রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে ভারতেই বিতর্ক রয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প-সংক্রান্ত একটি সংবাদ আমাদের অনেক উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ওই সংবাদে বলা হয়, ভারতে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, ওই কমিটির পঞ্চম বৈঠকে মানস-সংকোশ-তিস্তা-গঙ্গা সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সংবাদে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। বেশকিছু প্রশ্ন সামনে রেখে এ সিদ্ধান্তটিকে বিশ্লেষণ করা যায়। এক. যেখানে ভারতের পরিবেশবাদীরা এবং সিনিয়র প্রকৌশলীরা এ প্রকল্পকে অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য বলছেন এবং এর বিরোধিতা করে আসছেন, সেখানে হঠাৎ করে মোদি সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কেন উদ্যোগ নিচ্ছে? দুই. যেখানে গেল জুনে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ৬৫ দফা সংবলিত যৌথ ঘোষণার ২১নং দফায় অঙ্গীকার করা হয়েছে ‘ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়’, সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে কি যৌথ ঘোষণায় দেয়া এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হল না? তিন. ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভার নির্বাচন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কি বিধানসভার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক আছে? চার. তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ‘আস্থার সম্পর্কে’ কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলে কি ভারতের কোনো কোনো মহল তিস্তা থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে রাখতে চায়? আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন, কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের কথা বলা, কিংবা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক- সবকিছু এখন নানা ‘কিন্তু’ এবং নানা ‘প্রশ্ন’কে ঘিরে আবর্তিত হবে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প অর্থাৎ হিমালয় অঞ্চল থেকে সৃষ্ট নদীগুলোর পানি ৩০টি খালের মাধ্যমে ভারতের খরাপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার এই যে মহাপরিকল্পনা, তার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৮০ সালের দিকে এই পরিকল্পনার কথা প্রথম জানা যায় এবং ২০০২ সালে বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিচারপতি এসএইচ কাপাডিয়ার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিমত দেন, এ পরিকল্পনাটি ভালো। তাই এটির বাস্তবায়ন এবং একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তা মনিটর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা। হাইকোর্ট ৩৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, ভারতের পরিবেশবাদীদের অনেকেই এ মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ভারতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পরিবেশবাদী বন্দনা সিভা ‘বিজনেস টু ডে’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১৩ মার্চ ২০১৪) মন্তব্য করেছিলেন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থার নামান্তর মাত্র। তিনি আরও মন্তব্য করেছিলেন এভাবে- 'It has no hydrological or ecological soundness, and is just part of the corruption/ construction package that has ruined India's eco-system and life support base. This is the same lobby that aggravated the Uttarkhand disaster with its hydrological projects.' আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা জীববৈচিত্র্য নিয়ে যারা কাজ করেন, বন্দনা সিভা তাদের অন্যতম। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আমাদের জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে মোট যে খরচ ধরা হয়েছে অর্থাৎ ৫৬০ হাজার কোটি রুপি, যা ভারতের জিডিপির শতকরা ২৫ ভাগ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতাগোষ্ঠী থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে এবং ভারতে যাদের আয় ৪০০ ডলার থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে তাদের প্রত্যেকের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১২ ডলার। বন্দনা জানিয়েছেন তিনি নিজে কেন-বেতওয়ার (Ken-Betwar) এবং সারদা-যমুনা (Sharda-Jamuna) আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাতে তিনি দেখতে পেয়েছেন, খরাপীড়িত এলাকায় পানি নিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলা হয়, তা সত্য নয়। আমরা আরেকজন ভারতীয় পরিবেশবিদ- রাজেন্দ্র সিংয়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। রাজেন্দ্র সিং ২০০১ সালে বিখ্যাত ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। আর ২০১৫ সালে তিনি পেয়েছেন ‘পানির নোবেল পুরস্কার’ হিসেবে খ্যাত ‘স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ’। ভারতে তিনি Water Man of India হিসেবে খ্যাত। বোঝাই যায় তার কর্মকাণ্ড পানি নিয়ে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১০ জুন ২০১৫) তিনি বলেছেন,'This will be disastrous for my country. It will displace a lot of people and cause undesirable effects, with floods in one side and drought on the other. Rivers are not like roads. They have own gene pool and own life. Linkage of rivers will lead to privatization of water resources.' যে কথাটা বন্দনা সিভা বলেছেন, অনেকটা সেই সুরেই কথা বলেছেন রাজেন্দ্র সিং। এখানে যে একটা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে, অর্থাৎ ভারতের কর্পোরেট জগতের বাসিন্দারা যে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাচ্ছে, এটাই মোদ্দাকথা। এখানে খরাপীড়িত এলাকায় পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টি মুখ্য নয়। পানির প্রবাহ না বাড়িয়েও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য, তা স্বীকার করেছেন ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্য ড. মিহির শাহ। তিনি গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এই প্রকল্পের ব্যাপারে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন (ইকোনমিক টাইমস, ৭ মার্চ ২০১৩)। ভারতের Working Group on Sustainable Ground Water Management-এর পরিচালক পিএস বিজয় শংকর একটি সেমিনারে আসামের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বলেছিলেন, আসামে প্রচুর ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিভাগে (সারফেস) পানি রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-বরাক অববাহিকায় মাথাপিছু পানির ব্যবহার সর্বোচ্চ ১৪,০৫৭ কিউবিক মিটার। মাত্র ১ ভাগ ভূউপরিভাগের পানি ব্যবহৃত হয়, অথচ ৫৬ ভাগ পানি ব্যবহার করা সম্ভব। সারা ভারতে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্র ৩ ভাগ ব্যবহৃত হয়, অথচ ৩৫ ভাগ পানি রয়ে যায় অব্যবহৃত। এ পানি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এখানে বলা ভালো, প্রস্তাবিত এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে যেসব রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আসাম, সিকিম ও কেরালা এর বিরোধিতা করেছে। শুধু তামিলনাড়ু এর পক্ষে। বলা হয়, ভারতের খরা এলাকার জন্য পানি দরকার। কিন্তু এক নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে খালের মাধ্যমে অন্য এলাকায় (দক্ষিণে) নিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। ভারতের ভাকরা বাঁধ নিয়ে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশের জন্য ভাকরা থেকে পাওয়া পানি নয়, বরং ভূগর্ভস্থ পানি ও উন্নত কৃষি ব্যবস্থা বেশি জরুরি। পাঞ্জাবের মোট ২০ শতাংশ এবং হরিয়ানার ৩১ শতাংশ চাষযোগ্য জমি বাঁধ নিয়ন্ত্রিত। এমনকি ৫০ বছর পর আজও সেখানকার বাস্তুহারা মানুষ কঠোর সংগ্রাম করে যাচ্ছে মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুর জন্য। ওই গবেষণার ফলাফলই বলে দিচ্ছে নর্মদা বাঁধের উচ্চতা না বাড়িয়ে কীভাবে আরও বেশি পানি ও বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে মাথা ঘামানো দরকার। নর্মদা বাঁধ-সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তুহারা ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র, যখন কিনা ওই সব রাজ্যে বাড়তি কোনো জমি নেই তাদের পুনর্বাসনের জন্য? তিহরি বাঁধের শিকার হয়েছে যারা, তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। কারণ, না ইউপি, না কেন্দ্র সরকার, কোনোরূপ সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল তাদের সাহায্যার্থে। এখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যে শুধু বাংলাদেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তা নয়। বরং খোদ ভারতও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন : আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। আন্তর্জাতিক আইনবিশারদ অধ্যাপক ওপেনহেইম বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রকে নিজ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা এমনভাবে পরিবর্তন করতে দেয়া যাবে না, যার ফলে তা প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থার কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে। এ আলোকেই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। যখন কোনো রাষ্ট্র একটি অভিন্ন সম্পদের উন্নতি, পরিবর্তন বা ধ্বংস সাধনের জন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ করে, তখন ওই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন আরও বেশি সুনির্দিষ্ট যখন তা আন্তর্জাতিক নদী সম্পর্কিত হয়। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের সবক’টি নদীই আন্তর্জাতিক। এসব নদীর একতরফা পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পানি প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার-সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। তা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি না করেই হতে হবে। কিন্তু ভারতের এ উদ্যোগে একটা বিষয় সুস্পষ্ট- ভারত বাংলাদেশের ওপর এ প্রকল্পের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই উপেক্ষা করছে। হেলসিংকি নীতিমালার অনুচ্ছেদ ২৯-এ বলা হয়েছে, এক অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অপর অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্রকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিষ্কাশন অববাহিকার পানির ব্যবহারের ব্যাপারে কৃত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করবে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার (আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত) ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। কিন্তু আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত একটি অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারমূলক পদ্ধতিতে অগ্রসর হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জলপ্রবাহ কনভেনশনটি গ্রহণ করা হয়। এ কনভেনশনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কনভেনশনের ৬নং অনুচ্ছেদে যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্দিষ্টকরণে কতগুলো শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্ধারণে এ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সবক’টি শর্তকে একইসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে বিবদমান দেশগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। জলপ্রবাহ কনভেনশনে উল্লিখিত নীতিমালাগুলোর আলোকে ভারতে প্রস্তাবিত নদী সংযোগ প্রকল্পকে বিচার করলে দেখা যাবে, ভারত কনভেনশনে বিধিবদ্ধ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন করছে। এমনকি জলাভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদ অনুসারে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরামর্শ করবে এবং একইসঙ্গে জলাভূমির এবং সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর সংরক্ষণের স্বার্থে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোকে ধ্বংস করার নামান্তর, যা কি-না রামসার কনভেনশনের সুস্পষ্ট লংঘন। আমরা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৯নং অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করতে পারি। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, উভয়পক্ষ সমতা, ন্যায়পরায়ণতা ও পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, সেখানে আন্তঃনদী সংযোগে প্রকল্পে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করা হলে তা হবে ওই চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকারের চরম লংঘন। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। পানির বণ্টন বা পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ভারতীয় সংবিধানের ২৪৬নং ধারা এবং ৭ম সিডিউল অনুযায়ী কোনো রাজ্যের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহের অধিকার সেই রাজ্যের। এখানে কেন্দ্র কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। অতীতে কৃষ্ণা নদীর পানির ব্যবহার, প্রত্যাহার ও পানি সংরক্ষণ নিয়ে তিনটি রাজ্য- মহারাষ্ট্র, কর্নাটক আর অন্ধ্রের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, যা ভারতে আন্তঃরাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের এক সংকট সৃষ্টি করেছিল। এই বিবাদ মীমাংসার জন্য একটি ট্রাইব্যুনালও গঠিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যগুলোর প্রাপ্ত অধিকার স্বীকার করে ওই ট্রাইব্যুনাল একটি রায় দিয়েছিল। আজ বেশ ক’টি রাজ্যের আপত্তির মুখে কীভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। আসলে মোদিকে ঘিরে একটি ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা চান ব্যবসা। আর এই প্রকল্পটি হচ্ছে বিশাল একটা ব্যবসার জায়গা, যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬০ হাজার কোটি রুপি, যা দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ব্যবহৃত হবে। কোর্টের রায় অনুযায়ী তা এখন ১০ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ অর্থটাই হচ্ছে মূল কারণ। তবে আমরা বসে থাকতে পারি না। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে একটি ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েছে। এটা যথেষ্ট নয়। অতি দ্রুত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন এবং প্রকাশিত সংবাদটির ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে একটি ব্যাখ্যাও চাওয়া উচিত। Daily Jugantor ০৭ আগস্ট, ২০১৫

0 comments:

Post a Comment