বলা যাবে না। গবেষকদের তথ্যমতে গত ৪ মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ২৬৪টি সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেছে। এইসব সন্ত্রাসবাদী কর্মকাকান্ডে সঙ্গে আল সামাজ (সোমালিয়া), তালিবান (আফগানিস্তান), ইসলামিক স্টেট (আফগানিস্তান), দোজো মিলিশিয়া (মালি), জইশ-ই-মোহাম্মদ (কাশ্মীর), তেহরিক-ই-তালিবান (পাকিস্তান), বোকো হারাম (নাইজেরিয়া), আল-কায়েদা (ইয়েমেন), বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি বেলুচিস্তান) জড়িত। তবে সবচেয়ে বেশি  সন্ত্রাসবাদী কর্মকাকান্ডের সঙ্গে জড়িত আইএস ও তালিবান। এরা সবাই ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে তাদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডে। এসব এর সঙ্গে যুক্ত হােল শ্রীলঙ্কার নাম। অতীতে শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিল তামিল টাইগাররা। এখন সেটা অতীত। এখন যুক্ত হলো ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। এটা শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। তবে লক্ষণীয় শ্রীলঙ্কার এই জাতীয় সংকটে সরকারি দল, বিরোধী দল, জাতীয় গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী সবাই ন্যূনতম ইসু্যুতে একত্রিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার স্থিতিশীলতার জন্য এটা ভালো খবর। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না জঙ্গিবাদ এখনো একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ইসলামিক স্টেটের উত্থান (২০১৪) ও পতনের মধ্য দিয়ে ইসলামিক জঙ্গিবাদের অবসান হয়েছে, এটা আমার মনে হয় না। বরং খোঁজ নিলে দেখা যাবে আইএস-এর সঙ্গে যেসব জঙ্গি সেখানে যুদ্ধ করেছিল এবং যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে স্থানীয় জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যাহত রাখছে। ফিলিপাইনের মিন্দানাও প্রদেশে ইসলামিক জঙ্গিরা আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে আইএস জঙ্গিরা মারাভি নামে একটি শহর দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ ৫ মাস মারাভি দখল করে সেখানে তারা ইসলামিক শাসন চালু করেছিল। পরে  অবশ্য মারাভি জঙ্গিমুক্ত হয়েছে। সাধারণত আইএস স্থানীয় জঙ্গিদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ে আবু  সায়াফ গ্রুপ, আনসার খলিফা ফিলিপাইনস, মাউটে গ্রুপÑ এদের সঙ্গে আইএস রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলেছে। আর এরাই সেখানে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণে তিনটি প্রদেশ ইয়ালা, নারাথিওয়াট ও পাটানিতে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- চলছে এবং এর পেছনে আইএস-এর ইন্ধন আছে। দুটি সংগঠনের কথা জানা যায় Barisan Revolusi Nasional Malayu Patani র সশস্ত্র শাখা Runda Kumpulan Kecil, Gerakan Mujahideen IslamPatani।  এরা আইএস-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইন্দোনেশিয়াতেও আইএস-এর সমর্থিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো (লস্কর জিহাদ, জামিয়া ইসলামিয়া, ইসলামিক ডিফেনডার্স ফ্রন্ট) তৎপর। জা’মা আনসারুট দাওলাকে প্রো-আইএস বলে ধরে নেওয়া হয়। তুলনামূলক বিচারে মালয়েশিয়াতে ইসলামিক জঙ্গিদের তৎপরতা কম।
বিশ্বব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। ১৭ বছর পর সেই যুদ্ধের শেষ হয়নি। পাঠকদের কিছু তথ্য দিই, যাতে বোঝা যাবে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এ যাবৎ কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের পেছনে এ যাবৎ খরচ হয়েছে ৪ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই যুদ্ধে ১৪৫৫৫৯০ জন ইরাকি মারা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মারা গেছে ৪৮০১ জন সেনা আর আন্তর্জাতিক ফোর্সের মৃত্যুর সংখ্যা ৩৪৩০ জন (Information Clearing House, April 20, 2019)। চিন্তা করা যায় যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ঘণ্টায় খরচ হয় ১ মিলিয়ন ডলার। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর কারণেই পৃথিবীর মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোতে জন্ম হয়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলোর। আর আইএস এদের উৎসাহিত করছে জঙ্গিবাদ অব্যাহত রাখতে।
শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিল। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা সরকার স্বীকার করেছে (National Towheeth Jam'ath_ NTJ )  এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে। তবে এর পেছনে রয়েছে আইএস। আমাদের দেশের জন্যও এটা একটা সতর্ক সংকেত। বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী আছে। তবে এদের তৎপরতা এখন নেই। অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকান্ডের কারণে। তবে আমাদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো দরকার। জঙ্গিরা ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের নামে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। সন্ত্রাসী দমনে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো। শ্রীলঙ্কা আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে।
Daily Desh Rupantor
23.04.2019

0 comments:

Post a Comment