রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন


মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও উন্নত করা সম্ভব। তাতে করে লাভ বাংলাদেশেরই। জোট সরকারের আমলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতমুখিতা। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী এবং উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারেÑ এ ধরনের সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকলেও সম্পর্ক উন্নয়নের বিবেচনায় আমরা ভারতকে প্রাধান্য দিয়েছি বেশি। সেক্ষেত্রে মিয়ানমারকে আমরা বিবেচনায় নেইনি কখনও। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মিয়ানমার আমাদের স্বার্থ রক্ষা করবে বেশি, যা আমরা ভারতের কাছ থেকে পাব না। ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। সঙ্গত কারণেই এটা প্রত্যাশিত, বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত একটি বড় ভূমিকা রাখবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, ফিরতি সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর, সোনিয়া গান্ধীর মতো ব্যক্তিত্বের বাংলাদেশে আসা প্রমাণ করে উভয় দেশই দু’দেশের সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেয়া-নেয়ার প্রশ্নে পাল্লাটা তুলনামূলকভাবে ভারতের দিকে বেশ কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা এখানেই যে, তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আদায়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কোন সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে দু’জন উপদেষ্টাকে তৎপর হতে দেখা গেছে। যদিও কোন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। শুধু তাই নয়, ভারতকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমরা আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমারকে কখনোই বিবেচনায় নেইনি এবং নিকট প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গাঢ় করার তেমন কোন বড় উদ্যোগ নেইনি। আমাদের জাতীয় স্বার্থে মিয়ানমার ও চীনের প্রয়োজন অনেক বেশি। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন ও মিয়ানমার সফর করেছেন, কিন্তু দেশ দুটির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা বলা যাবে না। এখন একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হল। উদ্যোগ নিতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ্য নেতৃত্ব দরকার, যারা সময়ের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নয়া দিকনির্দেশনা দেবেন।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমরা বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী। কিন্তু ভারতের দ্বিপাক্ষিকতার কারণে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির বহুপাক্ষিকতার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছি। ফলে আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না। মিয়ানমারের জ্বালানি সম্পদকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি না নেয়ার কারণে। অথচ চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতও এই জ্বালানি সম্পদকে ব্যবহার করছে। প্রতিবেশী দেশ হওয়ার কারণে আমাদের সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রামে মিয়ানমারের কাঁচামালভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা থাকলেও আমরা এ ব্যাপারে গত তিন বছরে কোন উদ্যোগ নেইনি। মিয়ানমার-চট্টগ্রাম সীমান্তে সার কারখানা স্থাপন করে মিয়ানমারের বিপুল সারের চাহিদা আমরা পূরণ করতে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি। আকিয়াব, মংডুর আশপাশে প্রচুর বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিমেন্ট ও কাগজ শিল্প বিকশিত হতে পারতÑ সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও আমরা উৎসাহিত করিনি। আমরা বেসরকারি উদ্যোগে আফ্রিকাতে জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদের উদ্যোগ নিয়েছি। অথচ পাশের দেশে রয়েছে প্রচুর অনাবাদি জমি। মিয়ানমার জমি ‘লিজ’ দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও আমাদের নীতি প্রণেতারা বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি। এমনকি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহিত করেননি। অতি সম্প্রতি ভারত থেকে তুলা আমদানি নিয়ে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ মিয়ানমারের মন্দালয়-ম্যাগাওয়ে অঞ্চলে প্রচুর তুলা উৎপন্ন হয়। আমরা কখনও ওই তুলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাইনি। এমনকি ওই অঞ্চলে প্রচুর ভুট্টা চাষ হয়। মিয়ানমারে প্রচুর গবাদিপশু উৎপন্ন হয়, যা কিনা আমাদের চাহিদা মেটাতে পারে। যৌথভাবে গবাদিপশুর ফার্ম তৈরি করাও সম্ভব। মিয়ানমারে প্রচুর বিদেশী পর্যটক আসেন। তারা যাতে বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আসেন, কিংবা সুদূর সুন্দরবনে তাদের নিয়ে যাওয়া যায় কিনা, আমাদের ট্যুর অপারেটররা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। কুনমিং-মুসে-ঘুমধুম সড়ক আমাদের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে বটে, কিন্তু তেমন কোন উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সড়ক যোগাযোগের জন্য ‘মৈত্রী সড়ক’-এর কাজ শুরু হয়েছিল বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়। ওই সড়কে বেশ ক’টি সেতু নির্মাণ করার কথা, যা কিনা বাংলাদেশ তার নিজের অর্থায়নে করবে। কিন্তু ওই ‘মৈত্রী সড়ক’-এর কোন খবর আমরা জানি না। অথচ ভারতকে ট্রানজিট দিতে আমরা অনেক রাস্তা সংস্কার করেছি। এমনকি তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতীয় ২৮ চাকার যান চলাচলের সুযোগ আমরা করে দিয়েছি। অথচ ‘মৈত্রী সড়ক’ দ্রুত সম্পন্ন করার তেমন কোন উদ্যোগ আমাদের নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রয়োজনে আমরা মিয়ানমারকে গুরুত্ব দেইনি।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ‘বিমস্টেক’-এর সদস্য। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশী পণ্যের বাজারই আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর জন্য উš§ুক্ত করবে না, বরং সদস্যপদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আসিয়ানের ‘ডায়ালগ পার্টনার’-এর মর্যাদা পেতে সাহায্য করবে। বলা ভালো, ভারত ইতিমধ্যে ‘ডায়ালগ পার্টনার’-এর মর্যাদা পেয়েছে। মিয়ানমার আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে আগামী বছর। এটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।
বহির্বিশ্বে মিয়ানমারের যে ‘বদনাম’ ছিল তা ইতিমধ্যেই কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। গণতন্ত্রী নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনস প্রশাসনের সম্পর্ক এখন ভালো। সুচি উপনির্বাচনে লড়বেন। জেনারেল সেইনস নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্ক আগের মতো নেই। মিয়ানমারের বিপুল জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে মিয়ানমারের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে। বলতে দ্বিধা নেই, মিয়ানমার আর আগের অবস্থানে নেই। এখানে ভারতের ভূমিকাও লক্ষ্য করার মতো। ভারত তার জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনেই মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। এ ক্ষেত্রে সুচির গণতান্ত্রিক আন্দোলন কখনই প্রাধান্য পায়নি। ভারত বহির্বিশ্বে সুচির মুক্তির ব্যাপারেও তেমন কোন আন্দোলন গড়ে তোলেনি। মিয়ানমার সরকারের ওপর কোন ‘প্রেসার’ও সৃষ্টি করেনি। কারণ মিয়ানমারের জ্বালানি সম্পদ ভারতীয় নেতাদের কাছে সুচির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ ভারতের এই ‘এপ্রোচ’ থেকে শিখতে পারে অনেক কিছু।
ঢাকায় নিযুক্ত নয়া চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ১৯ মার্চ। তিনি বলেছেন, চীন এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি মেনে নেবে না। ক্রমবর্ধমান ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই মন্তব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অঞ্চলে মার্কিন কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়ছে। মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ডের আওতাধীন এই অঞ্চল। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ দমনে এ অঞ্চলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মার্কিন সেনার উপস্থিতি রয়েছে, যা দৃশ্যমান নয়। তবে যারা নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন, এ অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতির উদ্দেশ্য একটাইÑ আর তা হচ্ছে ধীরে ধীরে ‘চীনকে ঘিরে ফেলা’। যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্রাটেজি øায়ুযুদ্ধের সময়কার ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’র কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই চীন এ ধরনের কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কারণে স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বলয়ে বাংলাদেশ যদি প্রবেশ করে, তা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। প্রতিবেশী ও নিকট প্রতিবেশীর কাছে বাংলাদেশের ভূমিকাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করবে না, বরং নিরাপত্তাকে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না।
সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার স্বীকৃত হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন সফল কূটনীতি প্রয়োগ করতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত দ্রুত মিয়ানমার সফর করা এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আস্থাশীল একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা। সমুদ্রসীমা বিরোধে মিয়ানমার বাংলাদেশের কাছে হেরে গেলেও মিয়ানমার কোন ‘নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া’ দেখায়নি। বাংলাদেশ এটাকে ‘পজিটিভ সিগনাল’ হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারে। ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসা, ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতায় অংশীদার না হওয়া এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ‘নতুন ক্ষেত্র’ সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। এই ‘পরিবর্তন’ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

0 comments:

Post a Comment