রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রসঙ্গ কথা


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করেছেন। ওবামা প্রশাসনের আমলে তিনি এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফর করলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ছয় মাসের মধ্যে তিনিই দক্ষিণ এশিয়ার সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি, যিনি ওয়াশিংটন সফর করলেন। এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হলো, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রশাসন ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে যে নীতি প্রণয়ন করেছিল, তা ট্রাম্প প্রশাসন অব্যাহত রাখল। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই, বারাক ওবামা দু-দুবার ভারত সফর করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ওই সময়। শুধু তা-ই নয়, ওবামা তাঁর সর্বশেষ সফরে (জানুয়ারি ২০১৫) ভারতের ‘রিপাবলিকান ডে’র অনুষ্ঠানে মার্চপাস্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওবামার সঙ্গে প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ভারতে এসেছিলেন। ভারত একটি বিশাল বাজার। অনেক আগেই ভারত দেশটির অর্থনীতি ‘ওপেন’ করে দিয়েছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা প্রবেশ করতে চায়। এরই মধ্যে আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠান ভারতে ‘ব্যবসা’ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এই সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেয়, এটা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, এ সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয়রা ট্রাম্পের প্রচারণায় কয়েক মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল। তখনই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে তিনি আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করার মাত্র ছয় মাসের মাথায় মোদি যখন রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রিত হন, তখনই এটা নিশ্চিত হয়ে যায় এই সম্পর্ক আগামী দিনে আরো উন্নত হবে। মোদির এই সফরে অনেক প্লাস পয়েন্ট আছে। এক. তিনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের আগেই হোয়াইট হাউসে দাওয়াত পেলেন। এটা মোদির কূটনৈতিক বিজয় এবং পাকিস্তানের জন্য এক ধরনের ‘কূটনৈতিক পরাজয়ের’ শামিল। দুই. গত ২৬ জুন হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় সন্ত্রাস দমন তথা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করছে। যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, পাকিস্তান যেন সন্ত্রাসীদের তার মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে আক্রমণ চালাতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত এবং সেখান থেকেই তারা ভারতে আক্রমণ চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এটা এখন স্বীকার করে নিল। পাকিস্তানে গঠিত ও প্রশিক্ষিত দুটি জঙ্গি সংগঠন ‘জইশ-ই-মোহাম্মদ’ ও ‘লস্কর-ই-তৈয়বা’র ব্যাপারে ও তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে—এ কথাও যৌথ বিবৃতিতে আছে। উপরন্তু কাশ্মীরের জঙ্গি নেতা তথা ‘হিজব-উল মুজাহিদীন’-এর নেতা সৈয়দ সালাউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে এটা ভারতের ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্বীকার করে নিয়েছে। তিন. মোদির ওয়াশিংটন সফর ও ট্রাম্প-মোদি যৌথ বিবৃতি পাকিস্তান সমালোচনা করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যারা কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন করে, তাদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। ’ এর অর্থ পরিষ্কার, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে!
সন্ত্রাস দমনে ভারতের অবস্থান এখন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সমর্থিত হওয়ায় বিশ্বে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো এবং পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল হলো। পাকিস্তান যে সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়, তা-ও এখন ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিল। চার. ভারত এখন ২.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্রয় করবে। এর মধ্যে ড্রোন বিমানও আছে। ভারত যুক্তি দেখিয়েছিল, ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করার জন্যই এই ‘ড্রোন বিমান’ ব্যবহৃত হবে। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তপ্রতিযোগিতা বাড়বে। পাকিস্তান এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকবে। তারাও বিভিন্ন সূত্র থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করবে। এরই মধ্যে চীন পাকিস্তানে ১০০ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে বলে ঘোষিত হয়েছে। পাঁচ. মোদির এই সফর ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চীনও ভালো চোখে দেখবে বলে মনে হয় না। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে একটা প্রশ্নের মুখে আছে। ব্রিকস ও ব্রিকস ব্যাংক গঠিত হওয়ার পর একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে ভারত ও চীন যৌথভাবে বিশ্ব আসরে কাজ করবে। বিশেষ করে মার্কিনি আগ্রাসন ও মার্কিনি স্বার্থের বিরুদ্ধে চীন ও ভারত (সেই সঙ্গে রাশিয়া) একসঙ্গে কাজ করবে এবং মার্কিনি স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করবে। কিন্তু ট্রাম্প মোদিকে এই অ্যালায়েন্স থেকে বের করে আনতে পেরেছেন কি না, সেটাই দেখার বিষয় এখন। এর মধ্যেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। মোদি যখন ওয়াশিংটনে তখন চীন-ভারত সীমান্তে কিছুটা উত্তেজনা লক্ষ করা গেছে। সিকিমের সীমান্তরেখা অতিক্রম করে চীনা সেনারা ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত দুটি বাংকার গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, চীন তিব্বতের নাথুলা মাস দিয়ে ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মানস সরোবরে যাওয়ার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে প্রতিবাদপত্রও পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা প্রভাব কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দিনে ভারতকে ব্যবহার করতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলো ও সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের বিরোধ রয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতীয় নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধজাহাজ সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের গভীর সমুদ্রে ভারতীয় কম্পানি তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। ভারতীয় এসব কর্মকাণ্ড চীন ভালোভাবে নেয়নি। অন্যদিকে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি ভারত সমর্থন করেনি। এই মহাপরিকল্পনায় বিশ্বের ৬৫টি দেশ অংশ নিলেও ভারত যোগ দেয়নি। এই মহাপরিকল্পনার একটি অংশ হচ্ছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর, যা চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সাগরকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। ভারত এ ব্যাপারে তার আপত্তি জানিয়েছে। কেননা এই অর্থনৈতিক করিডরের একটি অংশ পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের ওপর দিয়ে গেছে, যা ভারত তার নিজের এলাকা বলে মনে করে। ট্রাম্প প্রশাসন চীন-ভারত দ্বন্দ্বকে নিজের কাজে লাগাতে চায়। ছয়. মোদির এই সফরে আফগান ইস্যুতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আফগানিস্তানে একটি ‘বড় ভূমিকা’ পালন করুক। আফগান স্ট্র্যাটেজিতে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসঙ্গে কাজ করবে। এর ফলে আফগান সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, তা একটা প্রশ্ন হয়েই রইল। কেননা আফগান ইস্যুতে পাকিস্তানকে যদি অন্তর্ভুক্ত করা না যায়, তাহলে আফগান সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এতে সংকট আরো বাড়বে। পাকিস্তান তালেবানদের সঙ্গে একটি ‘সংলাপ’-এর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। উপরন্তু তালেবানদের পাশাপাশি সেখানে ইসলামিক স্টেট-এর জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতাও বাড়ছে। ফলে আফগান ইস্যুতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কতটুকু ফল দেবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন।
মোদির ওয়াশিংটন সফর নিঃসন্দেহে ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য। ট্রাম্প মোদির এই সফরকে দেখছেন তাঁর ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি মোদির কাছে ভারতের বাজার আরো উন্মুক্ত করে দিতে বলেছেন, যাতে মার্কিন বিনিয়োগ আরো বাড়ে। ট্রাম্প বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথাও বলেছেন। বলা ভালো, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র ভারতে রপ্তানি করেছে সাত হাজার ৬৯৪.৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ আমদানি করেছে ১৫ হাজার ১৪০.৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য ঘাটতি (চার মাসে) সাত হাজার ৪৪৫.৯ মিলিয়ন ডলার। যদি ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান দিই, তাতে দেখা যায় এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৩৮০.১ মিলিয়ন ডলার (২০১৫ সালে এই ঘাটতি ছিল ২৩ হাজার ৩৩৭.১ মিলিয়ন ডলার)। একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেবেন, এটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন ট্রাম্প। ‘ফরবিস’ যে ১৫টি দেশকে বিনিয়োগের জন্য ‘উত্তম’ বলে বিবেচনা করছে, ভারত তার অন্যতম। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলো ভারতে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
বলা হয়, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের একটা কৌশলগত দিক রয়েছে। ওবামা প্রশাসনের আমলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। এই চুক্তিবলে উভয় দেশ তার নিজ দেশের সামরিক ঘাঁটি অন্য দেশকে ব্যবহার করতে দেবে। এর অর্থ হচ্ছে, আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পারসীয় অঞ্চলের সংকটে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিকভাবে জড়িত হয়, তাহলে ভারতীয় বিমান ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী রিফুয়েলিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। অতীতে চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে (নভেম্বর ১৯৯০-জুন ১৯৯১) ভারত এই অধিকার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু বিতর্ক ওঠায় পরে তা বাতিল করা হয়। মোদি সরকার আবার এই সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। ২০০৮ সালে বিগত ইউপিএ সরকার চুক্তিটি স্বাক্ষর করলেও মোদি সরকারের সময় এটি অনুমোদিত হয়। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতে একটি পারমাণবিক চুল্লি বসাবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকাজে ব্যবহৃত হবে। একটি বীমা তহবিলও গঠন করা হবে। ওবামা প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে ভারত ছোট আকারের ‘সাভেন মিনি’ নামে ছোট ড্রোন বিমান তৈরি করবে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি অতি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তিবলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিস টাটা কম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ভারতে F-16 বিমান নির্মাণ করবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত অংশীদার’। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগর ক্রমান্বয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের ‘মুক্তার মালা’ স্ট্র্যাটেজির (String of Pearls) আওতায় চীন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এখানে গাওদার সমুদ্রবন্দর চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চীনা বাহিনীর ছোট্ট ইউনিট রয়েছে, যা ভারত মহাসাগরের নৌ-মুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে চীন শ্রীলঙ্কা সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। বেশ কয়েকটি বন্দরে রয়েছে চীনা উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে, তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে টিকফা চুক্তি করেছে। এখন ‘আকসা’ চুক্তি করতে চাচ্ছে। ট্রাম্প-মোদি যৌথ বিবৃতিতে ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ দমনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার’ কথা বলা হয়েছে। ফলে এই তথাকথিত ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’ দমন আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ এর বাইরে থাকবে না।
মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হলো। এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও সেই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার বিষয় এখন।
Daily Kaler Kontho
04.07.2017

0 comments:

Post a Comment