রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

ওবামার জন্য আদৌ কোন সুসংবাদ অপেক্ষা করছে কি?


যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ার আগে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন বারাক ওবামা। আজ ২১ জানুয়ারি তিনি শপথ নেবেন। থাকবেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। কিন্তু এই চার বছর তার জন্য কতটুকু সুখের হবে কিংবা মার্কিন অর্থনীতিতে আদৌ কোন সুবাতাস বইবে কিনা, সে প্রশ্ন করাই যায়। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বিশাল বেকারত্ব, রেকর্ড অতিক্রম করা ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ আর অচলপ্রায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক খাতকে সামনে রেখেই তিনি গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। বড় ব্যবধানেই তিনি মিট রমনিকে হারাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বছরের শুরুতেই তাকে ‘ফিসকাল ক্লিফে’র মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এটা হচ্ছে খাদে পড়ার হাত থেকে মার্কিন অর্থনীতিকে রক্ষা করা। বিলটি উভয় কক্ষে পাস হওয়ায় তা এখন আইনে পরিণত হল। এর ফলে বছরে ৪ লাখ ডলারের কম আয়ের মানুষ প্রত্যক্ষ করের আওতায় থাকবে না। যদিও ডেমোক্র্যাটরা চেয়েছিলেন আড়াই লাখ ডলারের মধ্যেই সীমাটা বেঁধে রাখতে। অর্থনীতিকে খাদে পড়া থেকে বাঁচাতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে এস্টেটগুলোর কর ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা, ক্যাপিটাল ট্যাক্স বাড়ানো, প্রায় ২০ লাখ লোকের জন্য বেকার ভাতার মেয়াদ এক বছর বাড়ানো, প্রায় ৫০ লাখ লোকের জন্য ট্যাক্স ক্রেডিটের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু এতে করে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে কতটুকু?
মার্কিন অর্থনীতি ঠিকমতো চলছে না। ধনী-গরিবদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সীমিত কিছু ব্যক্তির হাতে। শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ৫ ভাগের ১ ভাগের মালিক হচ্ছে জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ ভাগ। ১৯৭০ সালে ধনিক শ্রেণীর হাতে মোট আয়ের ৮ থেকে ৯ ভাগ অর্থ গচ্ছিত হতো। আর ২০১২ সালে এসে তারা ভোগ করে মোট সম্পদের ২৩ দশমিক ৫ ভাগ। ১০ ভাগ আমেরিকান দেশটির মোট বেতনের ৪৯.৭ ভাগ গ্রহণ করে। এক ভাগ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগের মালিক।
দ্বিতীয় টার্মে বারাক ওবামার দায়িত্ব গ্রহণ তাই সঙ্গতকারণেই একটি প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে তরুণ প্রজšে§র মধ্যে। তারা চাকরি চায়। সবার জন্য চায় স্বাস্থ্যসেবা। মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কোন হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই। ওবামা স্বাস্থ্য সেবায় কিছু কাটছাঁট করতেও বাধ্য হয়েছিলেন। এখন দেখার বিষয় তিনি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কতদূর যান। ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ঘাটতি নিয়ে ওবামা তার দ্বিতীয় টার্ম শুরু করবেন। তিনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, এই ঘাটতি তিনি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনবেন। ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কর্মসূচি তার রয়েছে। মোটরগাড়ি শিল্পকে বাঁচাতে প্রণোদনা দেয়া সরকারের সফলতা বলে মনে করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালে তিনি আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবেন। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ সমাধান চান তিনি। এতে করে ইসরাইলি নেতৃত্ব যে খুশি হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওবামা জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সামরিক ব্যয় বাড়ানোর বিপক্ষে ওবামা। বরং আগামী এক দশকে এ খাতে ব্যয় সাড়ে ৪৮ কোটি ডলার কমাতে চান তিনি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে আদৌ কোন পরিবর্তন আসবে কিনা, তা এই মুহূর্তে বলা না গেলেও দু-একটি ঘটনায় ইঙ্গিত মিলেছে যে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সম্প্রতি যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের জন্য কোন ভালো খবর নয়। খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দিতে পারে। যদিও অনেক দিন থেকেই বলা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সরকারি পর্যায়ে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত টিকফা চুক্তি করতে চাচ্ছিল। বাংলাদেশ সরকার এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার লংঘন, শ্রমিক নেতা আমিনুলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, সর্বোপরি ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিষয়গুলো কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। ফলে ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ সম্প্রতি যে চিঠি ইস্যু করেছে, তাতে জিএসপি সুবিধা বাতিলের কথা পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে, তার মাঝে মাত্র ৫ শতাংশ জিএসপি সুবিধা পায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছি তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার। কোন কোন মহল থেকে আমাদের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল যে, তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা দেয়া হবে। এখন সব ভেস্তে যেতে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র একজন নয়া বাণিজ্যমন্ত্রী ও একজন নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাচ্ছে। তাতে করে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রচলিত নীতিতে বড় কোন পরিবর্তন আসবে না।
ওবামার দ্বিতীয় দফা দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের জন্য একটি আনন্দের সংবাদ। এতে অভিবাসী ও অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সুযোগ আরও বাড়ল। ওবামার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতিকে ‘বিপদে’র হাত থেকে রক্ষা করা। ফিসকাল ক্লিফের ব্যাপারে সিনেট ও কংগ্রেস নীতিগতভাবে এক হলেও এখানে বলা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের কী হবে। এই ঋণ যে অর্থনীতিতে একটি অস্থিরতা তৈরি করবে, তা কাউকে বলে দিতে হয় না। অর্থনীতির ‘পাগলা ঘোড়া’কে তিনি যদি বাগে আনতে না পারেন, তাহলে অতি দ্রুত তিনি জনপ্রিয়তা হারাবেন। যে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে থেকে গেলেন, অতি দ্রুত সেই জনপ্রিয়তা তিনি হারাতে পারেন।
আগামী ৪ বছর ওবামার খুব ভালো সময় যাবে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি ইতিমধ্যে কংগ্রেসের কাছে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। কারণ আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে ফেডারেল সরকারকে ট্যাক্স রিটার্ন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, সোশ্যাল সিকিউরিটি খাতে বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য তাকে ঋণ করতে হবে। এ ঋণের পরিমাণ এখন ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। রিপাবলিকানরা ঋণ ‘ফ্রিজ’ করে দিতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ঋণের পরিধি বাড়ানো যাবে না। আর সত্যি সত্যিই যদি ওবামা প্রশাসন ঋণের পরিধি না বাড়ায়, তাহলে ট্যাক্স রিটার্নের ৮৬ বিলিয়ন ডলার, সোশ্যাল সিকিউরিটির ৬১ বিলিয়ন ডলার কিংবা মেডিকেয়ারের ৭৩ বিলিয়ন ডলারের ‘বিল’ পরিশোধে ব্যর্থ হবে। তাতে করে সাধারণ মানুষ, বিশেষত প্রবীণরা একটা বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়বেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হবে। সোশ্যাল সিকিউরিটির ‘চেক’ যারা পান, তারাও পড়বেন বিপদে। যে মধ্যবিত্ত ওবামাকে বিজয়ী হতে সাহায্য করেছে, তারা পড়বে বিপদে। তাই ওবামাকে ঋণ করতেই হবে। কংগ্রেস যদি ঋণ গ্রহণের অনুমতি না দেয়, তাহলে বছরের শুরুতেই এক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে তিনি যাত্রা করবেন।
সমস্যা তার জন্য আরও আছে। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন তার জন্য বড় সমস্যা। আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের (২০১৪) সিদ্ধান্তে তিনি অটল। কিন্তু তারপর? তালেবানদের সঙ্গে কোন ‘সমঝোতা’ হয়নি। ২০১৪ সালে কারজাইয়ের শেষ বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। চলতি বছর আফগানিস্তানের জন্য একটি ‘বিকল্প সমাধান’ তিনি বের করতে পারবেন বলেও মনে হয় না। আর কারজাইয়ের পতন যদি সেখানে তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পথকে প্রশস্ত করে, সেটা হবে ওবামার বৈদেশিক নীতির জন্য দুঃসংবাদ। পাকিস্তানে অব্যাহত ড্রোন বিমান হামলা চালিয়েও ‘পাকিস্তানি তালেবান’দের নির্মূল করা যায়নি। বরং পাকিস্তান আজ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ব্যাপ্তি সিরিয়াকে এক ‘নয়া লেবাননে’ পরিণত করতে পারে। আর মিসরে ইসলামপন্থীদের উত্থান ওবামা প্রশাসনের জন্য আদৌ কোন ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না আগামী দিনে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ সেখানে এক ধরনের উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১০ লাখ মানুষ এ উৎসবে অংশ নেবে। এটা ৫৭তম শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। এটিও চাঁদানির্ভর। ২০০৯ সালে প্রথমবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ওবামা ব্যয় করেছিলেন ৫৩ মিলিয়ন ডলার। সিনিয়র বুশ ও ক্লিনটন ব্যয় করেছিলেন যথাক্রমে ৩০ ও ৪২ মিলিয়ন ডলার। চাঁদার পরিমাণও নির্ধারিত থাকে। ১ লাখ ডলার থেকে ১০ লাখ ডলার। আর কেউ যদি ১০ লাখ ডলার চাঁদা দেয়, তিনি সামনের সারিতে বসে প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। আড়াই লাখ ডলার দিলে আপনি সব ধরনের কনসার্টে অংশ নিতে পারবেন। ১৫০ ডলার দিয়ে শার্টের কাফলিং কিনতে পারেন, আর ৭ হাজার ৫০০ ডলার খরচ করে আপনি কিনতে পারেন ‘প্রেসিডেন্টস মেডেল’। এটা একটা উৎসব। কিন্তু যেখানে জনগোষ্ঠীর ১৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, তাদের জন্য এ উৎসব আদৌ কোন সুসংবাদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক হোসাইন ওবামা আজ থেকে তার দ্বিতীয় টার্ম শুরু করলেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কোন ক্ষেত্রেই তার জন্য কোন সুসংবাদ অপেক্ষা করছে না।
Daily JUGANTOR
21.01.13

0 comments:

Post a Comment