স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে গুলজারিলাল নন্দ দু’বার (২৭ মে-৯ জুন ১৯৬৪ এবং ১১ জানুয়ারি-২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬) অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ভিপি সিংয়ের শাসনামল ছিল ৩৪৩ দিনের। তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে গিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। অন্যদিকে বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ীর প্রথম টার্ম ছিল মাত্র ১৬ দিনের। কিন্তু দ্বিতীয়বার তিনি দীর্ঘ ৬ বছর ৬৪ দিন ক্ষমতায় ছিলেন (১৯ মার্চ ১৯৯৮-২২ মে ২০০৪)। ভারতের দীর্ঘ ৭২ বছরের রাজনীতিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস দেশটি শাসন করেছে। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পতনের মধ্য দিয়ে জনতা দল ক্ষমতাসীন হয়েছিল। কিন্তু জনতা দল একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মোরারজি দেশাই ছিলেন প্রথম জনতা দলের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ২ বছর ১১৬ দিন (২৪ মার্চ ১৯৭৭-২৮ জুলাই ১৯৭৯)। তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। দেশাই পদত্যাগ করলে চরণ সিং প্রধানমন্ত্রী হন (১৭০ দিন)। তিন ছিলেন জনতা পার্টির নেতা (পরবর্তী সময়ে লোকদল গঠন করেন)। জনতা দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব পুনরায় কংগ্রেস তথা ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আততায়ীর হাতে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর (১৯৮৯) পুনরায় জনতা দল ক্ষমতাসীন হয়। দলটি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ভিপি সিং (জনতা দল), চন্দ্রশেখর (সমাজবাদী জনতা দল), দেবগৌড়া (জনতা দল-সেকুলার), আইকে গুজরাল (জনতা দল)- সবাই যথাক্রমে ৩৪৩ দিন, ২২৩ দিন, ৩২৪ দিন ও ৩৩২ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৃত অর্থেই বিজেপির উত্থান ঘটে অটল বিহারি বাজপেয়ীর আমলে (১৯ মার্চ ১৯৯৮-২২ মার্চ ২০০৪)। সেই রাজনীতির ধারাবাহিকতায় মোদি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। অটল বিহারি বাজপেয়ীর পর অবশ্য ড. মনমোহন সিং দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
এখন কতদূর যেতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি? নির্বাচনের আগে তিনি ‘সাম্প্রদায়িক কার্ড’ ব্যবহার করেছেন। প্রচণ্ড মুসলমান বিদ্বেষকে পুঁজি করে তিনি যেতে চেয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে। তাতে তিনি সফল হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই রাজনীতি নিয়েই কি তিনি এগিয়ে যাবেন? নাকি একটি ‘লো-প্রোফাইল’ অবস্থান গ্রহণ করবেন? গত ২৫ মে তার এক বক্তব্য একটি আশার খোরাক জুগিয়েছে। সংসদের সেন্ট্রাল হলে পা রাখার ঠিক আগে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা সংবিধানের ওপর মাথা রেখে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস।’ ‘সবকা বিশ্বাস’ এটা নতুন মন্ত্র। এই বিশ্বাসটা মুসলমানদের। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানকে সাক্ষী রেখে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি যে, সব বর্গের মানুষকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। ধর্ম-জাতির ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ হবে না।’ (আনন্দবাজার, ২৬ মে)। তার এ বক্তব্যে মানুষ খুশি হবে। বিশেষ করে মুসলমানদের মাঝে যে ভয় জেগে গেছে, এ বক্তব্য তাদের হয়তো আশার বাণী শোনাবে। আবার এটাও সত্য, নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে একটা মুসলমান বিদ্বেষের ঢেউ তিন সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটা এখন তিনি কীভাবে কমাবেন? বিষয়টি অত সহজ নয়। তবে ভারত বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলেও সমাজে নানা সংকট রয়েছে। সমাজে জাত-পাতের বিভেদ অনেক বেশি। নিজে কৈশোরে চা বিক্রি করে এবং মা পরের বাড়িতে ঝি’র কাজ করে (টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, ৭ মে ২০১৫) যাদের সংসার চলত, সেই মোদি এখন কর্পোরেট জগতের বাসিন্দা। যখন বিদেশে যান, তখন সঙ্গে নিয়ে যান কর্পোরেট জগতের প্রতিনিধিদের। কিন্তু ভারতের জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনও গরিব। ৫৩ শতাংশের কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এ ‘কাজটি’ নিত্য সমাধান করেন। পরিসংখ্যান বলে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। প্রায় ৯ বছর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে (৮ সেপ্টেম্বর ২০১০) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে। ২০১৯ সালে এসে এতে খুব যে একটা পরিবর্তন এসেছে তা বলা যাবে না। শুধু দরিদ্রতা কেন বলি, প্রায় ৮০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার। ৭০ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেখানে অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৮৬টি হিসাব করে) ১৪৬, সেখানে ভারতের ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ হয়নি (পাঠক, উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের গ্রামের সত্য কাহিনী নিয়ে তৈরি সিনেমা ‘গুলাব গ্যাং’-এর কথা স্মরণ করতে পারেন)।
সড়ক, মহাসড়ক নির্মাণ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন মোদি। কিন্তু তাতে একদিকে যেমন দরিদ্রতা দূর হয়নি, অন্যদিকে তেমনি ব্যবসাবান্ধব একটি পরিবেশও তিনি তৈরি করতে পারেননি গত ৫ বছরে। IMD World Competitiveness Ranking 2019-এর তালিকায় ভারতের অবস্থান এখন ৪৩ (প্রথম সিঙ্গাপুর, দ্বিতীয় হংকং, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র)। ভারতের এ অবস্থান মালয়েশিয়া (২২তম) ও ব্রিটেনেরও (২৩তম) পরে। তিনি কাজপাগল মানুষ (মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমান- একথা স্বীকার করেছেন টাইম প্রতিবেদকের কাছে)। কিন্তু ভারতের বড় যে সমস্যা দরিদ্রতা, অসমতা, তা তিনি দূর করতে পারেননি। গত ৫ বছরে মোদি ৫৯টি দেশ সফর করলেও নিজ দেশের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন খুব কম। পরিসংখ্যান বলছে, ২ দশমিক ৮৪৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের। কিন্তু বেকার সমস্যা সেখানে প্রবল। কর্মজীবী মানুষের (যাদের বয়স ১৫-এর ওপরে) মাঝে ৫০ শতাংশের কোনো চাকরি নেই। ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫-এর নিচে। এদের চাকরি দরকার। বেকারত্বের হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিমাসে ১২ লাখ তরুণের জন্য কাজ দরকার। বিষয়টি নরেন্দ্র মোদির জন্য যে খুব সহজ, তা বলা যাবে না।
তার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে কৃষককে আস্থায় নেয়া। সাম্প্রতিকালে ভারতে সবচেয়ে বড় কৃষক আন্দোলন হয়েছে। কৃষককে সংগঠিত করে বাম সংগঠগুলো নয়াদিল্লিতে পর্যন্ত দীর্ঘ লংমার্চ করেছে। ঋণের ভারে কৃষক পর্যুদস্ত। তারা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। এ রকম ঘটনা একটি নয়, একাধিক। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী (৩ মে ২০১৭) বছরে ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে। সুপ্রিমকোর্টে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যার বিষয়টি যে কোনো সরকারের জন্যই একটি বিব্রতকর অবস্থা। মোদি সরকার তাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিটি কৃষক পরিবারকে ৬ হাজার রুপি করে দেয়ার। আর কংগ্রেসের প্রস্তাব ছিল অতি গরিব মানুষকে (২০ শতাংশ) বছরে ৭২ হাজার টাকা করে দেয়া। নয়া সরকারের জন্য এটি হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাপক শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে বড় ধরনের পানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর ২ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে মারা যায়। ২০২০ সালের মধ্যে ২১টি বড় শহরে পানি সংকট দেখা দেবে। ৭৫ শতাংশ মানুষ নিজ বাড়িতে সুপেয় পানি পায় না। আর ৭০ শতাংশ পানি দূষিত। সুচিকিৎসা ভারতের জন্য একটি বড় সমস্যা। National Health Profile 2018-এ দেখা যায়, ভারতের নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ধনী রাষ্ট্রগুলো ব্যয় করে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এমনকি নিুআয়ের দেশগুলোও ব্যয় করে প্রায় ২ শতাংশ। মোদি সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ- কী করে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। এজন্য বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার Ayushman Bharat প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যাতে করে একটি স্কিমের আওতায় নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হবে। কিন্তু এতে কতটুকু সফলতা পাওয়া যাবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। শিক্ষা নয়া সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতিবছর ‘জব মার্কেটে’ প্রবেশ করছে। কিন্তু তারা সুশিক্ষিত নয়। অথবা বলা যেতে পারে তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি।
সুতরাং মোদির জন্য রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যদূরীকরণ, মুসলমানদের আস্থায় নেয়া, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানো- এ কাজগুলো সহজ নয়। তথাকথিত নগরপুঞ্জির নাম করে মুলমানদের ‘অবৈধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা দু’দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। বাংলাদেশে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী এটা থেকে ‘ফায়দা’ ওঠাতে চাইবে। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মোদি নির্বাচনে সুবিধা নিয়েছেন। এখন তাকে হতে হবে বাস্তববাদী। তিনি বলেছেন বটে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’; তবে এ বক্তব্য যদি তিনি ধারণা করেন এখন, তবেই তিনি সফল হবেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সবার উন্নতি এবং সবার বিশ্বাস নিশ্চিত করাই তার মূল মন্ত্র। আগামী ৫ বছর তিনি যদি এটি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে ইতিহাসের খাতায় এক অবিসংবাদিত নেতা হয়ে থাকবেন। এখন দেখার পালা তার কথা ও কাজে কতটুকু মিল থাকে।
Daily Jugantor
31.05.2019









ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিজয়
তাকে জওয়াহেরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর পর তৃতীয় ভারতীয় নেতায় পরিণত
করেছে, যিনি পর পর দুবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে
যাচ্ছেন। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো যে ‘গেরুয়া ঝড়’ তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে
বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, সেই ‘ঝড়’কে তিনি এখন ‘মহাঝড়ে’ পরিণত করে ভারতের রাষ্ট্র
কাঠামোকে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিলেন। ভারতের সনাতন রাজনীতির যে চিত্রÑ
একটি বহুত্ববাদী সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষতা, সেই চিত্রকে পরিপূর্ণভাবে বদলে
দিয়ে মোদি এখন ভারতকে একটি অলিখিত ‘হিন্দুরাষ্ট্র’-তে পরিণত করতে যাচ্ছেন!
মোদি-অমিত শাহ জুটির সাফল্য এখানে যে, তারা ভারতের সাধারণ মানুষের ‘মাইন্ড
সেট-আপ’কে বদলে দিয়েছেন। রামমন্দির নির্মাণ করা, তথাকথিত নাগরিকপঞ্জির নাম
করে আসাম ও পশ্চিমবাংলা থেকে মুসলমানদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা, কিংবা
মুসলিম পারিবারিক আইনে পরিবর্তন আনা, সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ (ক) ধারায়
(কাশ্মীরকে বিশেষ স্ট্যাটাস দেওয়া) পরিবর্তনের প্রস্তাব, ভারতের সনাতন
রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে মিল খায় না। গেরুয়া ঝড় এখন ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে
ভারতকে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এখন ধীরে ধীরে পরিণত হতে যাচ্ছে একটি হিন্দুধর্ম
নির্ভর রাষ্ট্রে। ট্রাম্পের মতোই এক ধরনের পপুলিজম (ঢ়ড়ঢ়ঁষরংস) এর জন্ম
দিয়েছেন মোদি, যেখানে ধর্মকে তিনি ব্যবহার করেছেন।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন গত ১৫ মে। এইদিন
এলডিপি আয়োজিত ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি’ শীর্ষক এক
গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে জেলে থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে
আমাদের নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব নয়। লন্ডন থেকে তারেক রহমানের পক্ষেও
সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদেরই সেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং
আমি সেই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’ বিএনপির নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি
বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়েছি বিএনপিকে অনুরোধ করব আপনারা নেতৃত্ব দেন আর না
হলে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন।’
দলীয়
সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে
নির্বাচন বিএনপি তথা চারদলীয় জোট বয়কট করেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। সংসদীয়
রাজনীতির এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বড় দুটি দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক
থাকা জরুরি। তাতে করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু পরিবর্তিত
পরিস্থিতিতে এই আস্থার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কতটুকু গড়ে উঠবে, সেটিই বড় প্রশ্ন
এখন। একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি
করবেন। জাতীয় নেতাদের প্রতি সম্মান দেখানো, কোনো ধরনের বিরূপ মন্তব্য না
করা, বিএনপিকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়া—এসবই নির্ভর করে একটি আস্থার
সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখন উচ্চ আদালতের জামিন মঞ্জুর সাপেক্ষে এবং চিকিৎসকদের
মতামত অনুযায়ী খালেদা জিয়া যদি বিদেশে যান (?), তাহলে দলটি নেতৃত্বহীন
অবস্থায় কিভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। বিএনপি এখনই অনেকটা
নেতৃত্বহীন। দলটির স্থায়ী পরিষদের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। তরুণ
নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে জন্ম হচ্ছে না। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকারকে
চ্যালেঞ্জ করারও কেউ নেই। তাই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। এই যোগদান
রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন যদি ডেকে নাও আনে, বাস্তবতা হচ্ছে এই যোগদান
‘বিরোধী’ শিবিরে একটি বড় ‘সংকট’ তৈরি করেছে। মৌমাছিরা যেমনি একটি রানি
মৌমাছিকে কেন্দ্র করে একটি ‘চাক’ তৈরি করে, ঠিক তেমনি ছোট ছোট দলগুলো
বিএনপিকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক ‘চাক’ তৈরি করেছিল। ওই ছোট দলগুলোর
অনেকটিরই কোনো গণভিত্তি নেই। সংগঠনের অস্তিত্বও নেই। একজন আন্দালিব রহমান
পার্থ একাই ‘একটি দল’। দলটির নিবন্ধন আছে বটে, কিন্তু এর গণভিত্তি কই? কোন
কোন জেলায় কয়টি সাংগঠনিক কমিটি আছে? ব্যক্তি পরিচয়ে কোনো দল কখনো টিকে
থাকতে পারে না। রাজনৈতিক ‘কমিটমেন্ট’, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে
যোগাযোগ, সুস্পষ্ট রাজনীতি না থাকলে যেকোনো দল ‘কাগুজে সংগঠন’ হিসেবে
পরিচিতি পেতে বাধ্য। বিজেপি (পার্থর নেতৃত্বাধীন দল) এর ব্যতিক্রম নয়।
বিজেপি এত দিন ‘বড় মর্যাদা’ পেয়েছে বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করার
কারণেই। পারিবারিকভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর ছোট
ভাইয়েরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সুতরাং পার্থর ‘ইউটার্ন’-এ আমি
অবাক হইনি। এখন ২০ দলীয় জোটে যেসব দল আছে, তাদের পক্ষে বিএনপিকে বাদ দিয়ে
অন্য জোট গঠন করাও তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে চূড়ান্ত
বিচারে তারা বিএনপির নেতৃত্বেই আস্থাশীল থাকবে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ
নেওয়া ও সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ২০ দলীয় জোটের কেউ কেউ ‘আত্মহত্যা’ বললেও
আন্দালিব রহমান পার্থর মতো অন্য কেউই ‘সাহস’ করে জোট ছাড়ার কথা বলেননি। অলি
আহমদ নিজেই বলেছেন তিনি ২০ দলীয় জোটে থাকছেন। তবে আবারও আলোচনার জন্ম
দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী। ব্যক্তিনির্ভর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি
কাদের সিদ্দিকী ঐক্যফ্রন্টে অনেক অসংগতি রয়েছে এটি দাবি করে আগামী ৮ জুনের
মধ্যে সেসব অসংগতি দূর করার জন্য ড. কামাল হোসেনকে একটি ‘আলটিমেটাম’
দিয়েছেন। না হলে তিনি ও তাঁর দল ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করবে। এটি ঠিক ঐক্যফ্রন্ট
নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। ফ্রন্টের রাজনীতি স্পষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেনকে
সামনে রেখে কিছু দলছুট নেতা, যাঁদের আবার নিবন্ধনও নেই, তাঁরা ‘একটা বড়
কিছু’ প্রত্যাশা করেছিলেন। তাতে তাঁরা সফল হননি। দেখা গেল ফ্রন্টের
সিদ্ধান্ত কেউ কেউ মানছে না। সুলতান মনসুর তো ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে
নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে প্রকাশ্যেই বলেছেন, গণফোরামের রাজনৈতিক মতাদর্শ
তিনি ধারণ করেন না। ঐক্যফ্রন্টে রয়েছে হতাশা। তাঁদের অনেকের প্রত্যাশা পূরণ
হয়নি। আর এখন যদি কাদের সিদ্দিকী বেরিয়ে যান, তাহলে ঐক্যফ্রন্ট যে
অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। যদিও এটি সত্য, কৃষক
শ্রমিক জনতা লীগের কার্যক্রম বেশি মাত্রায় টাঙ্গাইলকেন্দ্রিক।
গত ১১ এপ্রিল সাত পর্যায়ে ভারতের লোকসভার যে নির্বাচন শুরু হয়েছিল, তা
এখন শেষ পর্যায়ে। গত ১২ মে ষষ্ঠ দফা নির্বাচন শেষ হয়েছে। আগামী ১৯ মে
সর্বশেষ সপ্তম ধাপের লোকসভার সর্বশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন
বিহারের আটটি, চ-ীগড়ের একটি, হিমাচলের চারটি, ঝাড়খ-ের ১৪ আসনের তিনটি ও
মধ্যপ্রদেশের ২৯ আসনের আটটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে
২৩ মে ভোট গণনা শুরু হবে এবং এর পরপরই এটা নিশ্চিত হয়ে যাবে কে হতে যাচ্ছেন
ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের গুরুত্ব
একেবারে কম নয়। মোদি জমানায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে
উন্নীত হয়েছে। মোদি নিজে ঢাকা সফর করে গেছেন। মোদি তার ‘নেইবারহুড ফাস্ট’
পলিসির আওতায় বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে যে
প্রশ্নটি অনেকে করার চেষ্টা করেন, তা হচ্ছে মোদি তথা এনডিএ জোটের বাইরে
অন্য কেউ যদি সরকার গঠন করে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন
পর্যায়ে উন্নীত হবে? নয়া নেতৃত্ব কী এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবেন,
নাকি সম্পর্কের মধ্যে একটা আস্থাহীনতার সৃষ্টি হবে? এনডিএ জোট কিংবা ইউপিএ
জোটের বাইরে তৃতীয় একটি শক্তির নেতৃত্বে যদি সরকার গঠিত হয়, সে ক্ষেত্রে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেমন হবে, যদিও জনমত জরিপের পাল্লা এখনো মোদি তথা
এনডিএ জোটের দিকেই ঝুঁকে আছে, তারপরও আঞ্চলিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি তৃতীয়
শক্তির (কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের বাইরে) উত্থানের সম্ভাবনা
একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী নিজে আগ্রহ
প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা
ব্যানার্জি বলেছেন, তৃণমূলকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রে কোনো সরকার গঠন করা যাবে
না। আর অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, যিনি আঞ্চলিক দল
তেলেগু দেশম পার্টির নেতাও বটে। তিনি বলেছেন মমতা ব্যানার্জি হবেন ভারতের
পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে সেখানে।
হঠাৎ করেই চলমান রাজনীতি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপির
সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দেবেন কি দেবেন না—এটি নিয়ে যখন বড় ধরনের ‘কনফিউশন’
তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই নির্ধারিত ৯০ দিন শেষ হওয়ার ঠিক আগে বিএনপির চারজন
সংসদ সদস্য শপথ নিলেন। এর আগে নিয়েছিলেন একজন। মির্জা ফখরুল শপথ না নেওয়ায়
তাঁর আসন শূন্য হয়েছে এরই মধ্যে। তিনি অবশ্য সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদ
সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের
নির্দেশেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দিয়েছেন। এর আগে জাতীয়
ঐক্যফ্রন্টের হয়ে গণফোরামের দুজন সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন।
বিএনপির সংসদ অধিবেশনে যোগদান নিঃসন্দেহে আলোচনার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে
দেবে। আলোচনায় আরো আছে জামায়াতের সংস্কারবাদীদের নতুন দল ঘোষণার সিদ্ধান্ত।
আলোচনায় এ বিষয়ও থাকবে। এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে আরো যোগ হয়েছে ঢাকায় একটি
অঞ্চলে জঙ্গিদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ। ২৯ এপ্রিল ঢাকার বসিলায়
জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার একটি উদ্যোগ র্যাব নস্যাৎ করে দিয়েছে। এর আগে
সংবাদপত্রে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল যে বাংলাদেশে হামলার পরিকল্পনা করছে
আইএস। ঘর-সংসার ছাপিয়ে গেছে বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সংবাদে। এমনকি খালেদা
জিয়ার প্যারোলে ‘মুক্তি’ পাওয়ার বিষয়টিও এখন ‘চাপা’ পড়ে গেছে। মজার বিষয়
হচ্ছে, একজন ‘সুস্থ’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন সংবাদ সম্মেলনে
জানালেন, বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নির্দেশেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা
শপথ নিয়েছেন তখন অনেকেই এর সঙ্গে ‘অন্য কিছু’ মেলাতে চাইবেন। মির্জা
ফখরুলের আসন শূন্য হয়েছে। সেখানে উপনির্বাচন হবে। খালেদা জিয়ার প্যারোলে
মুক্তির বিষয়টিও এখন সামনে আসছে। তাহলে কি খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি
পেতে যাচ্ছেন? এই সংসদ আগামী পাঁচ বছর থাকবে। এর অর্থ বিএনপিতে এখন খালেদা
জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে নতুন নেতৃত্ব আসছে।




