যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর বাকি আছে মাত্র কয়েকটি দিন। ৮ নভেম্বর সেখানে নির্বাচন। কিন্তু এরই মাঝে এই নির্বাচন যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা কেউই আশা করেনি। শুধু তাই নয়, এই বিতর্ক ও প্রার্থীদের অশোভন আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে একটি বড় প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিশেষ করে তিন তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে রিপাবলিকান পার্টি মনোনীত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিপক্ষ প্রার্থী হিলারি কিনটনকে ব্যক্তিগতভাব আক্রমণ করে যেসব বক্তব্য রেখেছেন, তাতে বিস্মিত হয়েছেন অনেকে। এ ধরনের অশোভন বক্তব্য একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর কাছ থেকে কেউ আশা করেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ওইসব বক্তব্যের মধ্য দিয় শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই কলুষিত করলেন না বরং তার দলকেও বিতর্কিত করলেন। খোদ রিপাবলিকান পার্টি শিবিরে এ নিয়ে বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির অনেক সিনিয়র নেতা ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। রিপাবলিকান পার্টি সমর্থক অনেক বুদ্ধিজীবীও হিলারিকে সমর্থন করেছেন। হিলারির ড্রাগ টেস্ট করা, তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানোর হুমকি, ‘নষ্ট মহিলা’, ‘মিথ্যাবাদী’Ñ এ ধরনের শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরো নির্বাচনীব্যবস্থাকে একটি প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিয়েছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলে, সেখানে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্যে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিনি প-িতরা। তারা বলেছেন, ট্রাম্প মার্কিন গণতন্ত্রকে ছুরিকাঘাত করেছেন। ফ্রান্সের অন্যতম বুদ্ধিজীবী ডমিনিক মইসি (উড়সরহরয়ঁব সড়রংর) ফ্রান্সের লেস ইকোস পত্রিকায় এক কলাম লিখেছেন, ‘ট্রাম্প এন্ড দি এন্ড অব ডেমোক্রেসি (ইংরেজি অনুবাদ)। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের নব্যমুসোলিনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরও মন্তব্য করেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রাম্প গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি। লন্ডনের বিখ্যাত ‘দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস’-এ গিডন রাকমান এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্প খোদ যুক্তরাষ্ট্রর জন্য একটি বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয় বরং বিশ্বর সর্বত্র গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছেন। এই সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প, একজন ব্যবসায়ী, পৃথিবীর অনেক দেশে তার ব্যবসা রয়েছে, তিনি হতে চান যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট! তিন তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক আমি দেখেছি। একজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যে ভাষায় কথা বলেন, তার বডি ল্যাংগুয়েজ, তার ভাষাজ্ঞান আমাকে অবাক করেছে। যখন অক্টোবরের শেষের দিকে আমি এই নিবন্ধটি রচনা করছি তখনো কোনো কোনো রানী দাবি করছেন, অতীতে তিনি ট্রাম্প কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এখানকার টিভি চ্যানেলগুলো দেখেছে একজন পর্নোস্টারও অভিযাগ করেছেন ট্রাম্প তাকে দশ হাজার ডলারের বিনিময়ে তার সঙ্গ উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। আরেকজন অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প তার শরীরের সংবেদনশীল অংশে স্পর্শ করেছিলেন। এর পেছনে সত্যতা আছে কী নেই সে প্রশ্ন ভিন্ন। কিন্তু যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চান, তার সম্পর্কে যখন একের পর এক অভিযোগ ওঠে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা দেয় বৈকি!
বেশ কয়েক মাস ধরে আমি ডালাস আর নিউইয়র্কে অবস্থান করে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রত্যক্ষ করছি। প্রথম থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্কিত ছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। আমি অবাক হয়েছি যখন দেখেছি তিনি রিপাবলিকান পার্টির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন। এর কারণ হচ্ছে তিনি রিপাবলিকান পার্টির উঁচু স্তরের কোনো নেতা ছিলেন না। কোনোদিন আইনসভার সদস্য, কোনো রাজ্যের গভর্নরও তিনি ছিলেন না কখনো। তিনি ব্যবসায়ী। ব্যবসা নিয়েই পার করেছেন সারাটা জীবন। হঠাৎ করেই তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হয়ে গেলেন। এটা অনেককেই অবাক করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে যেটা কাজ করছে, তা হচ্ছে তার উগ্র বক্তব্য। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের এক নম্বর শক্তিতে পরিণত করার তার অভিপ্রায়। যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড়সংখ্যক জনগোষ্ঠী মনে করে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হলে একজন ‘শক্ত নেতা’ দরকার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাঝে সেই ‘শক্ত নেতার’ ছবি খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেওয়া, মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করাÑ ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্য শুধু তার জাতিগত বিদ্বেষের চরিত্রটিই ফুটে ওঠে না বরং তা এক বিপজ্জনক পরিস্থিতিও সৃষ্টি করেছে। মুসলমানরা এক ধরনের শঙ্কার মাঝেই আছেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তারা বিপদে পড়তে পারেন, এমন শঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করছে। তুলনামূলক বিচারে হিলারি কিনটনের আচরণ এত উগ্র নয়। তিনটি টিভি বিতর্কে আমি তাকে দেখেছি অত্যন্ত ভদ্রজনিত আচরণের মধ্য দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে। কখনো তাকে উত্তেজিত অবস্থায় দেখিনি। এ জন্যই জনমত জরিপে তিনি এখনো এগিয়ে আছেন এবং জনমত জরিপ সত্য হলে তিনি হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। হিলারি কিনটন একজন তরুণ আইনজীবী হয়ে রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। করপোরেট আইনজীবী না হয়ে তিনি শিশু অধিকার, মাতৃ অধিকার নিয়ে তার কর্মময় জীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে ফার্স্ট লেডি, নিউইয়র্কের সিনেটর এবং সর্বশেষ ছিলেন সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তুলনামূলক বিচারে রাজনীতি, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে তার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে এবং তিনি অভিন্ন। পররাষ্ট্র তথা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই। ন্যাটো প্রশ্নে, আইএস প্রশ্নে, ব্রেক্সিট প্রশ্নে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তার অজ্ঞতাই প্রমাণ করেছে। বাফটা ও টিপিপি চুক্তির ব্যাপারেও তার অবস্থান হিলারির বিপরীতে। তিনি মনে করেন বাফটা ও টিপিপি চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বেড়েছে। অথচ হিলারি মনে করেন ওই দুটো চুক্তির কারণে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে বেশি। ট্রাম্প মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চান। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন মেক্সিকানরা মার্কিন অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন আছে ট্রাম্পের। ডেমোক্র্যাটরা গত আট বছরে (ওবামা প্রশাসন) যুক্তরাষ্ট্রকে চিনের হাতে তুলে দিয়েছেÑ এ অভিযোগ ট্রাম্পের। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন চিনের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কই নয়াবিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার অন্যতম শর্ত। ওবামার শাসনামলে আইএসের জন্ম হয়েছে এবং এ জন্য ডেমোক্র্যাটরাই দায়ীÑ ট্রাম্পের এ ধরনের অভিযোগ স্বীকার করেন হিলারি কিনটন। হিলারি বলেছেন, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ১২২টি দেশ সফর করেছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মাইল পথ ভ্রমণ করেছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যই। অথচ ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। তবে ট্রাম্পের একটা প্রমাণ পয়েন্ট হচ্ছে, তিনি সোজাসাপটা কথা বলেন। আক্রমণ করে কথা বলেন, যা হিলারি করেন না কখনো। তিনি তার বক্তৃতায় ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন সত্য, কিন্তু তা অনেক মার্জিত ভাষায়। তাই একটি প্রাক-গবেষণায় (সিন কোলার্যান্সি কর্তৃক পরিচালিত) যখন হিলারিকে সর্বোচ্চ নির্বাচনম-লীর ভোটে বিজয়ী হবেন বলে মন্তব্য করা হয়, আমি তাতে অবাক হই না। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ৫৩৮টি নির্বাচকম-লীর ভোটে হিলারি পাবেন ৩৪৭ ভোট আর ট্রাম্প পাবেন ১৯১ ভোট। নির্বাচকম-লী গঠিত হয় কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ে। অর্থাৎ হাউস অব কংগ্রেসের ৪৩৫ আর সিনেটের ১০০ সিট নিয়েই ৫৩৮টি নির্বাচকম-লীর ভোট। ৫০টি রাজ্যের নির্বাচকম-লীর ভোটও আলাদা। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকম-লীর ভোট ৫৫ আর নিউইয়র্কের ২৯। জনগণ ভোট দেন বটে। কিন্তু তারা প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করেন না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাজ্যে যে প্রার্থী বিজয়ী হবেন তিনি নির্বাচকম-লীর প্রতিটি ভোট পেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হয়।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিতর্ক ঘিরে ধরেছে দুই প্রার্থীকে। হিলারি কিনটনের ইমেইল বিতর্ক তাকে যথেষ্ট ভোগাচ্ছে। সর্বশেষ টিভি বিতর্কেও তিনি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্ধারিত ইমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করে বিদেশে যোগাযোগ করেছেন। ওইসব ইমেইলের কিছু অংশ ফাঁস হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের দাবি ট্রাম্পের প্ররোচনায় রাশিয়ার হ্যাকাররা ওই ইমেইল ফাঁস করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন হিলারি কিনটনের বাকি সব ইমেইল প্রকাশ করা হোক। এটা নিঃসন্দেহে হিলারি কিনটনের জন্য একটি মাইনাস পয়েন্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বিপদে আছেন। ডেমোক্র্যাট শিবির তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার। দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি ফেডারেল সরকারকে কোনো ট্যাক্স দেননি। এটা ট্রাম্প স্বীকারও করেছেন। তবে নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক না কেন, এখন ট্রাম্পের নানা বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর একটা কালো দাগ এঁকে দিয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে তিনি বিতর্কিত করেছেন। মানুষের কাছে প্রচুর টাকা হলে তিনি যে কী করতে পারেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বড় প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নানা মন্তব্য করে। সমালোচনা করে। এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হলো। নির্বাচন একটি হবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একজন নয়া প্রেসিডেন্ট পাবে, যিনি ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে কী পরিবর্তন আসে, সেটাই দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক দেশের সম্পর্কের অবনতি হবে। বিশ্বে উত্তেজনা বাড়বে। আর যদি হিলারি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন, তাতে করে তিনি ওবামার অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি পরিবর্তন আনবেন- এটা সত্য। তবে বড় পরিবর্তন আসবে না। যুক্তরাষ্ট্রের গত ২৪০ বছরের ইতিহাসে এটা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে, যদি একজন নারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।
Daily Amader Somoy
01.11.2016









দেখা যায় ভারত মহাসাগরভুক্ত বিভিন্ন দেশে এই দুটি দেশ নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। জিবুতি, গাওদার, হামমানতোতা (শ্রীলঙ্কা), মিয়ানমার, ইয়েমেন, মুজাম্বিক, মাদাগাস্কার, ওমান কিংবা কেনিয়াতে চীন নৌঘাঁটি নির্মাণের আগ্রহের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। জিবুতি ও মাদাগাস্কারে নৌঘাঁটি নির্মাণ শেষ হয়েছে। ভারত একইভাবে সিসিলি ও মৌরিতুসে নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। ২০১৫ সালের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই দীপ রাষ্ট্র দুটি সফরের সময় এই নৌঘাঁটি নির্মাণের কথা প্রথমবারের মতো জানা যায়। ভারত এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ফলে এ অঞ্চলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সখ্য গড়ে উঠছে, যা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করবে আগামীতে। ফলে চীনের ‘মেরিটাইম সিল্ক রুট’ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। তবে আমরা বাংলাদেশের ‘জাতীয় স্বার্থ’কে অবশ্যই বিবেচনায় নেব। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত হবে। পারস্য অঞ্চলের জ্বালানি তেল চীন এ পথে খুব অল্প সময়ে এবং মধ্য এশিয়ার তেল চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই জ্বালানি তেলের ওপর চীন নির্ভরশীল। চীনের অর্থনৈকি উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। একই সঙ্গে চীন এই অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশকেও সংযুক্ত করতে চায়। এটা করতে হলে কুনমিং-কক্সবাজার সড়ক পথ (যাতে পরে কলকাতা সংযুক্ত হবে) নির্মাণ শেষ করতে হবে। ২০১৩ সালে চারটি দেশ নীতিগতভাবে রাজি হয়েছিল এই সড়কপথ নির্মাণের ব্যাপারে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ২০১৪ সালে চীন যান তখন তিনি কুনমিংয়ে এক বৈঠকে বলেছিলেন বাংলাদেশ কুনমিং-কক্সবাজার সড়কপথ নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহী। অতি সম্প্রতি সৈয়দ আশরাফও বলেছেন চীনের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপানের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে। এখন যৌথ ইশতিহারে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের লাভ হচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পথে চীনা পণ্য আমদানি করতে পারবে। তাতে সময় বাঁচবে ও পণ্যের মূল্য কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশ সংযুক্ত হতে পারে। এতে করে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক করিডর ব্যবহার করে এশিয়া থেকে জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) আমদানি করতে পারে। সুতরাং চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি চীনের স্বার্থে রচিত ও বাস্তবায়িত হলেও বাংলাদেশের স্বার্থকে একেবারে ফেলে দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কক্সবাজারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত না হলে চীনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। চীন কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল। এতে করে আমরা লাভবান হতে পারতাম। কিন্তু ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলায় শ্রীলঙ্কার হামমামতোতায় নির্মিত গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্যাপারেও চীন নিরাপত্তার প্রশ্নটি তুলেছিল। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি এবং সর্বশেষ চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা সব মিলিয়ে চীনের ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’-এর ব্যাপারে একটা প্রশ্ন রেখে গেল। চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় (২০১৪) সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু তখন তা হয়নি। তখন এর পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে মতান্তরের কথা পত্রিকায় ছাপা হলেও মূল বিষয় ছিল ভারতের আপত্তি। 







