রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে গত শুক্রবার। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আভাস দিয়েছেন যদি বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয় তাহলে তিনি দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেবেন! যেখানে এখন অবধি দশম জাতীয় সংসদ গঠিতই হয়নি, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। প্রধানমন্ত্রী সরকারের মূল শক্তি। এখন তিনি যখন আভাস দেন দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হতে পারে, তখন একটা জিনিস অন্তত আমার কাছে স্পষ্ট আর তা হচ্ছে দশম সংসদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নিজেও সন্দিহান! তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ। তিনি অতীত ইতিহাস জানেন। সবার অংশগ্রহণ যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেই সংসদ স্থায়িত্ব পায় না। এখন বাংলাদেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত হয়নি। এখন হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তারিখ অনেক আগেই ঘোষিত হয়েছে। কিছু আসনে নির্বাচন হবে বটে; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মতো শক্তি ইতোমধ্যে ‘সঞ্চয়’ করে ফেলেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। কিন্তু এরপর কী?
বাংলাদেশের সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় রাজনীতি পুনপ্রবর্তিত হওয়ার বাইশ বছরের মধ্যে এই সংসদীয় রাজনীতি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ল। যদিও এর প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল দু’বছর আগে, যখন সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হয়েছিল। সংবিধানে সর্বশেষ মহাজোট সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থায় সর্বশেষ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী (নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য) হিসেবে রেখে দেয়া হয়েছে। সেই হিসেবে শেখ হাসিনা আজ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু একজন দলীয় প্রধানকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেখে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয়, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবার প্রমাণিত হলো।’ ইতোমধ্যে আমরা জেনে গেছি, ১৫৬ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন! এমনকি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ তার প্রার্থী বাদ প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। তিনিও এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি। কাউকে লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ না করার কথা বললেও ইতোমধ্যে তা বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে দশম সংসদ নির্বাচন একদিকে যেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সংসদীয় পদ্ধতিও।
এটা সংসদীয় রাজনীতি নয়। সংসদীয় রাজনীতির যে স্পিরিট তা এখানে নেই। নেই কোনো শক্ত বিরোধী দলের অবস্থান। যা কিনা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ। আস্থা ও বিশ্বাসের যে কথা গণতন্ত্রে বলে তাও এখানে অনুপস্থিত। বিরোধী দলের শীর্ষ প্রায় নেতাই জেলে। কেউ বা আবার রয়েছেন আত্মগোপনে। মামলা আছে এখনো সবার বিরুদ্ধে। কেউ কেউ সম্প্রতি আদালত থেকে জামিনও পেয়েছেন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের জন্য দরকার সব দলের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ জরুরি। দরকার স্থিতিশীলতা। দরকার পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন। কিন্তু সংবাদপত্রে যখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের অবরোধের ছবিগুলো দেখি তখন দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। যেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণটা জরুরি সেখানে এদের সবার নামেই মামলা! হয়তো আজ বা আগামীকাল আমরা দেখব আরেকটি ‘কমান্ডো স্টাইলে’ গ্রেফতারের কাহিনী। এতে কি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে? এটা সত্য, বিরোধী দল এই অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কি বিশ্বাস করতে হবে এসব নেতা বাসে পেট্রোল বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন! পত্রিকায় দু’একজন দুষ্কৃতকারীর ছবিও ছাপা হয়েছে, যারা বাসে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশ এদের গ্রেফতার করতে পারেনি কেন? এসব দুষ্কৃতকারীর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এরা রাজনীতি করে না। এরা সন্ত্রাসী। যারা পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ মারে, সাধারণ মানুষদের পুড়িয়ে দেয়, অসহায় করে দেয় একটা পরিবারকে তারা তো জনগণের ‘বন্ধু’ হতে পারে না। এরা জনগণের শত্র“। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তবে এটাও সত্য, ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে যদি বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেয়া হয়, তাহলে তো আস্থার জায়গাটা আর থাকে না। অবরোধের কারণে আমরা এখন ‘জিম্মি।’ স্থবির হয়ে গেছে জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ আজ আর ঘর থেকে বেরোতে সাহস পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি কোনো ভালো কথা বলে না। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সেক্টর থেকে পাচ্ছি একের পর এক নেতিবাচক সংবাদ। বৈদেশিক আয়ের একটা বড় উৎস হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই তৈরি পোশাক রফতানিতে এখন স্থবিরতা এসেছে। কমে গেছে অর্ডার। এর প্রভাব কারখানাগুলোতে পড়তে পারে। বাদ হয়ে যেতে পারে অনেক কারখানা। এমনকি বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যায় পড়তে পারেন গার্মেন্টস মালিকরা। তাদের সাদা পতাকা মিছিল প্রমাণ করে তারা আজ কত অসহায়। কিন্তু অর্থনীতিতে সুবাতাস যে বইবে তার কোনো লক্ষণ দেখছি না।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক সংকট দেশকে পিছিয়ে দেবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা এসব নিয়ে ভাবেন না। খবর বের হয়েছে প্রতিটি ট্যানারিতে চার কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্য আটকে আছে। রফতানি করা যাচ্ছে না। শিল্প খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চরম আতঙ্কে আছেন উদ্যোক্তারা। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছেন তৈরি পোশাকের মালিকরা। হরতাল আর অবরোধের কারণে তাদের মাথায় হাত। তাদের সংস্থা বিজিএমইএ’র হিসেব মতে, হরতাল ও অবরোধের কারণে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে গত দেড় মাসে ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। একটা দেশের জন্য এই বিপুল ‘ক্ষতি’ কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এর রেশ আগামীতে কোথায় গিয়ে পৌঁছবে ভাবতেই আতকে উঠতে হয়! আর একটা জিনিস আমরা অনেকেই চিন্তা করছি না যে, অবরোধ যদি এভাবে চলতেই থাকে তাহলে দেশের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হবে। অর্থনীতি সচল না হলে ভ্যাট আদায় হবে না। আর ভ্যাট আদায় না হলে রাষ্ট্রের আয় কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-পাওনা পরিশোধ করায় একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে নোট ছাপিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে বলতে পারে, তাতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যে যেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি গেল বছর ছিল ৬ দশমিক ২ ভাগ, তা কমে এসে ৫ দশমিক ২ ভাগে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এনবিআর আমাদের জানাচ্ছে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। দৈনিক পত্রিকাগুলো আমাদের জানাচ্ছে (১৭ ডিসেম্বর) বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের সঙ্গে এখন দেশের আমদানি-রফতানিবাণিজ্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দেশগুলো এখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছে। একটি উদ্বেগজনক সংবাদও দিয়েছেন এক প্রতিবেদক। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত বিশ্বের আমদানিকারক দেশগুলো। তাদের এ শঙ্কার কথা জানিয়ে এরই মধ্যে ৩৫ দেশের বায়াস প্রতিষ্ঠান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা ব্যবসার পরিবেশ না পেলে ভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন। বেশ ক’টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা বিষয়টি কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন আমি জানি না। কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আগামী ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলতে থাকবে বলে আমার ধারণা। কেননা নির্বাচন বাতিল করার আর কোনো সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ৫ জানুয়ারির আগে আর দু’পক্ষের মধ্যে কোনো সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সংলাপ কার্যত এখন ব্যর্থ। আমরা বারবার বলছি, আমাদের রাজনীতিবিদদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের রাজনীতিবিদরা সমস্যার সমাধানে যদি ব্যর্থ হন, তাহলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। সাধারণ মানুষকে ‘জিম্মি’ করে যে রাজনীতি, তা দেশ ও জাতির কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারে না। বরং পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখার যে সংস্কৃতি এই সংস্কৃতি জাতির মঙ্গল ডেকে আনতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী একাদশ সংসদ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা অনভিপ্রেত। এই মুহূর্তে এটা নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। সব দলের অংশগ্রহণের যে সংস্কৃতি, সেই সংস্কৃতি যদি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে নির্বাচনের তারিখ আদৌ পিছিয়ে দেয়া যায় কিনা, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। সংবিধানে ১১নং ধারায় বলা আছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ সেই সঙ্গে সংবিধানের ১২৩(৪) ধারাটিও আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। এই ধারায় ‘সংসদের শূন্য আসন’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনের মতে কোনো দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয় তাহা হইলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ এই ধারাটি এখন বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। যদিও এখানে ‘দৈব-দুর্বিপাকের’ কথা বলা হয়েছে। এখন রাজনৈতিক সংকটকে ‘দৈব-দুর্বিপাক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না, এটা সত্য। কিন্তু এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে একটি রেফারেশন সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে। এককভাবে নির্বাচন করলে বিরাজমান সমস্যার কোনো সমাধান দেবে না। বরং প্রশ্ন উঠবে সংবিধান লঙ্ঘনের। প্রশ্ন উঠবে সংবিধানের ১১, ১২১, ১২২(২) ধারাগুলো কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না। এই নির্বাচন আমাদের কী দেবে? যেখানে প্রধান প্রধান দলগুলোর আদৌ কোনো অংশগ্রহণ নেই, সেখানে ক্ষমতাসীন দল ও জোটকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে বটে। কিন্তু জনমানসে এটা একটা বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
অনেকেই যুক্তি দেখান সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার। এটা ঠিক ২৪ তারিখের (২০১৪) মধ্যে নির্বাচনটা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারানকো যে সংলাপের সূচনা করেছিলেন এবং যার ধারাবাহিকতায় তিনটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এটা অব্যাহত রাখা যেত। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের কাছে একটা রেফারেন্স চাওয়া যেত। আমরা ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’র খবর জানি। ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটির’ আলোকে উচ্চ আদালত এই নির্বাচন ন্যূনতম দুই থেকে চার মাস পিছিয়ে দিতে পারেন। উচ্চ আদালত জাতির ক্রান্তিলগ্নে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়ে মহাসংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করেন। এখন সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সরকার চাইলে সংলাপ অব্যাহত রাখতে পারে। এমনকি সংলাপ ও বিএনপি যে নির্বাচনকালীন একটি কাঠামোর কথা বলছে, সেটাকে ভিত্তি ধরে আলোচনা অব্যাহত রাখা যায়। তাই প্রয়োজন দূরদর্শিতার। বল এখন সরকারের কোর্টে। অর্থনীতির মন্দাভাব আর মার্কিন কংগ্রেস উইম্যান গ্রেস কিংয়ের বক্তব্যের পর আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করব সরকার ইতিবাচক একটি সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমরা সংকটমুক্ত হ’ব। এই সংকটের গভীরতা আরো বাড়বে যদি সত্যি সত্যিই শেষ পর্যন্ত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে, তারা নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। এটা সরকারের জন্য একটা ‘সেট ব্যাক।’ সম্ভবত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে এই নির্বাচনে ‘কারচুপি’(?) কোনো সম্ভাবনা নেই। যেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই, সেখানে ‘কারচুপির’ সম্ভাবনাও নেই। তবে পর্যবেক্ষকদের অনুপস্থিতি একটা বাজে ‘মেসেজ’ বিশ্বে পৌঁছে দেবে। সরকারের জন্য তা কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না।
এখন ৫ তারিখের নির্বাচনের শিডিউল যদি পরিবর্তন করা না হয় তাহলে অনেক ঘটনা ঘটতে পারে। ১. বিরোধী দল তাদের আন্দোলন আরো প্রলম্বিত করবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিন থেকে শুরু করে পরের দিনগুলোতে আমরা লাগাতার অবরোধ প্রত্যক্ষ করতে পারি; ২. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। উত্তর বঙ্গে জাতীয় পার্টির ভোটব্যাংকে ধস নামতে পারে; ৩. দাতা রাষ্ট্রগুলোর ‘পর্যবেক্ষণের’ মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ সরকার; ৪. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধে সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারে; ৫. অর্থনীতির মন্দাভাব জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে রাস টেনে ধরবে। এটা ৫-এর নিচে নেমে যেতে পারে।
তাই এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ঢাকা অনেকটা ‘স্বাভাবিক’ হলেও দেশের সর্বত্র স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে বলা যাবে না। যৌথবাহিনী তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। আমরা আশা করব তাদের কার্যক্রম শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমনের কাজে যেন ব্যবহৃত না হয়। দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করা হোক। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। তবে বিরোধী দলের সঙ্গে ‘সংলাপ’ অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের স্থায়ী রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সরকার একটি কমিশন গঠন করুক। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিক। বিরোধী দলের মতামতও নিক। প্রয়োজনে একটি স্থায়ী কাঠামো সংবিধানে সংযোজন করা হোক। বাস্তবতা হচ্ছে ৫ তারিখের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ গঠিত হবে বটে। কিন্তু এই সংসদের গ্রহণযোগ্যতা নেই, এটা বিবেচনায় নিয়েই ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনের স্বার্থে সরকার উদ্যোগী হয়ে ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ কাঠামো তৈরি করবে যা একাদশ সংসদের নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করবে অথবা বিকল্প হিসেবে ‘উচ্চ আদালতের কাছে’ একটা ‘রেফারেন্স’ চাইতে পারে, যাতে নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দেয়া যায়।
Daily Manobkontho
23.12.2013

0 comments:

Post a Comment