রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক

মিয়ানমার দীর্ঘ প্রতিক্ষা আর লড়াইয়ের পর অবশেষে একজন ‘সিভিলিয়ান’প্রেসিডেন্ট পেয়েছে। তিন কিয়াও প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৫৪ বছরের সেনা-শাসনের অবসান হয়েছে। মিয়ানমারে একটি সিভিলিয়ান সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক এখন কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হবে? বাংলাদেশ-মিয়ানমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উভয় দেশই বিমসটেক (BIMSTEC পরিবর্তিত নাম BBIMSTEC) এবং বিসিআইএম জোটের সদস্য। যদিও প্রস্তাবিত বিসিআইএম জোটটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভুটান ও নেপাল বিমসটেক জোটে যোগ দেয়ায় এই জোটটি শক্তিশালী হয়েছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামে মিয়ানমারের কাঁচামালভিত্তিক ব্যাপক শিল্পকারখানা স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক মিয়ানমারে বাংলাদেশী সারের ভীষণ চাহিদা রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত-সংলগ্ন চট্টগ্রাম এলাকায় বেশ কিছু সার কারখানা স্থাপন করে বাংলাদেশ মিয়ানমারে সার রপ্তানি করতে পারে। মিয়ানমারের আকিয়াব ও মংডুর আশেপাশের অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর পাওয়া যায়। এসব কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিমেন্ট ও কাগজশিল্প বিকশিত হতে পারে। মিয়ানমারে প্রচুর জমি অনাবাদী রয়েছে।এ অবস্থায় মিয়ানমারের ভূমি লিজ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মান্দালয়-ম্যাগাওয়ের তুলা আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধিষ্ণু গার্মেন্টস সেক্টরের কাঁচামাল হিসেবে তুলা মিয়ানমারের এই অঞ্চল থেকে আমদানি করতে পারে। গবাদিপশুর খামারও গড়ে তুলতে পারে। মিয়ানমারের সেগুনকাঠ দুনিয়া-বিখ্যাত। আমাদের ফার্নিচার শিল্পের চাহিদা মেটাতে পারে এই সেগুনকাঠ, যার উপর ভিত্তি করে আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপে আমাদের ফার্নিচার শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারি। মিয়ানমার মূল্যবান পাথর, যেমন রুবি, জেড, বোম আর মার্বেল সমৃদ্ধ। এসব মূল্যবান পাথর আমাদের জুয়েলারি শিল্পকে সমৃদ্ধ করে ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ও চীনের সমন্বয়ে যে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে (বিসিআইএম), সেখানেও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং মিয়ানমারে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু মিয়ানমারকে নিয়ে প্রশ্ন অনেক। মিয়ানমারে একটি নির্বাচন হয়েছিল বটে। কিন্তু এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি জন্মের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে না। দীর্ঘ ৫৪ বছর সেখানে সে সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে তা হুট করে ভেঙে ফেলা যাবে না। সেনাবাহিনির রাজনীতিতে যে প্রভাব, তা হ্রাস করা যাবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সেনা বাহিনির একটি নির্বাচন দেয়া প্রয়োজন ছিল। সেটা তারা দিয়েছে। কিন্তু তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে, এটা আমার মনে হয় না। মিসরের মতো এক পরিস্থিতিরও জন্ম হতে পারে মিয়ানমারে। ‘আরব বসন্ত’ মিসরে পরিবর্তন ডেকে এনেছিল। সেনা নিয়ন্ত্রিত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেঙে পড়েছিল কায়রোর ‘তেহরির স্কোয়ার’র দীর্ঘ ১৭ দিনের গণ অবস্থানের কারণে। তার পরের ঘটনা সবাই জানেন। হোসনি মোবারকের ক্ষমতা হস্তান্তর, একটি নির্বাচন, নির্বাচনে ড. মুরসির বিদায় (জুন ২০১২) এবং পরবর্তীতে (২০১৩) সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফিল্ড মার্শাল সিসির ক্ষমতা গ্রহণ। ‘আরব বসন্ত’ মিসরের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।  এখন মিয়ানমার কী সেদিকেই হাঁটছে। সেনাবাহিনি নির্বাচন ও সংসদকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু সকল ‘সুযোগ সুবিধা’ তারা ছেড়ে দেবেন, এটা মনে হয় না। এক্ষেত্রে সূ চিকে সেনাবাহিনির সাথে একটা সহবস্থানে যেতে হবে। নতুবা তিনি ‘পর্দার অন্তরালে’থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারবেন না। এর অর্থ পরিষ্কার—সেনা সমর্থন তিনি পেলেন না। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন কিয়াওকেই সামনে নিয়ে আসলেন। তিনি নিজে আদৌ প্রার্থী না হয়ে সংবিধান মেনে নিলেন। এর মাধ্যমে তিনি সেনাবাহিনির আস্থা অর্জন করতে পারেন। সরকারে তার ‘ভূমিকা’নিয়েও প্রশ্ন থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তিনি একটি ‘পদ’পেতে পারেন। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বিচ্ছিন্নতাবাদী ৮টি গ্রুপের সাথে একটি চুক্তি সাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু চুক্তির বাইরে আরও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ রয়েছে। এদেরকেও চুক্তির আওতায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক সংস্কারটা খুবই জরুরী। বৈদেশিক বিনিয়োগ দীর্ঘদিন এদেশে বন্ধ ছিল। এখন এটি উন্মুক্ত। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে বিপুল জ্বালানি সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আসলেই এই সম্পদ আহরণ সম্ভব। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা মিয়ানমারে আসতে শুরু করেছেন। এখন ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি’র কারণে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা আরো উৎসাহিত হবেন। রোহিঙ্গা সমস্যা বহির্বিশ্বে মিয়ানমারের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট করেছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক অমানবিক জীবন যাপন করছে। সূচি এদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেন নি। তিনি উগ্র বৌদ্ধ মানসিকতায় নিজেকে সম্পর্কিত করেছিলেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—ভোটপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সেটা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর কাছ থেকে মানুষ আরো বেশি কিছু প্রত্যাশা করে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া, তাদের চলাচল বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়া কিংবা তাদের নিজ বাসভূমে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরী। নয়া সরকার এই কাজটি করবে—এটাই মানুষ প্রত্যাশা করে। ১৯৬২ সালের পর মিয়ানমার এই প্রথমবারের মত একজন সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট পেল। যুক্তিযুক্ত কারণেই নয়া প্রেসিডেন্টের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। দীর্ঘ ৫৪ বছরে সামরিক বাহিনি সেখানে ক্ষমতা পরিচালনা করেছে। ফলে সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়নি। সংবাদপত্র সেখানে স্বাধীন নয়। বিচার বিভাগও স্বাধীন নয়। এগুলো সবই একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য প্রয়োজন। এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নিতে যাচ্ছে। ৩১ মার্চ নয়া প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব নেবেন। একটি সরকারও গঠিত হবে তখন। ফলে নতুন এক মিয়ানমারকে আমরা দেখতে পাবো। সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য একটা সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। একটি ‘নয়া মিয়ানমার’ আমাদের জন্য অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। মিয়ানমার আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়া পরও এই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি অতীতে। পরিসংখ্যান বলছে ২০১১-১২ সমুদ্র সীমায় বাংলাদেশ মিয়ানমারে বাণিজ্য করেছিল ১৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অথচ মিয়ানমার থেকে আমদানি করেছে ৬৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু পরের বছর আমদানি রফতানির পরিমাণ কমে যায়। ২০১২-২০১৩ সালে বাংলাদেশ রফতানি করেছিল ৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমদানির পরিমাণ মাত্র ৮৭ হাজার ডলারের পণ্য। তুলনামূলক বিচারে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা নিকট প্রতিবেশী চীনের সাথে আমাদের বিশাল বাণিজ্য। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্ক একেবারেই গড়ে ওঠেনি। অথচ বাংলাদেশী পণ্য, বিশেষ করে সিমেন্ট, ঔষধ, বিস্কুট, আয়রন, টিন ও সফট ড্রিংক-এর বেশ চাহিদা রয়েছে মিয়ানমারে। এখন নতুন একটি সিভিলিয়ান সরকার সেখানে গঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ উদ্যোগ নিতে পারে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কটা আরো বেশি উন্নত করতে। বিসিআইএম জোটেরও বিশাল এক সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৯১ সালে বিসিআইএম’র অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। অথচ ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারে। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে বিসিআইএম এ দেশটির বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৯৩ ভাগ, আর ২০১১ সালে সেটি দাঁড়ায় মাত্র ২ দশমিক ৬৩ ভাগে। এখানে মিয়ানমারের অংশ কমেছে, এটা সত্য। এখন একটি সিভিলিয়ান সরকার এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো বাড়াতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যে পরিবর্তন আসছে। আঞ্চলিক বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে মিয়ানমার আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনার দার উন্মুক্ত করতে পারে। মিয়ানমারের একটি সিভিলিয়ান সরকার গঠিত হয়েছে। আন্তঃবাণিজ্য কিংবা বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে একটি সিভিলিয়ান সরকার সব সময়ই একটি ভিন্ন ‘এপ্রোচ’ নিয়ে থাকে। তাই আমরা আশা করবো, মিয়ানমারের ‘নয়া সরকার’এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে গুরুত্ব দেবে বেশি। Poriborton 22.03.16

0 comments:

Post a Comment