রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

পাহাড়ে অসন্তোষ কার স্বার্থে

গত ২৯ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করায় বাংলাদেশে নতুন করে আবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে 'আদিবাসী' বলে কিছু নেই। তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয়কে নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ৪ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলে অভিমত পোষণ করেছেন। তিনি এ কথা জানাতেও ভোলেননি যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। ইতিমধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ক্ষুদ্র নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিয়ে বই প্রকাশ করবে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে তথাকথিত আদিবাসী স্বীকৃতির নামে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থির করে তুলছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র। মানবসেবার নামে দেশও জাতির বিরুদ্ধে গভীর এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তারা। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে ৭ আগস্ট (সকালের খবর)। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলে পশ্চিমা কূটনৈতিকদের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এনজিওগুলোর প্রলোভনে পড়ে ধর্মান্তরিত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে অধিক হারে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে হিন্দু মুসলমান ও বৌদ্ধদের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়ে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারির সংখ্যা বেশি। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থা তথা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। যে কোনো বিবেচনায় অভিযোগটি গুরুতর।
আমরা বারবার বলে আসছি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি চক্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পাহাড়িদের একটা অংশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিভ্রান্তির ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করছে। এমনকি পাহাড়িরা কোথাও কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে লিপ্ত রয়েছে। চাঁদাবাজি এখন সেখানে স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাহাড়িদের নেতা হিসেবে দাবিদার সন্তু লারমা তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। সরকারের আন্তরিকতাকে তিনি সমালোচনা করেছেন একাধিকবার। বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার দাবি তার অনেক পুরনো। এমনকি এক পর্যায়ে দাতা সংস্থা বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্তু বাবুর এই বক্তব্যকে পরোক্ষভাবে সমর্থনও করে। সন্তু বাবুর এ ধরনের বক্তব্য তাকে শুধু বিতর্কিতই করেনি, বরং তার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, সন্তু লারমা এ ধরনের বক্তব্য রাখার কোনো অধিকার রাখেন কি-না? কেননা তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাকে ভোট দিয় নির্বাচিত করেনি। তিনি চাকমাদেরও এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন না। ইউপিডিএফও পাহাড়ি তথা চাকমাদের প্রতিনিধিত্ব করে। দ্বিতীয়ত, চাকমাদের মতো বাঙালিরাও সেখানকার 'সেটলার'। বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করে। প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে নিঃসন্দেহে তারা সংখ্যায় কম ছিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠী 'আদিবাসী' নয়। বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী হচ্ছে সাঁওতাল ও খাসিয়ারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তি্বক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ 'আদিবাসী' দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে পারে না।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশ কয়টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। তাতেও মন গলেনি সন্তু বাবুর। এরপরও তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। তাদের কর্মযোগ্যতা, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অথচ সেই সেনাবাহিনীকে বারবার বিতর্কিত করছেন সন্তু বাবু। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জন্ম হয়েছে। স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা নিজেদের উৎসর্গ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। কিছু কিছু এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করার ফলে। ওইসব অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গত ২১ মের বরকলের ঘটনা এর বড় প্রমাণ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বরকলের হত্যাকা- প্রমাণ করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র আছে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা অস্ত্র সংগ্রহ করছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় অভিযোগ করা হয়েছিল জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র ক্যাডাররা সব অস্ত্র জমা দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে ওই অভিযোগের পেছনে সত্যতা ছিল। শান্তিচুক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এর একটা ভালো দিক হচ্ছে ভারতে আশ্রিত চাকমারা তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে এসেছেন। সরকার তাদের এককালীন টাকা দিয়ে পুনর্বাসনও করেছে; কিন্তু আমরা কখনো চাইবো না পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। পূর্ব তিমুর ছিল একসময় ইন্দোনেশিয়ার একটি অংশ, একটি প্রদেশ; কিন্তু খ্রিস্টান অধ্যুষিত পূর্ব তিমুরকে পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীন করেছিল তাদের স্বার্থে। পূর্ব তিমুর স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। আর দক্ষিণ সুদান, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে অতিসম্প্রতি গণভোটের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আগে দক্ষিণ সুদান ছিল সুদানের একটি অংশ। পূর্ব তিমুরের মতো দক্ষিণ সুদানে তেল পাওয়া গেছে। পশ্চিমাদের স্বার্থ এখানে অনেক। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের শঙ্কাটা তাই অনেক বেশি। আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভায়ও এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে (আমার দেশ, ১০ এপ্রিল, ২০১১)। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ঘন ঘন সফর, ইউএনডিপির কর্মকা-, ইত্যাদি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যারা দেশ, জাতি, স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবেন তাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পার্বত্য সাধারণ উপজাতীয়রা গভীর জঙ্গলে বসবাস করে। তারা ছোটখাটো দোকান, কিংবা জুম চাষ করে, কৃষি পণ্য বিক্রি করে অতি কষ্টে দিনযাপন করে। মিশনারিরা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এদের ধর্মান্তরিত করছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কী হারে উপজাতীয়রা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটা পরিসংখ্যান নিয়েই জানা যাবে। উপজাতীয়দের দরিদ্রতা পুঁজি করে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। শুধু তাই নয়। ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রজেক্টে পাহাড়ি ধর্মান্তরিত লোকদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। অথচ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা সেখানে চাকরি পাচ্ছে না। বাঙালিদের সঙ্গে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। পাহাড়ি অঞ্চলে একজন উপজাতীয় ড্রাইভার যে বেতন পান, অনেক বাঙালি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও সেই বেতন পান না। পাহাড়ে স্পষ্টতই একটি বিভাজন তৈরি করা হয়েছে, যা সংবিধানের ১৯নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি; কিন্তু দুঃখ লাগে তথাকথিত সুশীল সমাজ কোনোদিনও এ প্রশ্নে মুখ খোলেননি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তারা মানববন্ধন করলেও, ওখানে বসবাসকারী বাঙালিরা যে ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সে ব্যাপারে একবারও তারা কথা বলেননি। বিদেশিরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানকে মূল রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করেছিল। স্থানীয় লোকদের ব্যাপক ধর্মান্তরিত করে তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধন করেছিল। আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও ওই একই ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এ ব্যাপারে সোচ্চার ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
গত ২১ মের বরকলের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসী কর্মকা- পাহাড়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। পাহাড়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সেনাবাহিনীর কর্মকা- সেখানে বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পগুলোতে পুনরায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা দরকার। ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করাও ঠিক হবে না। কেননা সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংগঠনটি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচালনা করার অধিকার রাখে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়াও জরুরি। নির্বাচন না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাচ্ছে। আরো একটা কথা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এটা অবৈধ ও অশোভন। একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘটনায় উদ্বিগ্ন। সরকার দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে, এটাই প্রত্যাশা করি।
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
tsrahmanbd@yahoo.com

1 comments:

  1. Mizan, SUST, Sylhet.14 March 2012 at 06:40

    ধন্যবাদ স্যার, আপনার এ লেখার জন্য। আমরাও পাহাড়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

    ReplyDelete