রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

পরাশক্তির 'প্রক্সিওয়ার'

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীকবলিত এলাকায় একটি যাত্রীবাহী মালয়েশিয়ান বিমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই পরাশক্তির মাঝে এক ধরনের 'প্রস্ক্রিওয়ার' এর সম্ভাবনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ১৬ মার্চ ক্রিমিয়ায় গণভোট ও রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি, রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, ইউক্রেন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য ইত্যাদি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আর সর্বশেষ ঘটনায় যোগ হলো মালয়েশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা 'ভুল করে' এ যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট ওবামা ওই ঘটনার জন্য পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে দায়ী করেছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এ হামলায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ শনিবার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নেদারল্যান্ডস জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ইউক্রেনের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিল হচ্ছে। নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছে, যাকে অভিহিত করা হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ-২ হিসেবে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকান্ডের কারণে এ অঞ্চলে এক ধরনের উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ কিংবা রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে ন্যাটোর সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এবং রাশিয়াকে 'ঘিরে ফেলার' সদূরপ্রসারী মার্কিন চক্রান্তের কারণে এ অঞ্চলে উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ জর্জিয়া ও ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। ২০০৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার সীমিত যুদ্ধের (ওসেটিয়া প্রশ্নে) কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। 'ব্লাক সি'র অপর পাশের দেশগুলো (বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, রুমানিয়া) এরই মধ্যে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে। তুরস্ক ও গ্রিস আগে থেকেই ন্যাটোর সদস্য। জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনও ন্যাটোর সদস্য নয়। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, ইউক্রেন সঙ্কটের জন্ম হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের উৎখাতের মধ্য দিয়ে। গণঅভ্যুত্থানে তিনি উৎখাত হলেও অভিযোগ আছে, তার উৎখাতের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। রুশপন্থী ওই নেতা ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তারপর ঘটল ক্রিমিয়ার ঘটনা। ক্রিমিয়ার ঘটনায় রাশিয়াকে জি-৮ থেকে বহিষ্কার ও দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নের সমাধান এখনও হয়নি তা হচ্ছে, রাশিয়াকে 'বয়কট' করে পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাবে কীভাবে? সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বটে; কিন্তু পুরো ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে? কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করার। কিন্তু বাস্তবতা কী তা বলে? পাঠকমাত্রই জানেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে সমগ্র পূর্ব ইউরোপ, যে দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাবে ছিল, তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরিপূর্ণভাবে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের রিজার্ভ হচ্ছে রাশিয়ায়। মূলত তিনটি পথে এ গ্যাস যায় ইউরোপে। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বস্নকে ছিল, তারাও এখন জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। তিনটি পাইপলাইন, নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বছরে ৫৫ মিলিয়ন কিউসিক মিটার (বিসিএম), বেলারুশ লাইনে সরবরাহ করা হয় ৩৬ বিসিএম আর ইউক্রেন লাইনে সরবরাহ করা হয় ১০৭ বিসিএম। এখন ইইউর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া যদি এ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক বড় ধরনের জ্বালানি সঙ্কটে পড়বে ইউরোপ। যদিও রাশিয়ার বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এ গ্যাস বিক্রি। এটা সত্য, রাশিয়া অত্যন্ত সস্তায় বেলারুশ ও ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ দেশ দুটি আবার রাশিয়ার গ্যাসের রিজার্ভ গড়ে তুলে সরাসরি পশ্চিম ইউরোপে তা বিক্রি করে কিছু 'আলাদা অর্থ' আয় করে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৯ সালে ইউক্রেন ও বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হয়েছিল 'গ্যাসওয়ার' অর্থাৎ গ্যাসযুদ্ধ। ইউক্রেনে অত্যন্ত সহজ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করত রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেন অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইউরোপে একটি সঙ্কট তৈরি করে। শুধু গ্যাস নয়, রাশিয়া বেলারুশকে সস্তা দামে তেলও দেয়। ওই তেল আবার বেলারুশ অধিক মূল্যে ইউরোপে বিক্রি করে। Druzhba  অথবা Friendship পাইপলাইনের মাধ্যমে এ গ্যাস ও তেল সরবরাহ করা হতো। বেলারুশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়েছিল। তারা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। রাশিয়া পাইপলাইনে গ্যাস ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন আঙ্গিকে এ 'গ্যাসওয়ার' শুরু হওয়ার একটা সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা 'গ্রাসপ্রোম' ইউক্রেনের কাছে পাবে ২ বিলিয়ন ডলার। এ টাকা ইউক্রেন পরিশাধ করতে পারছে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নামে আইএমএফের কাছ থেকে ইউক্রেনের যে বিলিয়ন ডলার অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তাতে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে সমগ্র ইউরোপে (সমগ্র ইইউর গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ জোগান দেয় রাশিয়া আর জার্মানি দেয় ৪০ ভাগ)। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ২২ বছর পর নতুন করে আবার দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাশিয়া চায় এ অঞ্চলের ওপর তার যে পরোক্ষ 'প্রভাব', তা বজায় রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে রাশিয়ার এ 'প্রভাব' কমাতে। ফলে নতুন করে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। নতুন করে একটি প্রশ্ন উঠেছে- রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা অর্থহীন। রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়েই ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ন্যাটোকে রাশিয়ার পরামর্শকের ভূমিকা দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২৭ মে প্যারিসে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ও সার্বেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সেইসঙ্গে ন্যাটো সদস্যভুক্ত অন্য দেশের সরকারপ্রধানরাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়াকে একটি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অনেকটা সেই 'কনটেইনমেন্ট থিউরির' মতো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণসাগর বা বস্নাক সির পশ্চিমে রুমানিয়ার মিখাইল কোগলেনাইসেআনুতে রয়েছে ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। আফগানিস্তানে সেনা ও রসদ সরবরাহের জন্য এ বিমান ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। গেল বছর কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই চাইছে জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগ দিক। এটা যদি হয়, তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে মার্কিন সেনাবাহিনী। রাশিয়ার সমরনায়করা এটা মানবেন না। আজকে ইউক্রেনের পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, এ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন-সবকিছুতে ক্রমেই মার্কিনি স্বার্থ স্পষ্ট হচ্ছে। এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলকৃত পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেন সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রেখেছে। রাশিয়ার প্রবল আপত্তির মুখে এ অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ৭ এপ্রিল সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুধু পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওডেসায় কমপক্ষে ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। পূর্বাঞ্চলের আরেকটি শহর ক্রামাটোরস্কে ঘরে ঘরে লড়াই চলছিল। ওই 'গৃহযুদ্ধ' শুধু যে ইউক্রেনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা বলা যাবে না। ওই পরিস্থিতি সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন পর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে একটা 'প্রস্ক্রিওয়ার' এর জন্ম দিয়েছে। এ 'যুদ্ধে' কোন পক্ষ জয়ী হবে, এটা আশা করাও ঠিক হবে না। বরং এ উত্তেজনায় বিশ্বের অন্যত্র অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। এমনিতেই বিশ্ব পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। গাজায় ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি চরমে উঠেছে। বিশ্ব সম্প্রদায় সেখানে একরকম নিশ্চুপ। এমনকি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এ গণহত্যা বন্ধের ব্যাপারে জাতিসংঘের কোনো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হয়নি। সেখানে শিশু ও নারী হত্যার ঘটনা প্রতিদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে, সেখানে পশ্চিমা বিবেক নিশ্চুপ! গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কথাও চিন্তা করছে না। গাজায় এ গণহত্যার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরাসরিভাবে দায়ী। আজকে বসনিয়ার গণহত্যাকারীদের কিংবা রুয়ান্ডার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের যদি দি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার হতে পারে, তাহলে আজকে গাজায় নিরপরাধ শিশু ও নারী হত্যাকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি সেনা নেতৃত্বেরও বিচার হওয়া উচিত। আজকে মার্কিন নেতারা বলছেন, যারা মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ১৭-এর বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু তাদের মুখ থেকে একবারও বের হলো না, গাজার হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। আসলে সেই ক্ষমতা মার্কিন নেতাদের নেই। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি লবি দ্বারা চালিত। তাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক উৎস হচ্ছে ইহুদি লবি। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ফিলিস্তিনি এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেননি! তিনি তার পররাষ্ট্র সচিবকে ওই এলাকায় পাঠিয়েছিলেন, এটা সত্য। কিন্তু ওই পর্যন্তই। 'লোক দেখানো' একটি দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাকে দেখি মালয়েশিয়ান বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় অতি দ্রুত রাশিয়ার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে। অথচ এ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় কারা সত্যিকার অর্থে জড়িত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ ঘটনায় ২৯৫ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন, এটা নিঃসন্দেহে একটা দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু কারা দোষী? ওবামা নিজে ইউক্রেনের বিদ্রোহীদের দিকে আঙুল নির্দেশ করেছেন। কিন্তু সাধারণত যাত্রীবাহী বোয়িং বিমানগুলো ৩৩ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে যায়। ওই বিমানকে আঘাত করার সক্ষমতা বিদ্রোহীদের না থাকারই কথা। তবে মালয়েশিয়ান এক মন্ত্রী বলেছেন, তাদের কাছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে জাপানি এক মেজরের কথোপকথনের অডিও টেপ রয়েছে। তার দাবি, এ ঘটনায় ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দায়ী। আসলে প্রকৃত তদন্ত ছাড়া এটা প্রমাণ করা যাবে না যে, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় কারা জড়িত। রাজনীতিতে 'ষড়যন্ত্রতত্ত্ব' নামে একটি তত্ত্ব আছে। সাধারণত বৃহৎ শক্তিগুলো একটা 'ঘটনা' থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে নেয়ার জন্য আরেকটি 'ঘটনার' জন্ম দেয়। এটা এমনও হতে পারে, গাজার হত্যাকান্ড থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। অথবা সিরিয়া-ইরাকের পরিস্থিতিকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেও এ ঘটনা ঘটানো হতে পারে। এসবই ধারণা মাত্র। তবে এটা সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মার্কিনি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে একটা জনমত তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করছে। রাশিয়ার ভূমিকা অতীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কোনো কোনো বিশ্লেষকের লেখনীতে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর কথাও বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া এক ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এ প্রতিযোগিতা হচ্ছে প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা। প্রতিটি ক্ষেত্রে এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ্য করি। এরই মধ্যে 'ব্রিকস' সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কতৃত্ব খর্ব করার লক্ষ্যে বিকল্প একটি ব্যাংক গঠন করার। প্রস্তাবিত ব্যাংকটির নাম দেয়া হয়েছে 'নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক'। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিক্রসের সদস্য। ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সদ্য শেষ হওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বে নতুন করে মেরুকরণ ঘটছে এবং উদীয়মান শক্তিগুলো একত্রিত হচ্ছে। এরা যে বিশ্বব্যাপী মার্কিনি খবরদারির বিরুদ্ধে একত্রিত হবে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ইউক্রেনের ঘটনাবলি দিয়েই শুরু হলো এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয়। Daily Alokito Bangladesh 23,07.14

0 comments:

Post a Comment