রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও আমাদের জাতীয় স্বার্থ

প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাচ্ছেন আগামী ৭ এপ্রিল। কিন্তু ইতোমধ্যে এই সফর নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। এই আগ্রহের কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, বাংলাদেশ চীন থেকে দুটো সাবমেরিন পেয়েছে এবং তা বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে। এই সাবমেরিন সংযোজন নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আছে। গেল নভেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের সাবেক দেশরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিক্কর। তার বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে ভারত তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ভারতের অসন্তুষ্টি কতটুকু কমাতে পারবে, সেটি একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করবে। এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া ইতোমধ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এর আওতায় ভারত থেকে ৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয়ও থাকবে। ভারত থেকে এ খাতে ঋণও পাওয়া যাবে। প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক ও অস্ত্র ক্রয় বাংলাদেশে ‘বিতর্ক’ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের স্বার্থ এতে করে কতটুকু রক্ষিত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। এখানে এটা নিয়ে নানা মত আছে। বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকীকরণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করে। অতীতে চীন ও রাশিয়া থেকে আমরা অস্ত্র ক্রয় করেছি। এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভারতীয় অস্ত্র নিয়ে। আন্তর্জাতিক আসরে অস্ত্র বিক্রিতে ভারতের তেমন নাম নেই। একটি পরিসংখ্যান দিচ্ছি। ২০১০-১৪ সালের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, বিশ্বে অস্ত্র বিক্রিতে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (বিশ্বে যা রপ্তানি হয় তার ৩১ ভাগ)। এর পরের অবস্থান রাশিয়ার (শতকরা ২৭ ভাগ)। তৃতীয় অবস্থানে চীন (শতকরা ৫ ভাগ)। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, ইউক্রেন ও ইসরায়েল রয়েছে যথাক্রমে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম স্থানে। এখানে ভারতের কোনো অবস্থান নেই। অন্যদিকে ভারত নিজে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করে (শতকরা ১৫ ভাগ বিশ্বের)। এর পরের অবস্থান সৌদি আরবের, শতকরা ৫ ভাগ। পাকিস্তানের অবস্থান অস্ত্র আমদানিতে পঞ্চম। ভারত যেখানে নিজে অস্ত্র আমদানি করে, সেখানে ভারতীয় অস্ত্র কেনা, অস্ত্রের গুণগতমান ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। তবে ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। আমাদের উন্নয়নের জন্য ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের জাতীয় স্বার্থের নিরিখে এই সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, যা নিয়ে প্রশ্নের কোনো শেষ নেই। এই বিষয়টি আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেন, তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে করে বাড়বে। মনে রাখতে হবে, তিস্তায় পানিপ্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থনÑ এটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর গাড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্দা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই অতীতে মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরও একটা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানিবণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিন দিন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচকাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা বরাবরই মমতার জন্য একটি ‘রাজনৈতিক ইস্যু’। তাই মমতা তিস্তাচুক্তি করে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করবেনÑ এটা আমার কখনোই বিশ্বাস হয়নি। তাই মমতায় আস্থা রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয়, তা হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের ওপর ‘চাপ’ অব্যাহত রাখা। আমরা ভারতের অনেক ‘দাবি’ পূরণ করেছি। মোদির আমলে সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে দুই দেশের সীমানা এখন চিহ্নিত। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির পরও মমতা যদি তার ওপর রাখা আস্থার প্রতিদান না দেন, তাহলে তা যে দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে একটা অবিশ্বাসের জন্ম দেবেÑ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে রুদ্র কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে পারেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই পানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেওয়া সম্ভব বলে সুপারিশ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়ও এই সুপারিশ সমর্থন করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই মমতা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে মমতাকে আস্থায় নেওয়া সত্যিকার অর্থেই কঠিন। ঢাকায় আসার আগে আত্রাই প্রসঙ্গটি তুলে তিনি একটি ‘জট’ লাগিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ আত্রাইয়ের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি এক করে দেখেছেন। এটি একটি ভিন্ন বিষয়। আত্রাই নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তিস্তার পানিপ্রাপ্তি আমাদের অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে অন্য কোনো ইস্যুকে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সমুদ্রসীমাও নির্ধারিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক আসরে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমুদ্রসীমা নির্ধারত হয়নি। আজকে প্রয়োজনে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে হবে। মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়টি ঝুলে থাকতে পারে না। লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। মমতা ব্যানার্জির দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে না। ভাটির দেশ হিসেবে তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার আমাদের রয়েছে। মমতা ব্যানার্জি এককভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিতে পারেন না। যদি তিনি তা করেন, তাহলে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে মমতাকে নয়, বরং ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর আমাদের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মমতা বারবার তার ‘অবস্থান’ পরিবর্তন করছেন। সীমান্ত চুক্তিটি তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন কেন্দ্র তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পর। এখন তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একদিকে তিনি ‘রাজনীতি’ করছেন, অন্যদিকে মোদি সরকারকে চাপের মুখে রেখেছেন।
শুধু তিস্তার পানিবণ্টন নিয়েই নয়, বরং টিপাইমুখ বাঁধ, ফুলেরতল বারাজ, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর, নাফটা কার্যকর, ভারতগামী বাংলাদেশিদের ভিসা সহজীকরণ, ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করা ইত্যাদি নানা সমস্যা রয়েছেÑ যার একটা সুষ্ঠু ‘সমাধান’ প্রয়োজন। তবে অগ্রাধিকার তালিকায় এই মুহূর্তে প্রথমেই রয়েছে তিস্তা। তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা চাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার ভারতীয় নেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তিস্তাচুক্তি আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা চাই। বর্তমান সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছর ছিটমহল সমস্যা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। এখন তা অতীত। ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতকে ‘ট্রানজিট’ দিয়েছে। ভারত থেকে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় (২৭ মে ২০১৫) একটি চার দেশীয় উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা (বিবিআইএন) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন শুধু তিস্তাচুক্তির কারণে এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে নাÑ এটা হতে পারে না। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বাংলাদেশ তিস্তাচুক্তির প্রসঙ্গটি উত্থাপন করবে। এ ব্যাপারে ভারতে একটি জনমত সৃষ্টি করাও জরুরি। ভারতের অগ্রাধিকারের তালিকায় অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি থাকতে পারে। এতে করে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে যদি আরও আধুনিকীকরণ করা সম্ভব হয়, তাহলে এ খাতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু আমরা চাই আমাদের দাবিগুলোর ব্যাপারে ভারতীয় নেতারা আরও আন্তরিক হবেন। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান ৭ম। ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের যে অর্থনীতি, তা বিশ্ব জিডিপির ২ দশমিক ৮ ভাগ। কিন্তু ২০৫০ সালের আগেই ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে (চীন ১ এবং যুক্তরাষ্ট্র ৩ নম্বরে)। তাই ভারতের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থেকে আমরাও লাভবান হতে পারি। তবে ভারতকেও এগিয়ে আসতে হবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য।
Daily Amader Somoy
21.03.2017

0 comments:

Post a Comment