রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

বিএনপির গণঅনশনে

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অত সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনী আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সংবিধান রেখে কোনো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব কে আনবে? সরকার? বিরোধী দল? নাকি সরকারের কোনো \'বন্ধু\'? এটা তো ঠিক, বিরোধী দল কোনো সংশোধনী আনলে তা সংসদে পাস করানো যাবে না। তাদের সেই \'সংসদীয় ক্ষমতা\' নেই। একমাত্র সরকার যদি \'সিদ্ধান্ত\' নেয়, তাহলেই সংবিধান সংশোধনী আনা সম্ভব। সরকার নীতিগতভাবে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জোটভুক্ত কোনো \'দল\'কে দিয়ে এ ধরনের একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করতে পারে

বিএনপি এবং ১৮ দলের গণঅনশনের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এরপর কী? এরপর কী কর্মসূচি নেবে বিরোধী দল? ইলিয়াস আলীর \'গুম\' হওয়ার ঘটনায় ৫ দিন হরতাল পালন করল বিএনপি। তারপর কাটল অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনা_ বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় ৩৩ নেতাকে জেলে পাঠানো হলো জামিন না দিয়ে। প্রতিবাদে এবার হরতাল হলো না বটে, কিন্তু গণঅনশন হলো। এটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। হরতাল নিয়ে নানা মহলের আপত্তি। ব্যবসায়ীরা কখনও হরতাল চান না। খোদ হিলারি ক্লিনটনও বলে গেলেন হরতাল না দেওয়ার জন্য। এখন কী করবে বিএনপি? স্পষ্টতই সরকার হার্ডলাইনে গেছে। এতে করে সরকারের \'অর্জন\' কতটুকু সে ব্যাপারে অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে, তবে সাধারণ মানুষ যে এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে থাকে, তা তো স্পষ্ট।
 সরকারের এই হার্ডলাইনের পলিসি রাজনীতির সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। ভবিষ্যতে যারাই ক্ষমতায় যাবেন, তারাও এই \'মডেল\' অনুসরণ করবেন। এতে করে সুস্থ রাজনীতি বিকশিত হবে না। বিএনপি \'বিপদে\' আছে, সেটা স্পষ্ট। ব্যক্তিনির্ভর ১৮ দল নিয়ে বিএনপি খুব লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। এই ১৮ দলের অনেকটির নাম আমি নিজেও জানি না, নেতাদের নাম তো পরের কথা। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম একটি শক্তি। তাদের অনেকেই এখন ভোটার। নিউইয়র্কের \'অকুপাই মুভমেন্ট\' থেকে \'আরব বসন্ত\' প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণরা আন্দোলনকে সংগঠিত করেছে। বাংলাদেশের এই তরুণ সমাজের কাছে বিএনপি কি কোনো ম্যাসেজ পেঁৗছে দিতে পেরেছে? বিএনপির যে তরুণ নেতৃত্ব তারা কি এই কাজটি করতে পেরেছেন?
সরকারের বিপক্ষে বলার অনেক কিছু আছে। অর্থনীতির সূচকগুলো কোনো আশার কথা বলে না (গড়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি ১০.৮৬ শতাংশ, রফতানি আয় বৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ৪১.৪৭ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে মাত্র ৮.৪১ শতাংশ। অথচ আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১১.২২ শতাংশ। টাকার মান কমেছে)। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা হয়নি। ইলিয়াস আলী আদৌ বেঁচে আছেন কিনা সেটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই রয়েছে। এখন যুক্ত হলো ৩৩ জন শীর্ষস্থানীয় নেতার জেলে প্রেরণের ঘটনা। আইন তার নিজ গতিতেই চলবে এবং আইনের বিচারেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু আস্থার একটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে_ তা আমরা পূরণ করব কীভাবে? পরবর্তী সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে গেছেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেছেন, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। 
এই অভিমতের সঙ্গে সুশীল সমাজের অনেকেই একমত। এমনকি অধ্যাপক ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদও একই অভিমত দিয়েছিলেন। যদিও এর আগে ড. কামাল হোসেন কিংবা ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও একই ধরনের অভিমত দিয়েছিলেন। সরকার তাতে আদৌ গুরুত্ব দেয়নি। এখন হিলারি ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ড. ইউনূস ও আবেদ যখন একই অভিমত দিলেন তখন সরকার এটাকে গুরুত্ব দিলে ভালো করবে। ধারণা করছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায় একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক। বর্তমান সরকার তাদের ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসেছে। গত ৪০ মাসে তারা কতটুকু তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছে, তার ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই মঙ্গল। এ ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ সরকারের হাতে নির্বাচন পরিচালনার ভার দিলে তাতে ক্ষতির কিছু নেই। বরং আমার বিশ্বাস, সরকারের জনপ্রিয়তা তাতে বাড়বে। যদিও বিএনপির দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অত সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনী আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সংবিধান রেখে কোনো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব কে আনবে? সরকার? বিরোধী দল? নাকি সরকারের কোনো \'বন্ধু\'? এটা তো ঠিক, বিরোধী দল কোনো সংশোধনী আনলে তা সংসদে পাস করানো যাবে না। তাদের সেই \'সংসদীয় ক্ষমতা\' নেই। একমাত্র সরকার যদি \'সিদ্ধান্ত\' নেয়, তাহলেই সংবিধান সংশোধনী আনা সম্ভব। সরকার নীতিগতভাবে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জোটভুক্ত কোনো \'দল\'কে দিয়ে এ ধরনের একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। 
ওয়ার্কার্স পার্টি কিংবা জাসদ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সমর্থন করে। তারাও একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার \'ওয়াল-ইলেভেনে\'র সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো হবে না। এর একটি নতুন কাঠামো দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন \'ফর্মুলা\' নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এক. ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের যৌথ নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যাদের দায়িত্ব হবে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা। কোনো উপদেষ্টা থাকবেন না। সচিবরা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন পরিচালনা করবেন। এই সরকার নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
দুই. ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের নেতৃত্বে একটি সরকার। ব্যারিস্টার হক দুটি দলেরই \'বন্ধু\' এবং দুই দলীয় প্রধানের কাছেই গ্রহণযোগ্য। তিন. প্রধান বিচারপতি অথবা সংসদের বর্তমান স্পিকারকে প্রধান করে সরকার ও বিরোধী দলের ৫ জন করে প্রতিনিধি নিয়ে (যারা নির্বাচন করতে পারবেন না। স্পিকারও নির্বাচন করবেন না) ৩ মাসের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যাদের দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজন করা। চার. একটি \'এলডার্স কাউন্সিল\' গঠন, যাদের দায়িত্ব হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা। এই \'এলডার্স কাউন্সিল\' যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। সদস্যসংখ্যা তিন থেকে চারে হতে পারে। সাবেক তিন প্রধান বিচারপতি তিনজন গুণী ব্যক্তি অথবা তিনজন সাংবিধানিক পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকে নিয়েও এই \'এলডার্স কাউন্সিল\' গঠিত হতে পারে। এ ধরনের যে কোনো \'ফর্মুলা\' সংবিধানের কোনো অংশ হবে না। সংসদে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেও এটি করা সম্ভব। তবে বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করা যেতে পারে।
সরকার বারবার বলছে, তারা গত ৪০ মাসে যেসব কর্মসূচি নিয়েছে তাতে জনগণের স্বার্থ নিহিত রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো (?) থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত_ প্রতিটি সিদ্ধান্তই জনস্বার্থে করা। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে তাদের ভয় থাকার কথা নয়। জনস্বার্থে হলে জনগণই তাদের পুনরায় ক্ষমতায় বসাবে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যদি না হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। সমুদ্রে আমাদের অধিকার রক্ষিত হওয়ায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি আইওসির আগ্রহ বেড়েছে। তারা বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু এর জন্য চাই পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই স্থিতিশীলতা বিঘি্নত হলে বিনিয়োগ আসবে না। অর্থনীতি সচল হবে না। এমনকি গরিব দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্ট থেকে যে সাহায্য পায়, আমরা সেই সাহায্যও পাব না স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে। হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো নয়। প্রয়োজন সমঝোতার। প্রয়োজন একটি সংলাপের।
Daily SAMAKAL
27.5.12

0 comments:

Post a Comment