রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

ভিসি ও শিক্ষক নিয়োগে এখনও দলীয়করণ?


সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে যেসব সংবাদ সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে, তা কোন আশার কথা বলে না। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতির সংবাদ ছাপা হলেও ভিসি বহাল তবিয়তে এখনও আছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করলে শিক্ষকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। পরিণামে তাদের ছাত্রলীগের এসিড সন্ত্রাসের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পিটিয়েছিল ছাত্রলীগের কর্মীরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিণত হয়েছে অনিয়মের আখড়ায়। উপাচার্য মেসবাহউদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এখন। ভিসি হিসেবে মেসবাহউদ্দিন শুধু দলীয় বিবেচনায় মাত্র দেড় বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে কলেজ শিক্ষকদের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। যেখানে গবেষণামূলক প্রবন্ধের দরকার, সেখানে তার কোন তোয়াক্কা করেননি ভিসি মহোদয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যারা অধ্যাপক হয়েছেন, তাদের প্রকাশনা না থাকলেও আমার ছাত্র যারা প্রভাষক হিসেবে ওই বিভাগে যোগ দিয়েছেন, তাদের গ্রন্থ ও গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা কথাÑ মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র দু’দিন আগে মেসবাহউদ্দিন জগন্নাথে ১১৪ জন চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীকে পদোন্নতি ও স্থায়ী নিয়োগ দিয়ে গেছেন। এসব ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে (সকালের খবর, ২৭ ফেব্র“য়ারি)।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। সদ্যবিদায়ী ভিসি সেখানে নিয়োগ-বাণিজ্য করে গেছেন। অতিসম্প্রতি বিভিন্ন নিয়োগে ২০০ জন শিক্ষকের বিপরীতে তিনি দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছেন ৩৫০ জনকে, যাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কোন অনুমতি ছিল না। আর সর্বশেষ ২০ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪৭তম সিন্ডিকেটে তৃতীয় শ্রেণীর ১৪৫টি পদের বিপরীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ১৮৪ জনকে। এ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন একজন শিক্ষক ১ মার্চের যুগান্তরের উপসম্পাদকীয় পাতায়। সবচেয়ে অবাক করা একটি কাণ্ড করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ ছাপা হওয়ায় আমি লজ্জিত ও দুঃখিত। আমার সব আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়। তার কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান বাড়াবেন, এ প্রত্যাশা ছিল আমাদের সবার। কিন্তু যখন সংবাদপত্রের দিকে তাকাই, তখন আমি আশাহত হই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সংবাদটি ছাপা হয়েছে ২ ফেব্র“য়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের পাতায়। এতে বলা হয়েছে, যিনি কোনদিন গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করেননি, তাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছে নির্বাচন কমিটি। সিন্ডিকেট তার এই সুপারিশ অনুমোদন করেনি এখন অবধি। বাতিলও হয়নি। এ সুপারিশের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে তা শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে শিক্ষক সমিতি ভিসিকে আলটিমেটাম দেয়। মজার ব্যাপার হল, ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, যাকে ওই পদে সুপারিশ করা হয়েছিল, তিনি অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে। তবে গণযোগাযোগে তিনি একটি পিএইচডি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মাস্টার্সে তার একটি তৃতীয় শ্রেণীও রয়েছে। তিনি বর্তমানে সরকারের তথ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান তথ্য অফিসার ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য।
একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সহযোগী অধ্যাপক পদে সুপারিশের বিষয়টি নানা প্রশ্নের জš§ দিয়েছে। প্রথমত, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ওই নির্বাচনী কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী সভায় তিনি কী করে এমন এক ব্যক্তিকে সহযোগী অধ্যাপক পদে সুপারিশ করলেন, যিনি আদৌ কোনদিন জার্নালিজম বা মিডিয়া নিয়ে পড়াশোনা করেননি। অধ্যাপক হোসেন তো আমাদের শুনিয়েছিলেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগরকে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চান। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত এই ভেবে যে, এটা তিনি কেন করলেন? দ্বিতীয়ত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৮তম সিন্ডিকেটে (১৯৮৯) শিক্ষকদের পদোন্নতি তথা আপগ্রেডিং চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তাতে (২ক) স্পষ্ট বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহকারী অধ্যাপক পদে ৪ বছরের অভিজ্ঞতা ও ৩টি প্রকাশনা (পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে) বাঞ্ছনীয়। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে তার প্রয়োজন ৭ বছরের অভিজ্ঞতা ও ৩টি প্রকাশনা। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, তথ্য অধিদফতর কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয় এবং তার আদৌ কোন গবেষণামূলক প্রবন্ধ নেই। তাহলে তিনি সুপারিশকৃত হলেন কিভাবে? তৃতীয়ত, অভিযোগ উঠেছে, ড. জাহাঙ্গীর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে ভিসিকে প্রভাবিত করেছেন। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তিনি অন্যায় করেছেন। চতুর্থত, এই সুপারিশটি করে ভিসি মহোদয় যদি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন কমিটির সদস্যরাও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। তারাও সমান দোষী। পঞ্চমত, নিয়োগটি নতুন। এখানে সিনিয়র শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সেই বিবেচনায় ভিসি সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিতে চেয়েছেন। এজন্য তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু সুপারিশটি সঠিক হয়নি। আমার জানা মতে, কলা অনুষদেই মিডিয়া স্টাডিজে লন্ডন থেকে পিএইচডি করা অধ্যাপকও রয়েছেন। প্রয়োজনে তাকে সাময়িকভাবে বিভাগটি গড়ার দায়িত্ব দেয়া যায়। তবে অবশ্যই অতি দ্রুত এ বিভাগে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। নতুবা শুরুতেই বিভাগটি মুখথুবড়ে পড়বে। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি জানেন একটি বিভাগ কিভাবে দাঁড় করাতে হয়। পঞ্চমত, এই সুপারিশটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষাকে একটি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে। একজন ভিসিকে যে কত চাপের মুখে কাজ করতে হয়, এটা তার বড় প্রমাণ। আমার ধারণা ছিল অধ্যাপক হোসেন কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী হবেন। অনেক আশার কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছেন। আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা কেন ‘চাপে’র কাছে মাথানত করবেন? তিনি কেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলেন না? আগামীতে তার ওপর আরও চাপ আসবে। প্রোভিসির টার্ম শেষ, ট্রেজারারের টার্মও শেষ হয়ে আসছে। নতুন যারাই আসবেন, তাদের অবশ্যম্ভাবীভাবেই জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক হতে হবে। যে কোন একটি ভুল ‘চয়েস’ নতুন আরও অনেক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ষষ্ঠত, শেষ পর্যন্ত ভিসি মহোদয় ওই সুপারিশটি সিন্ডিকেটে তোলেননি। এজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ। এখন খোদ ড. জাহাঙ্গীরই পারেন সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে। তিনি যদি তার প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করে নেন, তিনি নিজেও ধন্যবাদের পাত্র হবেন। ভিসি মহোদয়কেও বিতর্কের হাত থেকে বাঁচাবেন। তিনি যদি ‘গোঁ’ ধরে থাকেন, আমার বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হবেন না। এতে করে বিতর্কের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।
সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাকে একটি বড় ধরনের হতাশায় পেয়ে বসেছে। একজন উপাচার্য কিভাবে বিতর্কের জালে জড়িয়ে যান, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তার বড় প্রমাণ। পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন উপাচার্যকে নিয়ে একের পর এক যেসব সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, তাতে করে এই পদটির প্রতি আমি আর আস্থা রাখতে পারছি না। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নতুন ওই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের কোন ‘ভিশন’ নেই। আগামী শতকে কেমন গ্রাজুয়েট আমরা চাই, তার রূপকল্প তাদের জানা নেই। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে নানা প্রশ্ন সংবাদপত্রেই ছাপা হচ্ছে। একটা ভয় আমার মাঝে কাজ করেÑ কারা আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতৃত্ব দেবেন? এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেক পেছনে পড়ে যাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে কলেজ থেকে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের নিয়ে। একই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু তরুণ শিক্ষকের পার্টটাইম চাকরি (যা অনেকটা ফুলটাইমের মতো) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টিকিয়ে রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভাল করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মঞ্জুরি কমিশনকে ভেঙে হায়ার এডুকেশন কমিশন করবে। সিদ্ধান্তটি ভালো। কিন্তু কাদের হাতে থাকবে এই কমিশন! এখানে যদি যোগ্য ও দৃঢ়তাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া না হয়, তাহলে সরকারের উদ্দেশ্য কাগজে-কলমেই থেকে যাবে। উচ্চশিক্ষায় কোন পরিবর্তন আসবে না। এতদিন আমরা অভিযোগ করে আসছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে। কিন্তু এখন তো এই প্রশ্ন উঠবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়েও। ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ৩৫ জন ভিসি। ক’জনকে আমরা চিনি? ক’জন উচ্চশিক্ষায় অবদান রাখতে পারছেন? শত শত ‘শিক্ষক’ নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারা কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন, সে প্রশ্ন না হয় নাইবা করলাম। আমার আস্থার জায়গাটা তাই নষ্ট হয়ে যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি ‘রিভিউ’ করা দরকার। শত শত কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। এখানে কী ধরনের শিক্ষা হচ্ছে, নিয়মিত ক্লাস হয় কি-না, ছাত্র-শিক্ষকদের পারফরম্যান্স রিভিউ করা দরকার। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস। সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল এর উপাচার্য। এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই আছে। এটা ঠিক আছে। কিন্তু আমি আটকে যাই এক জায়গায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আবার এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিও দিচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব? যাদের নিজস্ব কোন ফ্যাকাল্টি নেই, অর্থাৎ সিনিয়র শিক্ষক নেই, তারা কিভাবে ডিগ্রি দেন? বাইরে থেকে ‘ভাড়ায়’ শিক্ষক এনে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার অর্থ কী? প্রয়োজনীয়তাটাই বা কী? যদি পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রি দিতে হয়, তাহলে ওই বিভাগে সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। সেনা নেতৃত্ব নিশ্চয়ই বিষয়টি উপলব্ধি করবেন। তবে এখানে পড়াশোনার মান, নিয়মানুবর্তিতা প্রশংসার যোগ্য।
ক’বছর পর শিক্ষকতায় আমরা থাকব না। আমি নিজেও থাকতে চাচ্ছি না আর। বিকল্প কোন সুযোগ থাকলে আমি চলে যেতে চাই। কারণ যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখে একদিন সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে শিক্ষকতায় এসেছিলাম, আজ এত বছর পর আমার সেই আস্থায় চিড় ধরেছে। অযোগ্য শিক্ষকদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আর ভিসিরা দায়িত্ব পেয়েই প্রথম যে কাজটি করছেন, তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। শিক্ষকের স্ত্রী, ভাই, ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাই শিক্ষক হচ্ছেন। তাদের সন্তানরা শিক্ষক হচ্ছেন। ভিসির দায়িত্ব ছেড়ে বিভাগীয় প্রধান ও ডিন হচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটাইÑ নিজের সন্তানকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া। এ প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোথায় নিয়ে যাবে, আমরা তা জানি না। ইউজিসির চেয়ারম্যান নিজেকে ‘স্টেট মিনিস্টার’ পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু তিনি কি পারেন না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে? তার দায়িত্বটা কী? কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে ভাবেন না। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও তার দায়িত্বটি পালন করছেন না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের টাকায় পরিচালিত হয়। এখানে বারবার অনিয়ম হবে, তা কাম্য হতে পারে না। সরকারের শেষ সময়ে এসে একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার তাও করল না। জগন্নাথে যাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে, তিনি এখনও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। এমন একজন সক্রিয় ‘রাজনীতিক’ যদি উপাচার্য হন, তাহলে দলীয়করণ আমরা বন্ধ করব কিভাবে?
একই কথা প্রযোজ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। সেখানে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজ সন্তানকে নিয়োগ দিতে চেয়ে তা পারেননি। এক পর্যায়ে প্রোভিসি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে সমাজবিজ্ঞানে ডিন থাকাকালীন অবৈধভাবে তার মেয়েকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। পরে সংবাদটি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে তিনি তার মেয়ের ভর্তি বাতিল করতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর এই সদস্য এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। আমরা দলীয়করণ বন্ধ করব কিভাবে। এই দলীয়করণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একুশ শতকের উপযোগী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে না।
Daily JUGANTOR
19.03.13

0 comments:

Post a Comment