রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

শিশুমৃত্যু বিশ্ববিবেককে কতটুকু জাগ্রত করবে

শিশুটির নাম আয়লান। কতই বা বয়স হবে? মাত্র তিন বছর। লাল শার্ট আর নীল প্যান্ট। পায়ে জুতা। মৃত। মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল তুরস্কের সমুদ্র উপকূলে। সারা বিশ্বের মানুষ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে দেখেছে আয়লানের মৃতদেহ। এ বয়সে তার বোঝার কথা নয় ইউরোপ কী, কেন তারা ইউরোপ যাবে। বাবা-মা আর পাঁচ বছরের বড় ভাইয়ের সঙ্গে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে যেতে চেয়েছিল ইতালিতে। পারেনি। সাগর তাকে, তার ভাই আর মাকে কেড়ে নিয়েছে। সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত কোবানে শহরে সে আর কোনো দিনও জীবিত ফিরে আসবে না। মৃত আয়লানের ছবি টিভিতে দেখে আমি কেঁদেছি। আমি জানি আমার মতো হাজারো মানুষ এই ছবি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এই পৃথিবী তাকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। শিশু আয়লানের মৃত্যুর জন্য আমরা কাকে দায়ী করব? কানাডার কর্তৃপক্ষকে, যারা আয়লানের বাবা-মাসহ কানাডায় অভিবাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের? নাকি যে দালাল পাঁচ হাজার ইউরোর বিনিময়ে তাদের বিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করেছিল, তাদের? নাকি যুদ্ধবাজ ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের, যারা কোবানে শহর বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছিল, তাদের? এ প্রশ্নের জবাব আমরা কোনো দিনই পাব না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কিংবা কানাডার প্রধানমন্ত্রী আয়লানের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাতে করে আয়লান আর এ পৃথিবীতে কোনো দিনই ফিরে আসবে না। কিন্তু আয়লান তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্ন আমাদের কাছে রেখে গেছে, অর্থাৎ ইউরোপে পাড়ি জমানো হাজার হাজার শরণার্থীর কী হবে? যাঁরা টিভিতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট রেলস্টেশনে অবস্থান নেওয়া শত শত শরণার্থীর দুর্দশার চিত্র দেখেছেন, যেখানে আয়লানের মতো শিশুও আছে, তাদের ভবিষ্যৎই বা কী এখন! আয়লানের মৃতদেহের ছবি প্রকাশ হওয়ার আগেও সারা বিশ্ব জেনেছিল জার্মানি-অস্ট্রিয়ার সীমান্তে একটি পরিত্যক্ত লরিতে দম বন্ধ হয়ে ৭১ জন মানবসন্তানের মৃত্যুর খবর। কিন্তু বিশ্ববিবেক তাতে জাগ্রত হয়নি! মানুষ বেঁচে থাকার জন্য, শুধু একটু আশ্রয়ের জন্য ছুটছে ইউরোপে। কেননা মানুষ জানে, ইউরোপের দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই শরণার্থীদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। বিশেষ করে জার্মানির কথা বলা যায়, যারা হাজার হাজার আফগান, তার আগে ভিয়েতনামিদের সে দেশে আশ্রয় দিয়েছিল। এবারও তারা ধারণা করছে, প্রায় আট লাখ শরণার্থী জার্মানিতে আসবে। কিন্তু বাকি ইউরোপের দেশগুলো এ দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। চরম দক্ষিণপন্থী হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দেশ শরণার্থীদের গ্রহণ করবে না। আর চেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু যারা খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী, তাদেরই তাঁরা গ্রহণ করবেন। যাঁরা সিরিয়াস পাঠক, তাঁরা মার্কুস রেডিকারের (Mercus Rediker) একটি বই 'Slave ship' পড়ে থাকতে পারেন। ১৫ থেকে ১৯ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আফ্রিকা থেকে যেসব দাস জাহাজে করে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হতো, সেসব কাহিনী নিয়েই বইটি লেখা। রেডিকার উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন 'দাস' বিক্রি হয়েছিল, আর জাহাজে করে নেওয়ার পথে মারা গিয়েছিল ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন দাস (পাঠক স্মরণ করুন, ১৬১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম আফ্রিকানদের দাস হিসেবে আনা হয়। আর ১৮০৮ সালে জেমস মেডিসন চতুর্থ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দাস আমদানি নিষিদ্ধ করেন)। আজ এত বছর পর কোনো কোনো বিশ্লেষক ওই 'দাস রপ্তানির' সঙ্গে বর্তমান হাজার হাজার মানুষের ইউরোপ গমনকে এক করে দেখছেন। টিভি প্রতিবেদনে অনেকেই স্বীকার করেছেন, তাঁরা জনপ্রতি ন্যূনতম দুই থেকে তিন হাজার ডলার দিয়েছেন, যাতে দালালরা তাঁদের ইউরোপের কোনো এক দেশে পৌঁছে দিতে পারে। দালালরা তাঁদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল একটি স্বপ্নের পৃথিবীর, একটি সুন্দর ভবিষ্যতের! তাদের ফাঁদে আয়লানের বাবাও পা দিয়েছিলেন। আয়লানের মা সাঁতার জানতেন না। আর বাচ্চাদের না জানারই কথা ছিল। এর পরও দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অপর পার ইতালিতে যেতে চেয়েছিলেন। শত শত মানুষসহ নৌকাডুবির খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করছি যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে আয়লানের মতো আরো অনেক শিশু ছিল। সংবাদকর্মীরা তাদের ছবি খুঁজে পাননি, পেয়েছিলেন আয়লানের ছবি।
আয়লানের বাবার মতো হাজার হাজার মানুষ যখন বেঁচে থাকার আশায় ইউরোপে প্রবেশ করেছে, তখন ইউরোপের নেতারা এই শরণার্থী ইস্যু নিয়ে 'রাজনীতি' শুরু করছেন। জার্মানি বলছে, শরণার্থীদের ইউরোপের ২৮টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দেশে কোটা ভিত্তিতে আশ্রয় দিতে হবে। কিন্তু এরই মধ্যে এ প্রশ্নে একটি স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ করা যায়। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এই দায়িত্ব (কোটা) নিতে চাচ্ছে না। কেউ কেউ শরণার্থীদের ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উগ্রবাদীরা জার্মানির এক রাজনৈতিক নেতার (দি লিংকে) গাড়িতে হামলা চালিয়েছে, যে দলটি শরণার্থীদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন অনুযায়ী এরা সবাই উদ্বাস্তু, শরণার্থী। এদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আছে। শুধু তা-ই নয়, ১৯৬৭ সালের UNHCR প্রটোকল, ১৯৯৮ সালের Guideling principles on internal displacement, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত Resolution 2198 (XXI)- প্রতিটি আন্তর্জাতিক আইন ও সিদ্ধান্তে যুদ্ধাঞ্চল থেকে আসা শরণার্থীদের মানবিক কারণ বিবেচনা করে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ ব্রিটেনের মতো 'গণতান্ত্রিক দেশ' গ্রহণ করেছে মাত্র ২১৬ জন শরণার্থী (এখন তারা এ সংখ্যা মাত্র চার হাজারে উন্নীত করবে)। সিরিয়ার হাজার হাজার শরণার্থীর দেশত্যাগের কথা উল্লেখ করে এখন তাদের বলা হচ্ছে, 'Regime change Refugees'। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র পারস্য অঞ্চলবর্তী যেসব দেশে সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে (ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া) এবং যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার কারণেই দেশান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এ দেশকেই এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বলা হচ্ছে 'Regime change Refugees'। এরা স্বেচ্ছায় কেউই দেশ ত্যাগ করছে না। যুদ্ধের পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করছে দেশ ত্যাগ করতে। জাতিসংঘও প্রায় দুই লাখ শরণার্থী গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইউরোপের নেতাদের মনোভাবের কতটুকু পরিবর্তন আসবে- এটাই বড় প্রশ্ন এখন। অনেক নেতার মধ্যে একটা ইসলামবিরোধী মনোভাবও লক্ষ করা যায়। ফ্রান্সে ট্রেনে হামলার কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, শরণার্থীদের মধ্যে আইএসের চর রয়েছে, যারা ইউরোপজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। বাস্তবতাই বলে দেয়, শরণার্থীদের জন্য বিশ্বব্যাপী একটি সহানুভূতির জন্ম হলেও ইউরোপের নেতারা তাদের সাদরে গ্রহণ করছেন না। অথচ এই সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলো তাদের দায় এড়াতে পারে না।
'অবৈধ অভিবাসী' ঠেকাতে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের সীমান্তে বেড়া তৈরি হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতন নতুন এক ইউরোপের জন্ম দিয়েছিল। আজ ২৬ বছর পর নতুন করে আবার দেয়াল উঠছে- এ দেয়াল অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে! কিন্তু আদৌ কি এই অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা যাবে? হাঙ্গেরিতে অভিবাসীদের ওপর পুলিশের কাঁদানো বোমা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি চেক রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী 'শুধু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের' গ্রহণ করা হবে, এমন বক্তব্য দিয়ে একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। এই অভিবাসনপ্রক্রিয়া কিভাবে বন্ধ হবে? যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে (সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন) যদি স্থিতিশীলতা ফিরে না আসে, তাহলে মানুষ আশ্রয়ের জন্য দেশ ত্যাগ করবেই। একই সঙ্গে মানবপাচারকারীদের যদি কঠোর শাস্তির আওতায় না আনা হয়, এই অবৈধ তৎপরতা বন্ধ হবে না কোনো দিনও। যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা জরুরি। বিশেষ করে সিরিয়ায়। সেখানে একদিকে রয়েছে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা, অন্যদিকে রয়েছে সরকারি বাহিনী। মার্কিন বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও আইএসকে নির্মূল করা যায়নি। বাহ্যত সিরিয়া ও ইরাকের একটা বিশাল এলাকা নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি 'জিহাদি রাষ্ট্রের' জন্ম হয়েছে। এখানে যারা থাকছে, তাদের বাধ্য করা হচ্ছে আইএসের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে। যারা নিচ্ছে না, তারা অবৈধ পথে তুরস্ক হয়ে দেশ ত্যাগ করছে। একই সঙ্গে 'অর্থনৈতিক অভিবাসন' ঠেকাতে আফ্রিকায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সেখানে কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা জরুরি। মানুষ যদি বেকার থাকে, তখন উন্নত জীবনের আশায় তারা বের হবেই। এই মুহূর্তে যেমন অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছে, তাদের আশ্রয় দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে ভূমধ্যসাগরে নৌ তৎপরতা বাড়ানো এবং গোপন স্থান থেকে ছোট ছোট নৌকায় উঠে ওই সব স্থানে কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা জরুরি। আরো একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম দেশগুলোর ভূমিকা। পরিসংখ্যান বলে- সৌদি আরব, আরব আমিরাত কিংবা কুয়েত একজন সিরীয় শরণার্থীকেও আশ্রয় দেয়নি। এমনকি এদের জন্য আদৌ অর্থ বরাদ্দ করেছে, এমনটাও জানা যায় না। সবচেয়ে বেশি সিরীয় শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে তুরস্ক ও লেবানন। লেবানন প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যা তার মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগের ১ ভাগ। আর তুরস্ক দিয়েছে প্রায় ২০ লাখ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ এই প্রথমবারের মতো বড় ধরনের শরণার্থী সমস্যার সম্মুখীন হলো। ১৯৯০-৯১ সালে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের পরও এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর পশ্চিম ইউরোপে যাওয়ার 'চাপ' ছিল না। আজ যারাই তাদের নিজ নিজ দেশ ত্যাগ করেছে, এর জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়। তাদের ওপর 'যুদ্ধ' চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শুধু বেঁচে থাকার জন্যই তারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এখন ছোট্ট শিশু আয়লানের মৃত্যু বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের ব্যাপারে একটা সহানুভূতির জন্ম দিলেও আয়লানের মৃত্যুই শেষ মৃত্যু হবে কি না, তা বলা মুশকিল। তবে কিছুটা হলেও তা প্রভাব ফেলবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মেকেইয়ের (Mackey) ভাষায় বলতে হয়- 'Could act as a catalyst for the international Community to halt the war in Syria'। মেকেইয়ের মন্তব্য সত্য হোক, শিশু আয়লানের 'আত্মত্যাগ' হাজার হাজার মানুষকে ইউরোপে একটু বেঁচে থাকার জায়গা করে দিক- এ প্রত্যাশাই সবার। Daily Kalerkontho 08.09.15

0 comments:

Post a Comment