রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

কয়লানীতি কেন জরুরি


বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত্ সংকটের কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এ ধরনের একটি দাবি যখন ওঠে, তখন আমি অবাক হই না। বাংলাদেশ বর্তমানে এক চরম বিদ্যুত্ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রোজা-রমজানের দিনে-রাতেও একাধিকবার বিদ্যুত্ যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সংকট। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। অথচ চাহিদা বাড়ছে। এ কারণেই কয়লাকে এখন গ্যাসের বিকল্প ভাবতে হবে। কয়লার এক বিশাল ভাণ্ডার বাংলাদেশে রয়েছে। কয়লার সুষ্ঠু ব্যবহার, উত্তোলন ও কয়লানির্ভর বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য তাই চাই কয়লানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
বিদ্যুত্ আমাদের প্রয়োজন। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এখন বিদ্যুত্ শীর্ষে থাকা উচিত। গ্যাসের রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে এবং নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হচ্ছে না। সুতরাং গ্যাসনির্ভর যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র, তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই ভরসা এখন কয়লা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫টি কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন, যা ৭৩ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য (উত্তোলনযোগ্য ২০ টিসিএফ)। এতে ৩০ থেকে ৪০ বছরের জ্বালানি চাহিদা পূরণ সক্ষম। উত্তরাঞ্চলের বড় পুকুরিয়ায় ৬টি কয়লা স্তর (১১৯ থেকে ৫৬০ মিটার গভীরে) পাওয়া গেছে, যার মজুদের পরিমাণ ৬০৩ মিলিয়ন টন। বর্তমানে এ কয়লা খনিটি ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতির মাধ্যমে উত্তোলনের পর্যায়ে রয়েছে। বড় পুকুরিয়া ছাড়াও জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে কয়লা পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই কয়লা উত্তোলনের ব্যাবস্থা না করে সরকার ভারত থেকে কয়লা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের সাথে পিডিবির একটি চুক্তি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতীয় কয়লায় চট্টগ্রাম ও খুলনায় দু’টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যায় ধরা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের কয়লা দিয়েই আমরা বিদ্যুত্ কেন্দ্র ২টি চালাতে পারতাম। আমাদের নিম্নমানের ভারতীয় কয়লার প্রয়োজন হত না।
জামালগঞ্জে ৭টি কয়লাস্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। কয়লা এলাকার বিস্তৃতি প্রায় ১২ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট আনুমানিক মজুদের পরিমাণ ১০৫৩ মিলিয়ন টন। এখানে কয়লা স্তরের গভীরতা বেশি হওয়ায় তা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক হবে কি না, সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। ফলে এ মজুদের উন্নয়নের কাজ আরাম্ভ হয়নি। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা খনি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়াছে। এখানে কয়লা মজুদের পরিমাণ ৫৭২ মিলিয়ন টন। এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন (বাংলাদেশ)। খনির মেয়াদকালে মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ফুলবাড়ি কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলার কথা, যা ইতিমধ্যে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এ খনিতে বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতা হবে ১৫ মিলিয়ন টন। এই কয়লা খনির দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার (উত্তর-দক্ষিণে) এবং প্রস্থ ৩ কিলোমিটার (পূর্ব-পশ্চিমে)। এই খনিটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৬৫ থেকে ২৭০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
এসব কয়লা খনি নিয়ে আমাদের দেশে একটি বড় বিতর্ক চলছে-আর তা হচ্ছে কয়লা আমরা তুলবো কিভাবে ? ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে, নাকি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে? উন্মুক্ত পদ্ধতির গ্যাস পরেই হচ্ছে এই পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশ কয়লা তোলা যাবে। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে তুললে তোলা যাবে মাত্র ১০ শতাংশ। এতে ঝুঁকিও বেশি। বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। অল্প জমিতে প্রচুর মানুষ বাস করে। সমস্যা হচ্ছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তুলতে হলে অনেকে জমি হারাবেন। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে, এর প্রায় ৮০ শতাংশই কৃষি জমি। প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে প্রকল্পকালে প্রায় ২ হাজার ৩০০ আদিবাসীসহ প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে স্থানাস্তর ও পুনর্বাসিত করতে হবে। এই কাজটি ১০ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এখানে ১০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত্ উত্পাদন করার কথা। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্প চালু হলে প্রতি বছর জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ সংযোজন হতে পারে। প্রকল্প মেয়াদকালে জিডিপিতে অবদান রাখবে প্রায় ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ফুলবাড়ির জনগণ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিরোধিতা করে আসছে সেই প্রথম থেকেই। ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট ফুলবাড়ি কয়লা খনি উত্তোলনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় জনগণের সাথে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। তাতে মারা যান ৬ জন মানুষ। এশিয়া এনার্জির সাথে যে চুক্তি হয়েছিল, তারও বিরোধিতা করছে একটি জাতীয় কমিটি। ফুলবাড়ি কয়লা উত্তোলন নিয়ে যে জটিলতা, সেই জটিলতা এখনও দূর হয়নি। তবে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির বৈঠকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার পক্ষে মত দেয়া হয়েছে। তারা কয়লা নীতি দ্রুত চূড়ান্ত করারও সুপারিশ করেছে। এই যখন পরিস্থিতি এবং যেখানে দেশে প্রচুর কয়লা সম্পদ রয়েছে, সেখানে বিদেশ থেকে (ভারত) কয়লা আমদানি করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত-এ প্রশ্ন করাই যায়। এতে করে ভারতের উপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। আগামীতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যদি অবনতি ঘটে, তাহলে এই কয়লা আমদানির উপর তা কোন প্রভাব ফেলবে কী না আমরা জানি না। বলা হচ্ছে বিদ্যুত্ কেন্দ্র দু’টি নির্মাণে যে ব্যয় হবে, তা দেশ দু’টি সমানভাবে ভাগ করে নেবে। এক্ষেত্রে ভারত যা ব্যয় করবে তা তুলে নেবে কীভাবে? এই চুক্তিটি বহাল থাকবে কত বছরের জন্য? এসব বিষয় বিস্তারিত জানা দরকার। এটা ভালো হয় যদি তা সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এতে করে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের একটি সুযোগ তৈরি হল। এর মধ্যদিয়ে আমাদের বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এটা জানার সুযোগ পাবেন যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র দু’টির জন্য যে কয়লা প্রয়োজন, তা আমরা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে পারতাম কী না? দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে যেসব শর্ত রাখা হয়েছে তা বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলে কী না? তৃতীয়ত, ভারতীয় ঋণ শোধ করার প্রক্রিয়াটি কী? চতুর্থত, যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে কোন ‘তৃতীয় পক্ষ’-এর উপস্থিতি রয়েছে কী না?
ক্রমাবর্ধমান বিদ্যুত্ সংকটে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ আমাদের জন্য একটি ‘আশার আলো’। কিন্তু যেহেতু দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আমাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে, সেহেতু এই চুক্তি যেন আমাদের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে না দাঁড়ায়! একই সাথে সংসদীয় কমিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার যে সুপারিশ করেছে, আমি তাকে স্বাগত জানাই। তবে ফুলবাড়ীর মানুষের কথা মনে রাখতে হবে। কয়লা সম্পদের ভাগিদার তারাও। তাদের পুনর্বাসনই শুধু নয়, চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রেও তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ফুলবাড়ীর কয়লা সম্পদের ‘হক’ তাদেরও আছে। এই ‘হক’ থেকে তাদের আমরা বঞ্চিত করতে পারি না। রাষ্ট্র এ অঞ্চলের সম্পদ জাতীয় উন্নয়নে ব্যয় করবে এটা যেমন সত্য, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। দেশে ইতিমধ্যে একটি ‘জাতীয় কমিটি’ গঠিত হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই
দেশের জ্বালানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে তাদের বক্তব্য দিয়ে আসছে। তাদের সাথে কথাবার্তা বলাটাও জরুরী। তবে এটা ঠিক বাংলাদেশের কয়লা ব্যাবহার না  করে কেন ভারতীয় কয়লা আমাদানি করবো-এর একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কেননা আমরা জানি, ভারতীয় কয়লায় পরিবেশ দূষণ হয় সবচেয়ে বেশি। সেই তুলনায় আমাদের কয়লার মান অনেক ভাল। মনে রাখতে হবে যেখানে সারাবিশ্বে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ ৭৯ শতাংশ, চীনে ৭৮ শতাংশ, জার্মানিতে ৪৯ শতাংশ, কিংবা ভারতে ৬৯ শতাংশ, সেখানে আমাদের কয়লা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ব্যবহার করতে পারছি না। বাংলাদেশে ২০১২ সালে বিদ্যুত্-এর চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার মেগাওয়াট, আর ২০২০ সালে ১৬৮০৮ মেগাওয়াট, তখন কয়লা ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প নেই। গ্যাস সম্পদ ফুরিয়ে আসছে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলন নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। সে ক্ষেত্রে আমাদের কয়লা সম্পদ আমাদের জন্য একটি ভরসা। কিন্তু এই কয়লা সম্পদকে ব্যাবহার না করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কয়লা আমদানি করলে বিতর্ক তো বাড়বেই। আমরা চাই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হোক। আমরা বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে চাই। কিন্তু পরনির্ভরশীল হতে চাই না।
বিদ্যুত্-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সামনে রেখে তাই কয়লা নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরী হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে বিদ্যুত্ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিরোধী দল এটাকেও ইস্যু করতে পারে। তাই একটি সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া যদি আমরা শুরু করি, আমার বিশ্বাস বিদ্যুত্-এর অনেক চাহিদা আমরা পূরণ করতে পারবো। ইতোমধ্যে কয়ল নীতি প্রণয়ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মতামতও দিয়েছেন। ২০০৭ সালের ১১ জুন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোমিন পাটোয়ারীকে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি ২০০৮ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। তাতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, রফতানির সুযোগ না রাখা, দেশের চাহিদা পূরণের জন্য ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিধান রাখা হয়েছিল। ওই রিপোর্টটিকে বিবেচনায় নিয়েই প্রয়োজনে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করে নতুন একটি কয়লানীতি আমাদের দরকার। মনে রাখতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তা শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, বরং আমাদের উন্নয়নের সাথেও সম্পর্কিত।
মঙ্গল, ৯ অগাষ্টu-এ ২০১১, ২৫ শ্রাবণ ১৪১৮   দৈনিক ইত্তেফাক
লেখক: ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
tsrahman09@g-mail.com

0 comments:

Post a Comment