রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

মন্ত্রীদের কথাবার্তা ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি



সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দু’-একজন মন্ত্রীর কথাবার্তায় রাজনৈতিক দৈন্য আবার নতুন করে ফুটে উঠেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের লাইভ টকশোতে দেয়া হুমকির রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বলে বসলেন ‘তিনি রাজাকার’। আর বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ একটি বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন গত ৩০ অক্টোবর। শাজাহান খান সাবেক এক মন্ত্রীর ‘চোখ তুলে ফেলা’র হুমকি দিয়েছিলেন প্রকাশ্যেই একটি টিভি টকশোতে, যেখানে সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ র‌্যাবের এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ভারত সফরের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বনমন্ত্রী বললেন, তিনি সে দেশের শিবসেনার সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন। জঙ্গিবাদের তিনি উদ্যোক্তা। মুসলমানবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে তাদের উৎসাহিত করেছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর বক্তব্য পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রীরা এভাবে কথা বলতে পারেন কি-না? খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তার সম্পর্কে এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়। আমি অবাক হয়েছি শাজাহান খানের বক্তব্যে। তিনি কীভাবে রাজাকার বলেন, প্রকাশ্যে সাবেক একজন মন্ত্রীকে হুমকি দেন। আমাদের রাজনীতি থেকে ভদ্রতা, শালীনতা কি উঠে গেল? অবশ্যই মন্ত্রীরা বিরোধী দলের রাজনীতির সমালোচনা করবেন। কিন্তু প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া, এ কেমন রাজনীতি?
শাজাহান খান কি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছেন, লাইভ অনুষ্ঠানে এ ধরনের একটি ‘কাণ্ড’ ঘটিয়ে তিনি তার মান-সম্মান বাড়াতে পেরেছেন কি-না? ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তিনি যে দল করেন সেই দল সংসদে এবং জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। তিনি সংসদ সদস্য নন বটে, কিন্তু অতীতে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। তিনি একটি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থার সদস্য। তার সঙ্গে ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব’ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মন্ত্রী শাজাহান খান তার সরকারের গুণগান গাইবেন, ব্যারিস্টার মিয়া সরকারের সমালোচনা করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা হতে হবে ভদ্রজনিত, শোভন ও মার্জিত। ভাষা প্রয়োগে আমাদের হতে হবে আরও সচেতন। একজন মন্ত্রী তুই তোকারি করবেন, চোখ তুলে ফেলার হুমকি দেবেনÑ এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি! আমি চিন্তাও করতে পারি না, মন্ত্রী হয়ে শাজাহান খান এ ধরনের কথা বললেন কীভাবে!
তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অনেকেই জানেন। তিনি শ্রমিক নেতা। শ্রমিকদের নিয়ে তিনি রাজনীতি করেন। পরিবহন শ্রমিকরাই হচ্ছে তার ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’। এই ‘অস্ত্র’ তিনি অতীতে সরকারের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। পরিবহন শ্রমিকদের নেতা আর মন্ত্রী এক কথা নয়। পরিবহন শ্রমিক নেতা হিসেবে তার ‘ব্যবহার’ আমরা গ্রাহ্য করতে পারি। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে তার এ ব্যবহার আমরা মানতে পারি না। সম্ভবত শাজাহান খান তার পুরনো ‘পরিচয়’ থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারেননি। সম্ভবত তিনি নিজেও ভুলে গেছেন তিনি এখন মন্ত্রী, এখন আর পরিবহন শ্রমিকদের নেতা নন। আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্ত্রী শাজাহান খান এমন একটি দলের নেতা ও মন্ত্রী, যে দল থেকে এ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকদের জš§ হয়েছিল। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদÑ এরা তো আওয়ামী লীগেরই নেতা ছিলেন। কিন্তু তারা কি কখনও অভদ্রজনিত আচরণ করেছেন? শাজাহান খান খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করেন। ভাসানীও তো খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। তার নাম ভাঙিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী হয়ে ভাসানীর সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু ভাসানী কি তাদের সঙ্গে কখনও অভদ্রজনিত আচরণ করেছেন? কখনও করেননি। ভাসানী জীবদ্দশায় শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুু একদিনের জন্যও ভাসানী সম্পর্কে কোন খারাপ কথা বলেছেন, এ ধরনের কোন রেকর্ড নেই। বরং ‘হুজুরের’ জন্য লুঙ্গি, গামছা বঙ্গবন্ধুই দিতেন। এজন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু। আর তার দলের হয়ে শাজাহান খান আজ একি আচরণ করলেন!
শাজাহান খান অতীতেও বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের উসকে দিয়েছিলেন। কারণ মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য তিনি অদক্ষ ড্রাইভারদের দায়ী করেছিলেন। এবং ড্রাইভারদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় অধ্যাপক মামুন শাজাহান খানেরও সমালোচনা করেছিলেন। আর তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিবহন শ্রমিকদের এক সমাবেশ থেকে অধ্যাপক মামুনকে হুমকি দেয়া হয়েছিল। ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে জুতা মারার ছবিও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। সারাদেশ যখন অদক্ষ ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি অদক্ষ ড্রাইভারদের পক্ষ অবলম্বন করে বলেছিলেন ‘ড্রাইভারদের গরু-ছাগল চিনলেই যথেষ্ট’! কী ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য! অদক্ষ ড্রাইভাররা যেখানে মহাসড়কে এক ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছে, সেখানে অদক্ষ বাসচালকদের সমর্থন করেছিলেন তিনি।
অনেকেরই মনে থাকার কথা, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধী দলের এক এমপি বিএনপির এক মহিলা এমপি (তিনি মাদারীপুরের একটি আসনের প্রতিনিধিত্ব করতেন) সম্পর্কে খোদ সংসদেই একটি অশোভন মন্তব্য করেছিলেন। একজন মহিলা এমপির সঙ্গে যখন ‘রাতের নারীদের’ তুলনা করা হয়, তখন ওই লোকটি সম্পর্কে মন্তব্য করতেও আমার রুচিতে বাধে। একজন নির্বাচিত এমপির রুচি কোন পর্যায়ে গেলে তিনি তার মহিলা সহকর্মী সম্পর্কে একটি অশোভন মন্তব্য করতে পারেন!
যিনি প্রকাশ্যে সাবেক একজন মন্ত্রীর চোখ তুলে নেয়ার হুমকি দেন, তিনি তো আমাদের সবার জন্যই হুমকি। তার সঙ্গে কোন গোলটেবিলে অংশ নেয়া কিংবা টকশোতে অংশ নেয়া আমার জন্যও এক ধরনের ঝুঁকি। যিনি অধ্যাপক মামুনকে হুমকি দিতে দ্বিধা করেননি, তিনি যে ব্যারিস্টার মিয়ার মতো একজন সিনিয়র সিটিজেনকে হুমকি দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমি তার ব্যবহারে লজ্জিত ও দুঃখিত।
মহাজোট সরকারে দু’-একজন মন্ত্রী আছেন, যারা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মন্ত্রীই নানা অভিযোগে অভিযুক্ত। বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী বেশি কথা বলেন। এটা তার স্বভাব। ‘খামোশ’ খ্যাত অর্থমন্ত্রী সরকারের জন্য বোঝা। ‘কালো বিড়াল’ খ্যাত সুরঞ্জিত বাবু নিজেকে যতই নির্দোষ বলে দাবি করেন না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে তার কোন ‘ইমেজ’ নেই। তিনিও সরকারের বোঝা। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের জন্য কোন সম্মান বয়ে আনতে পারেননি। মন্ত্রী রাজিউদ্দীন রাজু তার নিজ এলাকায় যেতে পারেন না। ‘ফটোগ্রাফার’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে কোন বড় অবদান রাখতে না পারলেও ‘বিশ্ব ভ্রমণে’ বোধ করি ইতিমধ্যে একটা ‘বিশ্বরেকর্ড’ করে ফেলেছেন! আরও দু’-চারজন মন্ত্রীর কথা নাইবা বললাম। বিশেষ করে সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারের ভাবমূর্তি আজ কোথায় নিয়ে গেছেন, সরকারপ্রধান এটা স্বীকার না করলেও সাধারণ মানুষ বোধ করি এটা বোঝে। তার কারণেই পদ্মা সেতু ঝুলে গেল! বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে, এটি নিশ্চিত হতে পারছি না। এখন এই কাতারে যোগ দিলেন শাজাহান খান। তাকে কিছু বলার বা শেখানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু তাকে বলতে পারিÑ মাননীয় মন্ত্রী এভাবে নয়। সরকারপ্রধান আপনাকে একটি বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী পদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আপনার এমন কিছু করা ঠিক নয়, যাতে আপনার নিজের, দলের, সেই সঙ্গে সরকারের অসম্মান হয়। মন্ত্রী হলে অনেক সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। বিরোধী দল সমালোচনা করবে। এটাই রাজনীতির নিয়ম। তাই বলে অশোভন আচরণ করবেন কেন?
একজন শাজাহান খানকে নিয়ে পুরো সরকারকে বিচার করা যাবে না, এটা সত্য। কিন্তু এটাও তো সত্য, ‘দুধে এক ফোঁটা চানা পড়লে পুরো দুধই নষ্ট হয়ে যায়’। যে সরকারে শাজাহান খানরা থাকেন, সেই সরকার সম্পর্কে মানুষ যদি কটূক্তি করে, আমি তাতে অবাক হব না। কোন ‘গুণে’ তিনি মন্ত্রী হয়েছেন, আমি বলতে পারব না। এটা সরকারপ্রধানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। সরকারপ্রধানের এটা সাংবিধানিক অধিকারÑ তিনি যে কাউকে মন্ত্রী বানাতে পারেন। তবে মন্ত্রীদের অতীত রেকর্ড বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এমনিতেই সরকারের সামনে নানা সমস্যা। হলমার্ক কেলেংকারি, ডেসটিনি, শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, কোন একটি ক্ষেত্রেও সরকারের জন্য কোন প্লাস পয়েন্ট নেই। আওয়ামী ঘরানার লোক হিসেবে পরিচিত প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার একটি উক্তিও (তুই চোর!) বলে দেয় বুদ্ধিজীবীদের মাঝে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে যেখানে সহনশীলতা খুবই প্রয়োজন, সেখানে কি-না কোন কোন মন্ত্রী ‘মাস্তানসুলভ’ আচরণ করেন! আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্ত্রিসভায় খুব কম সদস্যই আছেন, যাদের আমরা স্মরণে রাখতে পারি। যাদের কথা আমরা ‘রেফার’ করতে পারি। একজন শাজাহান খান আমাদের জন্য কোন গৌরব বয়ে আনবেন না। আর বন ও পরিবেশমন্ত্রী সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে চাই না। রাজনীতিতে নতুন। শুধু সরকারপ্রধানের কাছের মানুষ হওয়ার সুবাদে কোনরকম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই হঠাৎ করে মন্ত্রী হয়ে গেলেন। খালেদা জিয়া সম্পর্কে জনগণকে ভুল তথ্য দেয়া ঠিক নয়। তার বক্তব্যে একটি সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ রয়েছে। তাকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরের সমালোচনা হতেই পারে। সেটা হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক।
মন্ত্রীরা যদি এভাবে আচরণ করেন, তাহলে আমরা যাই কোথায়! পরবর্তী প্রজš§ কি শিখবে সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের কাছ থেকে? তারা তো জুনিয়রদের তৈরি করবেন ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য। তারা তো শেখাবেন। কিন্তু একজন শাজাহান খান কিংবা একজন হাছান মাহমুদ আমাদের ভালো কিছু শেখাতে পারছেন না। পরবর্তী প্রজšে§র কাছে তারা কোন ‘আদর্শ’ নেতা নন।
Daily JUGANTOR
10.11.12

0 comments:

Post a Comment